অভিবাসী। আরও স্পষ্ট করিয়া বলিলে শরণার্থী, উদ্বাস্তু। মেক্সিকো সীমান্তে তাঁহাদের ঠেকাইতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রাচীর তুলিবার স্বপ্নে বিভোর। শুধু স্বপ্ন দেখিলে কথা ছিল না, কিন্তু ট্রাম্প-প্রশাসন এই মানুষগুলিকে আটকাইতে একের পর এক নীতি চালু করিয়াছে। শরণার্থী ও মানবাধিকার লইয়া কাজ করা সংস্থাগুলি, এমনকি ডেমোক্র্যাটরাও অভিবাসী-স্বার্থবিরোধী সেই সব নীতিসকলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর। কিন্তু সব প্রতিবাদ-প্রতিরোধ উড়াইয়া দিয়াছে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট। জানাইয়াছে, আমেরিকায় ঢুকিবার পথে শরণার্থীদের প্রথমে তৃতীয় অন্য কোনও রাষ্ট্রে আশ্রয় চাহিতে হইবে। এই রায়ে বিপাকে পড়িয়াছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ, বিশেষত এল সালভাদর, গুয়াতেমালা বা হন্ডুরাসের ন্যায় মধ্য আমেরিকার রাষ্ট্রগুলির শরণার্থীরা। স্বদেশে হিংসা, জাতিগত অত্যাচারে জর্জর হইয়াই তাঁহারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শরণ লইয়াছিলেন। মার্কিন সীমান্ত-রাজ্যে যদি বা আইনি বা সামাজিক সহায়তার আশা ছিল, দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ের বিধানে তাহা চরম হতাশায় পর্যবসিত।

অথচ ট্রাম্পের অভিবাসী-নীতি লইয়া এই মুহূর্তে আমেরিকার নিম্ন আদালতে মামলা চলিতেছে। একাধিক বার ট্রাম্প-সরকারের মানবাধিকার-বিরোধী নীতির কঠোর সমালোচনা করিয়াছে নিম্ন আদালত। ফলত আমেরিকার সীমান্তবর্তী কয়েকটি রাজ্যে এই অভিবাসী-নীতির প্রয়োগ এত কাল হয় নাই, বা শিথিল ভাবে হইয়াছে। এমনকি কয়েক মাস পূর্বে এই সুপ্রিম কোর্টই নিম্ন আদালতের মতামত সমর্থন করিয়াছিল, রায় বহাল রাখিয়াছিল। অকস্মাৎ এমন কী হইল যাহাতে সর্বোচ্চ বিচারালয়ও শরণার্থীদের হইতে মুখ ফিরাইয়া লইল? শুভবোধসম্পন্ন নাগরিকমাত্রেই যে নীতিকে আইনবিরুদ্ধ ও মানবিকতারহিত বলিয়া বুঝিতেছেন, তাহারই বাস্তবায়নে সিলমোহর দিতেছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিচারব্যবস্থা। আশঙ্কা হয়, মনোভাবটি বুঝি এইরূপ, জগৎ-উদ্ধার যথেষ্ট হইয়াছে, এই বার নিজ রাষ্ট্রের দিকে নজর ফিরাও। বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, সুপ্রিম কোর্ট যে কঠোর হইতে কঠোরতর শর্ত আরোপ করিয়াছে, তাহা আন্তর্জাতিক মানবিকতা আইনের পরিপন্থী। যাঁহাদের গৃহ, স্বজন, সম্বল সব গিয়াছে, তাঁহাদের মুখের উপর সহানুভূতির দ্বার রুদ্ধ করিয়া দিবার বন্দোবস্ত।

পরিস্থিতি গুরুতর। কিন্তু প্রশাসনের দিকে বিচারব্যবস্থার ঢলিয়া পড়া রাষ্ট্রের এক গভীরতর অসুখের উপসর্গ। তাহা চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দেয়, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলি সকলের অলক্ষ্যে একটু একটু করিয়া কী রূপে অবস্থান পরিবর্তন করে, তাহার পরিণতিই বা কী। প্রশাসন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে অ-মানবিক হইয়া উঠিলে, আইনকে নিজ স্বার্থসিদ্ধির কাজে হাতিয়ার করিলেও এত দিন বিশ্বাস ছিল, বিচারব্যবস্থা নামক প্রতিষ্ঠানটি আছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় তাহার অবস্থান নিরপেক্ষ। অন্য প্রতিষ্ঠান যতই প্রভাবশালী হউক, দায় এড়াইয়া বা অপরাধ করিয়া তাহার হাত হইতে নিস্তার নাই। সেই বিচারপ্রতিমাই সমদর্শিতার বেদি হইতে নামিয়া, পক্ষপাতহীনতার বস্ত্রবন্ধন খুলিয়া ফেলিয়া প্রশাসনের প্রতি কৃপাদৃষ্টি নিক্ষেপ করিতেছে। এই রক্ষাকবচ থাকিলে প্রশাসনের যথেচ্ছাচার অনিবার্য। তাহাই হইতেছে। ভারত এক বার আমেরিকার আয়নায় মুখ দেখিয়া লইতে পারে।