প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর তথাকথিত সর্বদলীয় বৈঠক। এবং তাহার পর রাষ্ট্রপতির ভাষণের বক্তব্য। বুঝাই যাইতেছে, ভারতীয় জনতা পার্টির দ্বিতীয় দফার শাসনে ‘এক দেশ, এক ভোট’-এর বিষয়টি অগ্রাধিকার তালিকার একেবারে উপরে। প্রধানমন্ত্রী একটি কমিটি তৈরির সিদ্ধান্ত লইয়াছেন, যে কমিটি দেশব্যাপী ‘এক নির্বাচন’-এর বিষয়টি খতাইয়া দেখিবে। অর্থাৎ রাজধানীতে নানা দিক দিয়া এই পরিবর্তনের পক্ষে জনমত জড়ো করিবার আয়োজন চলিতেছে। লোকসভা এবং রাজ্য বিধানসভাগুলির ভোট একত্রে সারিবার নূতন নীতিতে ভারতকে লইয়া আসিতে হইলে কেবল ঘোষণাই যথেষ্ট নহে, কতকগুলি সাংবিধানিক পরিবর্তনও চাই। এবং সেই সংশোধনীগুলির চরিত্র রীতিমতো গুরুতর, কেননা সংবিধানের চরিত্রটিই ইহার ফলে পাল্টাইবার কথা। ভারতীয় সংবিধানের মধ্যে যে একক কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রের বদলে যুক্তরাষ্ট্রীয় আদর্শে চালিত রাষ্ট্রের অঙ্গীকার— ইহার ফলে তাহা বিনষ্ট হইবে। তাহাতে ক্ষতিই বা কী, লাভ কতখানি, এই সব লইয়া গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার প্রয়োজন। সেই আলোচনা বিভিন্ন স্তরে ঘটিবারও প্রয়োজন। কেবল জনপ্রতিনিধিরাই এই বিষয়ে মত প্রকাশের একমাত্র অধিকারী, না কি বিশেষজ্ঞ মহলের মতামত গ্রহণও জরুরি, তাহা ভাবা প্রয়োজন। তবে, স্পষ্টতই, রাজধানীর গত কয়েক দিনের সাত-তাড়াতাড়ি আয়োজন বলিয়া দেয়, রাজনৈতিক স্তরে বিষয়টির সত্বর মীমাংসা করিয়া ফেলাই কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশ্য। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জিতিয়া আসিবার পর রাজনৈতিক বলে বলীয়ান বিজেপির কার্যপদ্ধতির মধ্যেই ইঙ্গিত— এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়া তাহারা বড় কোনও রাজনৈতিক লাভের সন্ধানে ব্যস্ত। 

সন্ধানটি বোঝা কঠিন নহে। একসঙ্গে গোটা দেশে নির্বাচন সংঘটিত হইলে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যেমন সমন্বয় সম্ভব হইবে, তেমনই নির্বাচনের ফলাফলেও সমন্বয়ের সম্ভাবনা বাড়িবে। ভারতীয় নাগরিক পরিসরের উপর আস্থা রাখিয়াও বলা যায়, ইহার ব্যত্যয় ঘটা কেবল মুশকিল নয়, প্রায় অসম্ভব। বর্তমান কালে নির্বাচনী প্রক্রিয়া বহুলাংশে প্রচারনির্ভর, এবং সেই প্রচার প্রধানত অর্থবাহিত। সে দিক দিয়াও সরকারের কিছু মাথাব্যথা প্রত্যাশিত ছিল। ইভিএম ও ব্যালটের মধ্যে সংশয় ক্রমাগত শোনা যাইতেছে, ব্যালট পদ্ধতিতে ফিরিবার আবেদন ধ্বনিত হইতেছে, প্রার্থীদের খরচের বহরে আদালতও উদ্বিগ্ন হইয়াছে। কিন্তু সব কিছু বাদ দিয়া চলিতেছে দেশব্যাপী ‘এক ভোট’-এর নীতি প্রণয়নের আয়োজন। সুতরাং বর্তমান সরকার যে এই পথে একটি সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের চেষ্টায় রত, সেই অভিযোগকে অসার বলা যায় না।

প্রয়োজনীয় সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি লইয়াও গভীর প্রণিধান দরকার। আসমুদ্রহিমাচল বিধানসভাগুলিকে এক সময়ের সূত্রে গাঁথিতে হইলে কেবল যুক্তরাষ্ট্রীয়তার নীতি লঙ্ঘিত হয় না, প্রায়োগিক বিশৃঙ্খলাতেও উপনীত হইতে হয়। কোনও প্রদেশে বিধানসভা কোনও কারণে অসিদ্ধ হইয়া পড়িলেও মধ্যবর্তী নির্বাচন সে ক্ষেত্রে বাদ দিতে হইবে। অর্থাৎ কেবল নির্বাচনী নীতি নহে, সংসদ ও বিধানসভার কার্যরীতি ও গঠননীতিতেও সংশোধন লাগিবে। ‘ওয়ান নেশন ওয়ান ভোট’-এর পক্ষে প্রধান যুক্তি— তাহাতে সরকারি কাজকর্মের সময় বাড়িবে, নির্বাচনী ব্যয় কমিবে। প্রশ্ন উঠে, ভারতের মতো বৃহৎ গণতন্ত্রে সরকারি কাজকর্ম যদি এত দিন চলিয়া আসে, হঠাৎ করিয়া এখন এতখানি উদ্বেগ কেন, এবং নির্বাচনী ব্যয় যেখানে উত্তরোত্তর বাড়িতেছে, সেখানে সেই খরচকে নিয়ন্ত্রণ করা হইবে না কেন। এ সবের সন্তোষজনক উত্তর ছাড়া এত সুদূরপ্রসারী সংস্কার অত্যন্ত অবাঞ্ছিত। এবং বিপজ্জনক। ক্রমশ সংসদীয় গণতন্ত্র হইতে প্রেসিডেন্ট-শাসিত কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত হইতে না চাহিলে এই সংস্কার-ভাবনা সর্বতো পরিত্যাজ্য।