কাল ছিল আমাদের পয়লা বৈশাখ। কিন্তু বিশ্বের অধিকাংশ বাংলা ভাষাভাষী মানুষ ১৪ এপ্রিলে বাংলা নববর্ষ পালন করছেন। প্রতি বছরই করেন। আমরা পশ্চিমবঙ্গে এই দিনটি পালন করলাম ১৫ এপ্রিল। আজ থেকে ২২-২৩ বছর আগেই বাংলাদেশে বাংলা ক্যালেন্ডার সংস্কার করেছিল। সেই সংস্কার অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ভাবে মান্য গ্রেগরিয় ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি বছরে ১৪ এপ্রিল দিনটিই সে দেশে পয়লা বৈশাখ হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই মতো বর্ণাঢ্য উদ্‌যাপনও হয়ে আসছে। কিন্তু এ বঙ্গে এ সব নিয়ে কে মাথা ঘামায়? এখন যে ভাবে চলছে তাতে হিসেব বলছে, আজ থেকে ৯০০ বছর পরে পয়লা বৈশাখ পয়লা মে উদ্‌যাপিত হবে।

বাংলা সাল কবে থেকে শুরু হয় তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। আমরা, যাঁরা অত জটিলতায় যেতে চাই না, তাঁরা সোজাসাপ্টা ১৪২৫ বছর আগে বাংলা সাল শুরু হয়েছিল এটুকু মেনে নিতে পারি। অসুবিধা কোথায়? এই বাংলা সৌরবছরের গণনা অনুযায়ী পয়লা বৈশাখ নতুন বছরের সূচনা দিন হিসেবে পালিত হয় অসম, কেরল, মনিপুর, নেপাল, ওডিশা, পঞ্জাব, তামিলনাড়ু এবং ত্রিপুরাতেও।

গৌড়ের শাসক রাজা শশাঙ্কর আমলেই বাংলা সনের সূত্রপাত, এটা এখন নানা পাথুরে প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত। সূর্যসিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পৃথিবীর এক বার সূর্য প্রদক্ষিণে সময় লাগে ৩৬৫.২৫৮৭৫৬ দিন। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসেবে সূর্য প্রদক্ষিণে পৃথিবীর সময় লাগে ৩৬৫.২৪২২ দিন। তাই বাংলা পঞ্জিকায় এক বছর প্রকৃত এক বছরের চেয়ে ৩৬৫.২৫৮৭৫৬- ৩৬৫.২৪২২= ০.০১৬৫৫৬ দিন বা ২৩ মিনিট ৫০.৪৩৮৪ সেকেন্ড এগিয়ে রয়েছে। বাংলা সন প্রায় ২৪ মিনিট এগিয়ে থাকার ফলে প্রতি ৬০ বছরে ইংরেজি ক্যালেন্ডারে এক দিন বেড়ে যায়। রাজা শশাঙ্কর আমলে পয়লা বৈশাখ হত ২১/২২ মার্চ। ২১ মার্চ বা ৭ চৈত্র দিনটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ওই দিনটিকে মহাবিষুব বলে। ও দিন সারা পৃথিবীতে দিন-রাত সমান। সূর্য ও দিন ক্রান্তিবৃত্তের মহাবিষুব বিন্দুতে থাকে।

দিল্লি দখলের লড়াইলোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

ভারতে মুঘল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পরে সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের অবস্থানের উপরে নির্ভরশীল হওয়ায় তা দেশের কৃষির ফলনের সঙ্গে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদের খাজনা দিতে হত। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থা আনার জন্য মুঘল সম্রাট আকবর প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌরসন এবং আরবি হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে নতুন নিয়মে বর্ষপঞ্জী সংস্কার করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে এই সন গণনা শুরু হয়। এই সনের নাম ছিল ফসলি সন। এই ফসলি সন বাংলা ছাড়াও অন্যান্য প্রদেশে চালু হয় শাসকের ইচ্ছানুসারে। এই ফসলি সন আসলে সৌর-ক্যালেন্ডার মেনে ঋতু ভিত্তিক ফসল উৎপাদনের উপরে কর আদায়ের ব্যবস্থা। তবে এই ভাবনাটি শুধু সম্রাট আকবরের এটা বলা ঠিক নয়। আকবরের তিরিশ-চল্লিশ বছর আগে বাংলায় হুসেন শাহও ইসলামিক চান্দ্রবছর ও বাংলা সৌরবছরের তালমিলের চেষ্টা করেন। সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ বুঝতে পেরেছিলেন হিজরি চান্দ্র বছর হওয়ায় উৎসব অনুষ্ঠানের ঋতুকালীন তাৎপর্য বজায় থাকছে না।

স্বাধীন ভারতে ১৯৫৩ সালে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু পঞ্জিকা-রাজ্যে নৈরাজ্য দূর করতে ‘ক্যালেন্ডার রিফর্ম কমিটি’ গঠন করেন। বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা ছিলেন ওই কমিটির সভাপতি। এই কমিটি প্রস্তাব করে, ৪০০ বছরে ৯৭টি অধিবর্ষ (লিপইয়ার) গণনা করার। কমিটি প্রতিটি বাংলা মাসের দিন নির্দিষ্ট করে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। এই কমিটির প্রস্তাবে ছিল বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র এই মাসগুলি হবে ৩১ দিনে। আর আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ ও ফাল্গুন হবে ৩০ দিন; চৈত্র এমনিতে ৩০ দিনে এবং অধিবর্ষ হলে ৩১ দিন। 

পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৯৬৩ সালে নির্ভুল পঞ্জিকা তৈরির জন্য রাজ্য অ্যালম্যানাক কমিটি গঠন করেন। ওই বছর ২৯ মে বিধানসভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সূর্যসিদ্ধান্তের হিসেব এবং নীতিতে কোনও ভুল থাকলে তার উপযুক্ত সংশোধন করেই তিথি গণনা করতে হবে। সরকার জানিয়েছিল, পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবেচনা করে রাজ্যপাল কমিটির প্রস্তাবগুলি সানন্দে গ্রহণ করছেন। নির্ভুল পঞ্জিকা তৈরির জন্য সরকার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করবে। সেই কমিটি গঠিত হয়েছিল এবং কমিটি সূর্যসিদ্ধান্তের যে সব সংশোধনের কথা বলেছিল সেই অনুসারে ১৯৬৪ সালের ১৫ জুন পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যের পঞ্জিকা প্রস্তুকারীদের জন্য একটি আদেশনামা জারি করে। কিন্তু শেষপর্যন্ত তাতেও কাজ হয়নি। পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিজেই আজও অদৃকসিদ্ধ পঞ্জিকা অনুযায়ী ছুটির দিন ঘোষণা করে চলেছে। এ ব্যাপারে কি আমরা আরও একটু সক্রিয় হতে পারি না?