• Abhijit
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

নগদেই গরিবের ভাল, বললেন অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

এখন কি সংস্কারের সময়

যাঁরা সত্যিই দরিদ্র, তাঁরা কেন্দ্রের প্যাকেজে লাভবান হবেন না। যে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ গিয়েছে, তাঁকে এখনই টাকা দেওয়া দরকার ছিল।

Migrant Labourer
  • Abhijit

প্রশ্ন: ২০ লক্ষ টাকার আর্থিক প্যাকেজ দেখে কী মনে হচ্ছে?

অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়: মনে হচ্ছে যে কেন্দ্রীয় সরকার ধরে নিচ্ছে, জোগানের দিকটা যদি জোরদার করা যায়, তা হলে চাহিদা বৃদ্ধির সমস্যা হবে না। শেষ অবধি তা সত্যিই হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়। প্রথমত, বরাদ্দ টাকা শেষ অবধি রাজ্যগুলোকেই খরচ করতে হবে। রাজ্যগুলোর খরচ করার ক্ষমতা থাকা চাই। একশো দিনের কাজের প্রকল্পের জন্য বাড়তি চল্লিশ হাজার কোটি টাকাও সম্পূর্ণ খরচ হবে কি না, তা নির্ভর করবে রাজ্যগুলো যথেষ্ট কাজ দিতে পারবে কি না, তার উপর। প্রকল্পে যথেষ্ট কর্মদিবস তৈরি না হলে প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ টাকা মানুষের হাতে আসবে না। আমার আশঙ্কা, ওই বাড়তি টাকা পুরোটা খরচ না-ও হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, রাজ্য খরচ করতে আগ্রহী ও তৎপর হলেও কতটা বাড়তি খরচ হবে, তা পরিষ্কার নয়। এত দিন রাজ্যগুলো তাদের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের তিন শতাংশ ধার নিতে পারত, কেন্দ্র এ বার পাঁচ শতাংশ অবধি ধার নেওয়ার অনুমতি দিল। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, সেই অনুমতি না পেলে কি রাজ্যগুলো বাড়তি খরচ করত না? আমরা প্রায়ই দেখি যে রাজ্যের হাতে যথেষ্ট টাকা থাকে না, তারা সীমা ছাড়িয়েও ধার করে খরচ করে ফেলে। এই জন্য রাজ্যগুলোর বাজেট ঘাটতি সামলানো কঠিন হয়। এখন কেন্দ্র আরও বেশি ধার করার অনুমোদন দিল, তাই বাড়তি খরচ বৈধ হল। সেটা ভাল কথা। কিন্তু অনুমোদন না এলেও হয়তো বেশ কিছু টাকা বাড়তি খরচ করত রাজ্যগুলো। কেন্দ্র দাবি করছে, এখন বাড়তি দু’লক্ষ কোটি টাকা রাজ্যগুলো খরচ করতে পারবে। কিন্তু ওই টাকা বস্তুতই ‘বাড়তি’ কিনা, সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ হওয়া যাচ্ছে না। আমার ধারণা, মোট চাহিদা মেটাতে হলে রাজ্যগুলোর যত টাকা প্রয়োজন, তার অঙ্কটা আরও বেশি।

প্র: যে সঙ্কট চলছে, তার মোকাবিলার জন্য কি কেন্দ্রের সিদ্ধান্তগুলি উপযুক্ত?

