আজ বেঁচে থাকলে কী বলতেন জেরেমি বেনথাম? ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হলেও, তাঁর তত্ত্বের এমন প্রয়োগ দেখলে খুশি হতেন কি তিনি? ব্রিটিশ দার্শনিক, আইনবিশারদ ও সমাজ সংস্কারক বেনথামের ‘প্যান-অপটিকন তত্ত্ব’ দুনিয়ার নজর কেড়েছিল। সেই অষ্টাদশ শতকে তিনি জেলখানার এক অভূতপূর্ব নকশা বানান। মূল উদ্দেশ্য ছিল, জেলবন্দিদের উপর নজরদারি করবে মাত্র এক জন রক্ষী। তার অবস্থান হবে মাঝখানে আর চতুর্দিকে জেলের কুঠুরি। কিন্তু কোনও বন্দিই জানতে পারবে না যে তার উপর কখন নজরদারি চালানো হচ্ছে। অথচ, তার মনের মধ্যে ঢুকে যাবে যে সে সর্ব ক্ষণ রক্তচক্ষুর নজরদারির আওতায়।

২০১৯-এর ২৪ জুলাই ভারতের সংসদে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ভাষণ শুনতে শুনতে বেনথামের কথা মনে পড়ে গেল! ‘বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন (ইউএপিএ) সংশোধনী বিল’ লোকসভায় পাশ করানোর সময় তাঁর শব্দক্ষেপণের ভঙ্গিমা বুঝিয়ে দিল, গণতন্ত্রকে দিয়ে গণতন্ত্রকে উপড়ে ফেলার প্রক্রিয়া এ বার আরও নির্মম হতে চলেছে। একান্ত নিজস্ব ব্যক্তিপরিসর, সংবিধানের রক্ষাকবচ, সব কিছুই একটানে ছিঁড়ে ফেলা যাবে এ বার রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে। গোপনীয়তার‌ নেই মালিকানা... কেউ নজরদারি চালাক বা না চালাক, আমার-আপনার মনে হতেই থাকবে, কে যেন সব সময় দেখছে, যেন দৈববাণী হচ্ছে, সাবধান, চলো নিয়মমতে!

সংখ্যার জাদুখেলায় অমিত শাহরা ইতিমধ্যে এই সংশোধনী রাজ্যসভাতেও পাশ করিয়ে নিয়েছেন। এবং কী আশ্চর্য, কংগ্রেসও এই সংশোধনীতে সায় দিয়েছে! সংশোধনীতে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত না থাকলেও আগামী দিনে সন্ত্রাসবাদী সন্দেহেই যে কাউকে গ্রেফতার করা যাবে। বস্তুত, ৩৭০ ধারা বিলোপের আগে থেকেই কাশ্মীরের বর্তমান অবরুদ্ধ অবস্থা দেখে, বন্দুকের নলের সামনে সেখানকার যাবতীয় কণ্ঠরোধের প্রচেষ্টা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছে, সংশোধিত ইউএপিএ-র নির্বিচার প্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘ভূস্বর্গ’-কে বেছে নেওয়া এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা!

এ ছাড়াও আর একটি সংশোধনীতে বলা হয়েছে, আগামী দিনে যে কোনও রাজ্যের বাসিন্দার বাড়িতে তল্লাশি চালাতে ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার অধিকার থাকবে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার (এনআইএ) হাতে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট রাজ্যের পুলিশের অনুমতিও লাগবে না এনআইএ-র।

অর্থাৎ যে কোনও তদন্তকারী সংস্থা যে কোনও সময় তদন্তের স্বার্থে আইন মোতাবেক তল্লাশি তো চালাতেই পারে, এত দিনও তার সেই ক্ষমতা ছিল। কিন্তু, নরেন্দ্র মোদী সরকার তার দ্বিতীয় দফায় জাতীয় সুরক্ষার জুজু দেখিয়ে, রাজ্য পুলিশকে অন্ধকারে রেখে, নাগরিক অধিকার সঙ্কুচিত করার যে নতুন প্রয়াস নিয়েছে, তা এক কথায় অভূতপূর্ব।

ইউএপিএ সংশোধনী বিল দেখে মানবাধিকার ও সামাজিক সংগঠনগুলির মধ্যে বা জনমানসে যে প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে তা সঙ্গতও বটে। এই আইনের যে অপব্যবহার হবে না তার গ্যারান্টি কোথায়? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অবশ্য সংসদকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, এই আইনের অপব্যবহার হবে না। কিন্তু এই মুখের কথারই বা গ্যারান্টি কোথায়?

ভয়ঙ্কর এই আইনে বিচার হবে বিশেষ আদালতে। অভিযুক্তকেই প্রমাণ করতে হবে সে নির্দোষ! এর আগেও টাডা ও পোটা-র মতো সন্ত্রাসবিরোধী আইন এনেছিল কেন্দ্র। টাডা-র মেয়াদ ছিল ১৯৮৫ সাল থেকে ’৯৫ পর্যন্ত। পোটা থাকে ২০০১ সাল থেকে ২০০৪ পর্যন্ত। যে সংসদে দাঁড়িয়ে অমিত শাহ ইউএপিএ-র অপপ্রয়োগ না হওয়ার ‘গ্যারান্টি’ দিয়েছেন, সেই সংসদে দাঁড়িয়েই কিন্তু টাডা-র অপপ্রয়োগের কথা স্বীকার করেছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রাজেশ পাইলট। ’৯৪-এর ২৪ অগস্ট রাজেশ সংসদে জানিয়েছিলেন, টাডা আইনে গ্রেফতার ৬৭ হাজার মানুষের মধ্যে প্রায় ৬০ হাজার নির্দোষ ছিলেন। বিচার চলে প্রায় ৮ হাজার জনের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে মাত্র ৭২৫ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা যায়। পাইলট এ কথাও জানান যে, ৬৭ হাজারের মধ্যে মাত্র ৫ হাজার জনের উপর টাডা প্রয়োগ যথাযথ হয়েছিল।

