কল্পজগতের এক চরিত্রের মৃত্যুর পরে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এ শোকসংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। সেই বিরল চরিত্র হলেন আগাথা ক্রিস্টি-র সৃষ্ট গোয়েন্দা এরক্যুল পোয়ারো। এ বছর পোয়ারোর আবির্ভাবের শতবর্ষের সূচনা করল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে, এক ডিস্পেনসারিতে কাজ করার সময়, আগাথার মাথায় আসে গোয়েন্দা কাহিনি লেখার কথা। কয়েক জন বেলজিয়ান শরণার্থীকে দেখে ঠিক করে ফেলেন, গোয়েন্দাটি হবেন এক অবসরপ্রাপ্ত বেলজিয়ান পুলিশ অফিসার। বহু বার প্রত্যাখ্যানের পর, ১৯২০ সালে আগাথার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য মিস্টিরিয়াস অ্যাফেয়ার অ্যাট স্টাইলস’ প্রকাশ পায়। 

পোয়ারো ব্যক্তিটি কেমন? ডিম্বাকৃতি মুখে জবরদস্ত একজোড়া গোঁফ, উত্তেজিত হলেই মুখ দিয়ে ফুলঝুরির মতো ফরাসি বেরোয়, পায়ে পেটেন্ট লেদারের জুতো, পকেটে পকেট-ঘড়ি। পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি লম্বা, মাথায় নতুন আইডিয়া এলেই চোখগুলো বেড়ালের মতো চিকচিক করে ওঠে। সব ব্যাপার যাতে নিখুঁত ও পরিপাটি হয়, সে দিকে অখণ্ড মনোযোগ। অপরাধীকে ধরার জন্য তাঁর পদ্ধতি হল ‘অর্ডার অ্যান্ড মেথড’। আতস কাচ নিয়ে খুনের জায়গায় সূত্র খোঁজার চেয়ে তাঁর বেশি আগ্রহ, নিহত মানুষটির চরিত্র ও খুনির মানসিকতা আবিষ্কারে। 

‘দ্য মিস্টিরিয়াস অ্যাফেয়ার...’-এর পর আগাথাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক ‘মার্ডার অন দ্য লিঙ্কস’, ‘দ্য মার্ডার অব রজার অ্যাক্রয়েড’, ‘দ্য মার্ডার অন দি ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’, ‘দ্য মিস্ট্রি অন দ্য ব্লু ট্রেন’, ‘ডেথ অন দ্য নাইল’, ‘দ্য বিগ ফোর’ ইত্যাদি উপন্যাস। ১৯২০ থেকে ১৯৭৫-এর মধ্যে পোয়ারোকে আমরা পাই ৩০টির বেশি উপন্যাস, ৬০টি ছোটগল্প ও একটি নাটকে। তাঁর লেখায় ঝরঝরে নির্মেদ গদ্য, হালকা হাস্যরস, কখনও কখনও রোম্যান্সের ছোঁয়া, আর টানটান রহস্য। তাঁর তুরুপের তাস হল, উপন্যাসের শেষে ঘটনা আকস্মিক মোড় নেয়, এবং এক ঘর লোকের সামনে শ্বাসরোধকারী উৎকণ্ঠার মধ্যে পোয়ারো প্রমাণ করে দেন, সবচেয়ে কম সন্দেহজনক ব্যক্তিই হচ্ছেন অপরাধী। 

অপরাধ যে কত বিচিত্র হতে পারে, এবং অপরাধী মানুষের মনও যে কত বিচিত্রগতি হতে পারে, এই উপন্যাসগুলিতে একশো বছর আগেই আমরা দেখেছি। ‘দ্য মিস্টিরিয়াস অ্যাফেয়ার অ্যাট স্টাইলস’ এবং ‘ডেথ অন দ্য নাইল’-এ দেখা যায়, আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরের প্রতি বিরাগপূর্ণ এক পুরুষ ও নারী যৌথ ভাবে খুনটি ঘটিয়েছে। ‘দ্য মার্ডার অব রজার অ্যাক্রয়েড’-এ কথক নিজেই খুনি। ‘মার্ডার অন দি ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’-এ আবার ট্রেনসুদ্ধ মানুষ এক অপরাধীকে শাস্তি দেয়। ‘এবিসি মার্ডারস’ উপন্যাসে, যে মানুষের নামের আদ্যক্ষর যা, সে সেই আদ্যক্ষরের শহরে খুন হয়। 