উ: কিছু সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে অবশ্যই কাজে লাগবে। যেমন, প্রতিটা জেলায় যদি সংক্রামক ব্যাধির জন্য কেন্দ্র তৈরি হয়, তা অবশ্যই কাজে দেবে। কিন্তু এখনই তা কতটা কার্যকর হবে, সে প্রশ্নটা থেকে যায়। আজ যদি কেন্দ্র তৈরির সিদ্ধান্ত হয়, তা হলে সরঞ্জাম কেনা, যথেষ্ট কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবে। হয়তো পাঁচ বছরে কেন্দ্র সম্পূর্ণ করার পরিকল্পনা নিয়ে নামতে হবে। এখনই তা থেকে খুব কিছু প্রত্যাশা করা যায় না। তেমনই, অনেকগুলো সংস্কার ঘোষণা করেছে কেন্দ্র, যেগুলোর কথা আগেই উঠেছিল। যেমন কৃষি বিপণনে নীতির পরিবর্তন, যার প্রয়োজন আছে বলে আমিও মনে করি। কৃষিনীতি যখন তৈরি হয়েছিল, তার থেকে এখন পরিকাঠামোয় অনেক পরিবর্তন এসেছে। পণ্য পরিবহণের গতি অনেক বেড়েছে। তাই নীতিতেও পরিবর্তন দরকার। কিন্তু এই মুহূর্তে তার চেষ্টা কতটা সম্ভব? এখন সরকারি কর্মীরা প্রাণপণ কাজ করে চলেছেন অতিমারির বিপর্যয় সামলাতে। সরকার যেগুলো করতে চাইছে, সেই সব সংস্কারের অনেকগুলোই সমর্থন করি, কিন্তু তার জন্য এটা উপযুক্ত সময় কি না, আমি নিশ্চিত নই।

দরকার ছিল চাহিদা বাড়াতে উৎসাহ দেওয়া। খুব খুঁটিয়ে হিসেব করিনি, কিন্তু কেন্দ্র যে ২০ লক্ষ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, তার হয়তো কম-বেশি দু’লক্ষ কোটি যাবে সরাসরি চাহিদা বাড়াতে। অধিকাংশই যাবে জোগানের দিকে। এই বৃহৎ পরিমাণ টাকা ক্রমে ক্রমে খরচ হবে, এটাই প্রত্যাশিত। খরচ হলে তবে মানুষের হাতে টাকা আসবে, তবে সে খরচ করতে পারবে, চাহিদা বাড়বে, কিন্তু তাতে হয়তো বেশ খানিকটা সময় লেগে যাবে।

প্র: দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই ঘোষণা হল বেশি। 

উ: অতিমারির সময়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করার উদ্যোগ দেখে কিছু উদ্বেগ তৈরি হয়। যেমন, এর ফলে রোগ প্রতিরোধ করার জরুরি কর্তব্য থেকে নজর সরে আসবে না তো? সরকারের সিদ্ধান্তগুলো খুব বড় মাপের, অনেকগুলোই বেশ বিতর্কিত। যেগুলো নিয়ে তেমন দ্বিমত নেই, সেগুলোও ঠিক মতো রূপায়ণ করতে চাইলে অনেকটা সময় আর প্রচেষ্টা দরকার। আমি এর কিছু সিদ্ধান্ত সমর্থন করি, কিন্তু এ-ও মনে করি যে আজ, এই সময়ে যা করা দরকার, সেই কর্তব্য করার গুরুত্বটা কখনওই লঘু করে দেখা চলে না। বিশেষত যখন আমাদের প্রশাসনিক ক্ষমতা সীমিত, এবং সেরা কর্মীরা অতিমারিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সম্পূর্ণ নিয়োজিত রয়েছেন। যদি মনে করতে পারতাম যে সঙ্কট অনেকটাই কেটে গিয়েছে, তা হলে এত দুশ্চিন্তা করতে হত না। কিন্তু বাস্তব এটাই যে লকডাউনের পর সুনিয়ন্ত্রিত ভাবে, ধাপে ধাপে জনজীবনকে স্বাভাবিক করা একটা কঠিন কাজ। প্রতি মুহূর্তে নিশ্চিত করতে হবে যে সংক্রমণের বিস্ফোরণ যেন না হয়। এখন তার উপরেই মনোনিবেশ করতে হবে। সংস্কার শুরুর জন্য খুব ভাল সময় এটা নয়।

প্র: অনুদান না দিয়ে, বেশি করে ঋণ দেওয়ার পক্ষপাতী সরকার। যদি চাহিদা বৃদ্ধিই সব চাইতে জরুরি হয়, তা হলে এই নীতি কতটা কার্যকর হবে?

