কৃষকের মৃত্যু হইলেই সরকার দুই লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিবে, এ হেন নীতি ঘোষিত হইলে প্রথম প্রশ্নটি অনিবার্য— টাকা জোগাইবে কে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানাইয়াছেন, প্রয়োজনে অন্যান্য খাতে খরচ কমাইয়া এই টাকার ব্যবস্থা হইবে। রাজনীতি এখন কৃষকের খেতে বহিতেছে। দেশ জুড়িয়াই ঋণ মকুব আর সাহায্যের ঢল। কৃষিপ্রধান পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর নিকট উপায়ান্তর ছিল কি না, সেই প্রশ্নটি থাকিবে। নির্বাচন আসিলে রাজকোষ উজাড় করিয়া কৃষকের মন জিতিবার দোষে একা তাঁহাকে দুষ্ট বলিবার উপায় নাই। কিন্তু, এই প্রশ্নগুলি গৌণ। অত্যন্ত জোরের সঙ্গে একটি কথা বলা প্রয়োজন। সরকার যদি কোনও একটি খরচকে অপরিহার্য জ্ঞান করে, প্রয়োজনে আর সব খরচ বন্ধ করিয়াও সেই খরচটি করা যায়। রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষায় ইহাকে ‘র‌্যাডিকাল নিড’ বলা চলিতে পারে। অর্থাৎ, এমন একটি প্রবল অবশ্যপ্রয়োজন, যাহার সহিত কোনও আপস করা চলিবে না, যাহা পূরণ করিতে বিন্দুমাত্র বিলম্ব সহ্য করা হইবে না। কৃষককে অর্থসাহায্য করা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তেমন অবশ্যপ্রয়োজন জ্ঞান করিতেই পারেন। কিন্তু, তাহা মুখের কথায় নহে। কেন কৃষির বা কৃষকের দাবি রাজ্যের আর সব দাবির ঊর্ধ্বে; কেন কৃষকের জন্য অর্থবরাদ্দের কাজটি কোনও কারণেই অপেক্ষা করিতে পারে না, কোনও যুক্তিতেই খণ্ডিত হইতে পারে না— তাহা প্রতিষ্ঠা করিবার দায়িত্বটিও মুখ্যমন্ত্রীর উপরই বর্তাইবে। সেই অর্থের দাবি কেন জীবিত কৃষকের নহে, মৃত কৃষকের, তাহাও বলিতে হইবে। তিনি যদি কৃষকের মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ প্রদানকে অবশ্যপ্রয়োজন হিসাবে প্রতিষ্ঠা করিতে পারেন, অর্থসংস্থান সংক্রান্ত ভাবনা নেহাতই দ্বিতীয় সারির সমস্যা হিসাবে গণ্য হইবে। 

আরও কিছু প্রশ্ন থাকিবে। যেমন, কৃষকের দাবিই অবশ্যপ্রয়োজন কেন, শ্রমিকের দাবি কেন নহে— বিশেষত, যে রাজ্যের অধিকাংশ শ্রমিকই অসংগঠিত ক্ষেত্রে নিযুক্ত। কৃষকরা সংখ্যায় অধিকতর, ইহা রাজনীতির যুক্তি হইতে পারে, ন্যায্যতার যুক্তি নহে। কৃষক-মৃত্যুকে ক্ষতিপূরণ প্রকৃত প্রস্তাবে একটি বিমাব্যবস্থা। কৃষকদের তরফে রাজ্য সরকারই সেই বিমার প্রিমিয়াম প্রদান করিবে। কোনও বিমা সংস্থাকে প্রিমিয়াম দেওয়া হইবে, না কি সরকারই রাজকোষ হইতে ক্ষতিপূরণের টাকা জোগাইবে, সেই প্রশ্নগুলি গৌণ। নিহিত সত্য: সরকার কৃষকদের জীবনবিমার ব্যবস্থা করিতেছে। অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক, গৃহবধূ, আদিবাসী, যৌন সংখ্যালঘু বা এমন কোনও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিমার দাবি কেন কৃষকদের তুলনায় কম, মুখ্যমন্ত্রী বলেন নাই। এই উত্তরটি অপরিহার্য। কৃষিক্ষেত্রে যদি টাকা খরচ করিতেই হয়, তবে তাহা মৃত্যুপরবর্তী ক্ষতিপূরণ হিসাবে ব্যয় করা ভাল, না কি কৃষির দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির স্বার্থে? তাহারও তর্কাতীত উত্তর থাকা প্রয়োজন। এই গোত্রের বিমার টাকা যে পরিবারের প্রধান উপার্জনশীল মানুষের আকস্মিক মৃত্যুর পর খুবই কাজে লাগিতে পারে, তাহা লইয়া প্রশ্ন নাই। কিন্তু, একটি বিপন্ন পরিবারের কিছু দিনের জীবনজীবিকা নিশ্চিত করা রাজ্যের পক্ষে অধিকতর জরুরি, না কি আরও অনেক বেশি সংখ্যক— তুলনায় কম বিপন্ন— পরিবারকে উন্নয়নের পথে কয়েক কদম অগ্রসর করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ? সেই প্রশ্নের মীমাংসা না করিলে তো ‘র‌্যাডিকাল নিড’ প্রতিষ্ঠিত হইবে না। এবং শুধু মুখের কথা নহে, উত্তরগুলির পিছনে উন্নয়ন অর্থনীতির, কল্যাণরাষ্ট্রের দার্শনিক যুক্তি থাকা জরুরি। মুখ্যমন্ত্রী এই প্রশ্নগুলিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়া ভাবিয়াছেন কি? তাঁহার সিদ্ধান্তের পিছনের তাগিদটি ভোটের রাজনীতির, না কি প্রকৃত উন্নয়নচিন্তার, সেই নিষ্পত্তি পরে হইলেও চলিবে। কিন্তু, শুধু সদিচ্ছা থাকাই যে জরুরি নহে, তাহাকে যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করিয়া লইতেই হইবে, তিনি এই কথাটি স্মরণে রাখিতে পারেন।