হোমসের ওয়াটসনের মতো, কয়েকটি উপন্যাসে পোয়ারোর দোসর ক্যাপ্টেন হেস্টিংস। পোয়ারোর মতো দ্যুতিময় জ্যোতিষ্কের পাশে হেস্টিংস খুবই নিষ্প্রভ, যা লেখিকার ইচ্ছাকৃত। 

১৯৩০ নাগাদ আগাথার পোয়ারোকে ‘অসহ্য’ লাগতে শুরু করে। আর ষাটের দশকে তাঁর মনে হয়, পোয়ারো এক জন ক্লান্তিকর বিরক্তি-উৎপাদক খারাপ মানুষ। কিন্তু এই অসম্ভব জনপ্রিয় গোয়েন্দাকে তিনি বাঁচিয়ে রাখেন ১৯৭৫ পর্যন্ত। এবং যে ইতিহাস শুরু হয়েছিল ১৯২০-তে স্টাইলস-এ, সেই বৃত্ত সম্পূর্ণ হল পোয়ারো আর হেস্টিংসকে নিয়ে স্টাইলস-এই ১৯৭৫ সালে। ‘কার্টেন, পোয়ারো’জ লাস্ট কেস’ এক বিচিত্র কাহিনি, যেখানে পোয়ারো অপরাধীকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেন। অপরাধী আবার এমন এক মানুষ, যে নিজে কাউকে খুন করেনি। কিন্তু তার নেশা— অন্যদের দিয়ে খুন সংঘটিত করা। পাছে সে আরও খুন ঘটিয়ে তোলে, তাই পোয়ারো তাকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। ৮৫ বছর বয়সে লেখা ‘কার্টেন’ এক অর্থে আগাথা ক্রিস্টিরও ‘সোয়ান সং’। 

পোয়ারোকে নিয়ে হয়েছে অসংখ্য চলচ্চিত্র ও টিভি সিরিয়াল। পোয়ারোর চরিত্রে অভিনয় করেছেন বহু নামীদামি তারকা, যেমন চার্লস লটন, অরসন ওয়েলস, পিটার উস্টিনভ, ইয়ান হম, ডেভিড সুশে। ডেভিড সুশে প্রায় ২৫ বছর ধরে অন্তত ৭০টি ছবিতে পোয়ারোর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। কিছু অভিনেতা পাপা পোয়ারোকে উপস্থিত করেছেন তথাকথিত ইউরোপীয় জেন্ট্রির ক্যারিকেচার হিসেবে। কিন্তু সুশের উপস্থাপনায় এই ভাবটি নেই। তাঁর পোয়ারো এক আমুদে মানুষ যে দর্শককেও আমোদ দেয়। কিন্তু তা কখনওই ক্যারিকেচার নয়। 

পোয়ারো যে সামান্য গোয়েন্দা নন, তা বোঝা যায়, ‘ওয়ান, টু, বাক্‌ল মাই শু’ উপন্যাসের শেষ কথাগুলিতে: ‘‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ় ইয়োর্স, দ্য নিউ হেভন অ্যান্ড দ্য নিউ আর্থ।’’ তাঁর অনুরোধ ছিল, ‘‘সেই পৃথিবীতে তোমরা মুক্তি নিয়ে এসো, করুণা নিয়ে এসো।’’ সেই অনুরোধ সম্ভবত মেটানো যায়নি, একশো বছর পরের দুনিয়া বলছে।