উ: এই নীতি কাজ করবে কি না, তা নির্ভর করবে তিনটে প্রশ্নের উত্তরের উপরে। প্রথম প্রশ্ন, ব্যাঙ্ক কি সত্যিই ঋণ দেবে?  অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ব্যাঙ্ক মুখে আগ্রহ দেখালেও, কাজের বেলায় নানান বাহানায় ঋণ দিতে চায় না। ব্যাঙ্কের ভূমিকা নির্ভর করবে কেন্দ্রের উপরেও। কেন্দ্র যদি ঋণ দেওয়ার অঙ্গীকার করেও আসলে টাকাটা দিতে জোর না করে, তবে ব্যাঙ্কও মুঠো খুলবে না। কেন্দ্র যদি সত্যিই চাপ তৈরি করে, তা হলে ব্যাঙ্ক ঋণ দিতে পারে।

দ্বিতীয় প্রশ্ন, ঋণ নিতে মানুষ কতটা আগ্রহী হবেন? ঋণ নিয়ে ব্যবসা করে টাকা শোধ দিতে হবে। সেটা তখনই সম্ভব যদি পণ্য বা পরিষেবার চাহিদা থাকে। যদি ছোট মাপের কারিগর, ব্যবসায়ী বা কর্মীরা মনে করেন যে বাজারে তাঁদের পণ্য বা পরিষেবার চাহিদা নেই, তা হলে তাঁদের ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন নিয়ে সংশয় থাকবে। ঋণের চাহিদা না থাকলে, ঋণের জোগান দিতে চেয়েও লাভ নেই।

তৃতীয় প্রশ্ন, ঋণ শোধ না করলে তার ঝুঁকি কতটা? ঋণখেলাপি গ্রাহকের প্রতি সরকার (বা ব্যাঙ্ক) কতটা কঠোর হবে? যদি মানুষের মনে এমন আস্থা থাকে যে সরকার নমনীয় থাকবে, ব্যবসার জন্য ঋণ নিয়ে এই দুঃসময়ে টাকাটা অন্ন-বস্ত্রের সংস্থানে লাগিয়ে ফেললে ঘটি-বাটি কেড়ে নিয়ে যাবে না, তা হলে হয়তো তাঁরা কিছুটা ঝুঁকি নিয়েও ঋণ নিতে পারেন। এখন যে সরকার কোনও বন্ধক ছাড়াই ঋণ দিচ্ছে, তাতে হয়তো সাহস করে কিছু লোক ব্যবসা শুরু করতে পারেন, আর তাতে চাহিদাও কিছুটা বাড়তে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ঋণ নেওয়ার উৎসাহ অনেকটাই নির্ভর করবে ঋণ নেওয়া কতটা নিরাপদ, সেই ধারণার উপরে। ভয় পেলে ঋণ দিতে চেয়েও কাজ হবে না।

তাই কেন্দ্রের ঘোষিত নীতিতে চাহিদাকে উৎসাহ দেওয়া অসম্ভব নয়। মনিটারি পলিসি বা আর্থিক নীতি ব্যবহার করেও চাহিদা উস্কে দেওয়া যায়।

প্র: কিন্তু ঋণ দেওয়ার চাইতে সরাসরি পাঁচ হাজার কি সাত হাজার টাকা দরিদ্রের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠালে তা কি বেশি কাজে দিত না?

উ: হ্যাঁ, দরিদ্রের জন্য সেটা ভাল হত। যাঁরা সত্যিই দরিদ্র, তাঁরা কেন্দ্রের প্যাকেজে লাভবান হবেন না। যে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ গিয়েছে, তাঁকে এখনই টাকা দেওয়া দরকার ছিল। অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অবশ্যই কাজে দেয়, সেই খাতে খরচ করা নিশ্চয়ই ভাল। কিন্তু এখন যে সঙ্কট চলছে, তার মোকাবিলায় দরিদ্রকে সরাসরি টাকা দেওয়া দরকার। এই প্যাকেজ যতটা ব্যবসায়ীর দিকে গিয়েছে, দরিদ্রের দিকে অতটা নয়।

 

সাক্ষাৎকার: স্বাতী ভট্টাচার্য

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন