যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো—এই শব্দবন্ধ সম্প্রতি মুখে মুখে ফিরছে।যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো রক্ষার তাগিদ রাজনীতিকদের কথাবার্তায় যত বেশি করে অনুভূত হচ্ছে, তত বেশি করে সংশয় তৈরি হচ্ছে কাঠামোটার ভবিষ্যৎ নিয়ে।কে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো মেনে চলছেন, আর কে মেনে চলছেন না, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবির বন্যা বইছে। জনসাধারণের জন্য হেঁয়ালি আরও দু্র্ভেদ্য হয়ে উঠছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শুক্রবার বঙ্গ সফর করলেন। জলপাইগুড়িজেলার ময়নাগুড়িতে তিনি জনসভা করলেন। সেই সভাস্থল থেকেই উদ্বোধন করলেন কলকাতা হাই কোর্টের জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চের। সেই উদ্বোধন ঘিরেই তৈরি হয়েছে বিতর্ক।

 জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চের উদ্বোধন যে শুক্রবার হবে, বৃহস্পতিবার তা জানা গিয়েছিল। বৃহস্পতিবারই সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন রাজ্যের আইনমন্ত্রী মলয় ঘটক।শুক্রবার আরও উচ্চস্বরে তোপ দাগলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্য সরকারকে অন্ধকারে রেখে একতরফাভাবে এই উদ্বোধন কর্মসূচি ঘোষিত এবং পালিত হয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করলেন। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরোয়াই করছে না নরেন্দ্র মোদীর সরকার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই রকমই অভিমত প্রকাশ করলেন।

সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না একেবারেই। জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চের উদ্বোধন অবশেষে হল, এ নিশ্চয়ই সুখবর। কিন্তু এই বেঞ্চ গঠনের ইতিহাস বলবে যে, বেঞ্চ উদ্বোধনের দিন রাজ্য সরকারকে উপেক্ষা করা ঘোর অনৈতিক। প্রায় আড়াই দশকের প্রচেষ্টার ফলএই জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চ। বামফ্রন্ট জমানায় পর্বটার সূত্রপাত, পরে তৃণমূল সরকারের হাত ধরে দাবি পূরণ। কেন্দ্রীয় সরকারও অবশ্যই গোটা প্রক্রিয়ার অন্যতম অংশীদার। অতএব, কেন্দ্র, রাজ্য এবং হাইকোর্টের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতেই সার্কিট বেঞ্চের উদ্বোধন হওয়া কাম্য ছিল।কিন্তু তা হল না। প্রধানমন্ত্রী একাইসার্কিট বেঞ্চের উদ্বোধনকরে দিয়ে গেলেন।

আরও পড়ুন: ক’টা ধর্না করবেন করুন, লুটেরাদের বাঁচাতে পারবেন না: মমতাকে চ্যালেঞ্জ মোদীর

মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষোভপ্রকাশ অযৌক্তিক নয় অতএব। কিন্তু রাজ্যের বিরুদ্ধেও তো কেন্দ্র একই রকম অভিযোগ তুলেছে। ক্ষোভ তো কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তাদেরও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনার আওতায় নির্মিত বিভিন্ন রাস্তা তৈরির কৃতিত্ব রাজ্য সরকার নিজের নামে নিতে চাইছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের নাম ও বিবরণ সম্বলিত বোর্ডে ‘প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা’ মুছে ‘বাংলা সড়ক যোজনা’ লেখা হচ্ছে—এমন ছবি ও ভিডিয়ো মিডিয়ায় এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে।কেন্দ্রের কর্তারা এই বোর্ড বিকৃতির দিকে আঙুল তুলে বলছেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকারই যুক্তরাষ্ট্রীয় সৌজন্য লঙ্ঘন করছে। সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে আরও নানা ক্ষেত্রে। আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য টানাপড়েন তীব্র হয়েছে। কৃষকেরঅ্যাকাউন্টে ফসল বিমার টাকা ঢোকানোর অধিকার কার তা নিয়েও চাপানউতর দেখা গিয়েছে। সংঘাত বাড়তে বাড়তে সিবিআই এবং কলকাতা পুলিশ পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রায় সম্মুখ সমরে নেমে পড়েছে। তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ধর্নায় বসেছেন, গোটা দেশ তোলপাড় হয়ে গিয়েছে। কেন্দ্র এবং রাজ্য পরস্পরবিরোধী তৎপরতা বাড়িয়েছে।

আরও পড়ুন: ‘ম্যাডি বাবুই দুর্নীতির মাস্টার’, মোদীকে পাল্টা তোপ মমতার

এই পরিস্থিতি কোনও মূল্যেই কাম্য নয়। সিবিআই এবং কলকাতা পুলিশের দ্বন্দ্বের জেরে তিক্ততা যতদূর পৌঁছেছিল, তাতেই শেষ হল না। শুক্রবার জলপাইগুড়িতে হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চের উদ্বোধন হওয়ায় তিক্ততা আরও বাড়ল।

সংঘাতের ক্ষেত্রে সম্ভবত প্রস্তুত হচ্ছিল অনেকদিন আগে থেকেই। কেন্দ্রের মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় এবং রাজ্যের মন্ত্রী মলয় ঘটকের মধ্যে উদ্বোধন নিয়ে টানাপড়েন আমরা আগেও দেখেছি। একই প্রকল্পের দু’বার উদ্বোধন হতেও দেখেছি।সেই পরিস্থিতিও কাম্য ছিল না। কিন্তু বাবুল সুপ্রিয় এবং মলয় ঘটক যখন সম্মুখ সমরে নামেন, তখন সামলানো সম্ভব হয়। কারণ তাঁদের রাশটা টেনে ধরার জন্য মাথার উপরে তাঁদের রাজনৈতিক অভিভাবকরা রয়েছেন। কিন্তু প্রবল সংঘাতের এক প্রান্তে যখন থাকেন নরেন্দ্র মোদী এবং অন্য প্রান্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তখন রাশ টানবেন কে? পরিস্থিতি সামলাবেন কে?

প্রত্যেকেরই মনে রাখা উচিত ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং ভারতের গণতন্ত্র কিন্তু ভারতবাসীর গর্বের বিষয়। সত্তর বছর ধরে সাফল্যের সঙ্গে যেভাবে উন্নতশির ভারতের গণতন্ত্র, এই উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে তা বহুমূল্য। শুধু এই উপমহাদেশে নয়, তার আশপাশে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা অধিকাংশ দেশেই গণতন্ত্র নিজের স্থিতিশীলতা প্রমাণ করতে পারেনি। ভারতে পেরেছে। তাই রাজনৈতিক সংঘাত এমন কোনও পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়, যেখানে এই গরিমা ম্লান হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।