এরই পাশাপাশি, সরকারি রিভিউ কমিটি পোটা-র অপপ্রয়োগ নিয়েও তথ্য-পরিসংখ্যান পেশ করে। তারা জানায়, প্রথম দু’বছরেই ২৬৩টি পোটা মামলায় গ্রেফতার ১৫২৯ জনের মধ্যে ১০০৬ জনের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগের কোনও তথ্যই ছিল না। আবার ধৃতদের মধ্যে একটা বড় অংশই ছিল মহিলা ও শিশু। এই আইন বাতিলের জন্য ২০০৪ সালে সংসদে বিল পেশ করা হয়।

এখানেই ইতিহাসের এক নির্মম রসিকতা লুকিয়ে আছে। ওই বছরেরই ২১ সেপ্টেম্বর সংসদে বিল পাশ করে পোটা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় মধ্যাহ্নভোজের বিরতির আগে। আবার ওই একই দিনে মধ্যাহ্নভোজের পরে টাডা ও পোটা-র ধারাগুলিই আরও তীক্ষ্ণ ও ধারালো করে ইউএপিএ আইনটি সংসদে পাশ হয়ে যায়!

কংগ্রেস-সহ যারা আজকে বিরোধী আসনে বসে গণতন্ত্র লোপ পেল বলে অশ্রু বিসর্জন করছেন, সেই তাঁরাই সে দিন ছিলেন শাসকের আসনে। মনে রাখতে হবে, ‘অপারেশন গ্রিন হান্ট’ সমেত বহু দমনমূলক অভিযানের পুরোধা ছিলেন তৎকালীন ইউপিএ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরম-ই।

কিন্তু তার অর্থ তো এই নয় যে, অতীতে কেউ ভুল করলে এখনও সেই একই ভুল করে যেতে হবে! জানি, আশপাশ থেকে কলরোল উঠবে, কেন, মনমোহন সিংহের জমানায় গণতন্ত্র বিপন্ন হয়নি? তখন কোথায় ছিল গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা? এখন কেন নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহের ভুল ধরার এই তাড়া?

প্রশ্নকারীদের বলব, এক বার ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন এনডিএ সরকারের বিপুল জনাদেশের কথা, ভাবার চেষ্টা করুন, এই সংখ্যাধিক্য নিয়েও এত তাড়াহুড়ো কেন? যাদের বিপুল সংখ্যাধিক্য থাকে, তাদেরই তো বড় দায় গণতান্ত্রিক আবহ বজায় রাখার। স্রেফ সংখ্যার জোর দেখিয়ে বিল পাশ অবশ্যই করানো যায়, সেই অংশটুকুও গণতান্ত্রিক বটে। কিন্তু যে পদ্ধতিতে, যে অস্বাভাবিক দ্রুততায় এ সব হচ্ছে, তাতে আশার থেকে আশঙ্কাই কি বড় হয়ে উঠছে না? কার্বাইন আর লাইট মেশিনগানের নল উঁচিয়ে রাখলেই কি সবাই বিনা প্রশ্নে নতজানু হবে?

২০০৪ সালে ইউএপিএ কার্যকর হওয়ার পরে এই ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই আইনটির প্রয়োগ বা ভাল-মন্দ নিয়ে সংসদে কোনও রিপোর্ট পেশ করা হয়নি, ছোটখাটো প্রশ্নোত্তরে এর প্রসঙ্গ ওঠা ছাড়া। এই আইন কতটা কার্যকর, তার অপপ্রয়োগ হচ্ছে কি না, এ ব্যাপারে এতগুলি বছরেও কোনও পর্যালোচনা হয়নি, অন্তত তা প্রকাশ্যে আসেনি।

আরও এক বার সেই জরুরি অবস্থার কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে যেন। অথচ, ইন্দিরা গাঁধীর জমানায় সেই জরুরি অবস্থার শিকার হয়েছিলেন লালকৃষ্ণ আডবাণী, অরুণ জেটলি, নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং। গণতন্ত্র ও বিরুদ্ধ স্বরের গলা টিপে ধরেও নিজের পতন কি আটকাতে পেরেছিলেন ইন্দিরা?

ঊনবিংশ শতকের ব্রিটিশ দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল তাঁর বিখ্যাত ‘অন লিবার্টি’ গ্রন্থে সব থেকে জোর দিয়েছিলেন ব্যক্তির স্বাধীনতার উপর। উল্লেখ করেছিলেন শাসক ও স্বাধীনতার দ্বন্দ্বের। 

মুশকিলটা হল, সংখ্যালঘুর যে কোনও ক্ষীণতোয়া ভিন্ন মতের কথা শুনলেই ক্ষমতাবান সংখ্যাগুরু দেশদ্রোহের গন্ধ পায়! কিন্তু গন্ধের বিচারটাও তো জরুরি কাজ। সেটা করবে কে?