Advertisement
E-Paper

দানবী বা দেবী নন, ঋতুমতী মহিলাদের শুধু মানুষ ভাবুন

আমাদের বাড়িতে কাজ করত আনোয়ারা। ছোট ছেলে রহিমকে নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে কাজ করতো। মা এক বাটি মুড়ি দিত রহিমকে। রহিম তা ফেলে-ছড়িয়ে খাওয়ার ফাঁকে আনোয়ারা বাসন মাজা, ঘর মোছা, কুটনো কোটার কাজ সেরে ফেলত।

অমিতাভ পুরকায়স্থ

শেষ আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০১৬ ০০:০০

আমাদের বাড়িতে কাজ করত আনোয়ারা। ছোট ছেলে রহিমকে নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে কাজ করতো। মা এক বাটি মুড়ি দিত রহিমকে। রহিম তা ফেলে-ছড়িয়ে খাওয়ার ফাঁকে আনোয়ারা বাসন মাজা, ঘর মোছা, কুটনো কোটার কাজ সেরে ফেলত। ঠাকুরঘর মোছার দায়িত্বও ছিল তার। কিন্তু মাঝে মাঝে দেখতাম যে আনোয়ারা বাকি সব ঘর মুছলেও ঠাকুরঘরে ঢোকে না। সেই দিনগুলো মা নিজেই ঠাকুরঘর মুছত।

যে উদারমনা পরিবারে ধর্ম, জাতপাতের নিষেধ মানা হয় না, সেখানেও ঋতুস্রাব-সংক্রান্ত বাধা অনতিক্রম্য। সমাজে এর চেহারাটা কেমন, তার ধারণা তৈরি হয় ২০১০ সালে, ঋতুস্রাব-কালীন স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে স্কুলগুলোতে কথা বলতে গিয়ে। দেখা গেল, পর্যাপ্ত শৌচাগার না থাকায় প্রচুর সদ্য-কিশোরী স্কুলছুট হয়ে পড়ছে। ঋতুস্রাবের সময়ে মেয়েদের যা যা প্রয়োজন, তার ব্যবস্থাও স্কুলে নেই। এই সময়ে পালনীয় স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে মেয়েরা প্রায় কিছুই জানে না। বাড়িতে আলোচনা হয় না, মায়েরাও মেয়েদের তথ্য দিচ্ছেন না। একটা স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়াকে গোপন করা হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে গুচ্ছের অনুশাসন। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগদান নিষিদ্ধ, তুলসী গাছ ছোঁয়া যাবে না, আচারে হাত দেওয়া বারণ, রান্নাঘরে ঢোকা, স্নান করা, খাবার জিনিস ছোঁয়া নিষেধ। মেদিনীপুরের কিছু গ্রামে পানের বরোজেও ঢোকা চলে না। স্কুল বন্ধ, খেলাধুলাও। কার্যত সামাজিক বহিষ্কার। ছেলেদের সঙ্গে তুলনা করে নিজেদের হীন ভাবতে শুরু করে মেয়েরা, যা ভবিষ্যতে তাদের আত্মসম্মান বোধের বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

ঋতুস্রাবকে ‘অশুচি,’ ‘লজ্জাজনক’ করে রাখার প্রভাব পড়ে মেয়েদের স্বাস্থ্যে। এ দেশে মাত্র ১২ শতাংশ মহিলা স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন। অধিকাংশের ভরসা কাপড়ের টুকরো, যা পরিষ্কার করা, রোদে শুকানো হয় না। ভারতে ‘মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন’ নিয়ে কাজের পথিকৃৎ অরুণাচল মুরুগানাথম একটি বক্তৃতায় বলেছিলেন, তাঁর স্ত্রী ঋতুকালীন সুরক্ষার জন্য যে ন্যাকড়া ব্যবহার করতেন, তা দিয়ে তিনি স্কুটারও মুছতেন কি না সন্দেহ। কাপড় ছাড়া যা ব্যবহার হয়, তার মধ্যে আছে ছাই, বালি, কাঠের গুঁড়ো, গাছের পাতা, সব! অপরিচ্ছন্নতার মাশুল যোনিপথে সংক্রমণ। জরায়ুর ক্যান্সার হওয়াও বিচিত্র নয়।

Advertisement

এখন বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগে স্যানিটারি ন্যাপকিন সহজলভ্য করার চেষ্টা চলছে। ভাল কথা। কিন্তু ব্যবহৃত ন্যাপকিন ফেলার কী ব্যবস্থা হবে? ব্যবহৃত ন্যাপকিনগুলি আবর্জনার স্তূপে উন্মুক্ত ভাবে পড়ে থাকে। তবে এখন স্কুলগুলিতে মেয়েদের যে শৌচাগার তৈরি হচ্ছে, তার দেওয়ালে একটি গর্ত দিয়ে ব্যবহৃত বর্জ্য ফেলে দেওয়া যায়। কিছু দিন অন্তর চুল্লিতে আগুন জ্বালিয়ে তা পুড়িয়ে ফেলা হয়। অনেক স্কুলে অভিভাবকরা এতে আপত্তি করেছেন। তাঁদের বিশ্বাস, ঋতুস্রাবের রক্ত-মিশ্রিত বস্তু পুড়িয়ে ফেললে তা নাকি মেয়ের শরীরের ক্ষতি করবে।

কিছু শিক্ষিকার মনোভাবও বিচিত্র। অনেক স্কুলে নতুন বাথরুম তালা বন্ধ করা থাকে। শিক্ষাকর্মীরা বলেন, ‘এই সব ওদের দিয়ে কী হবে? ওরা তো ব্যবহারেই অভ্যস্ত নয়। গিয়ে দেখুন না ক’জনের বাড়িতে শৌচাগার আছে?’ ছাত্রীদের ঋতুকালীন স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে আলোচনায় যোগ দিতেও অনেকে অস্বীকার করেছেন। এমনও শুনেছি যে, ‘এইটাও কি স্কুলে এসে শিখতে হবে? বাড়ির লোকেরা কী করছে?’ আবার এমনও শিক্ষিকাকে পেয়েছি যাঁরা ছাত্রীদের দিকে নিজের থেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

কাজের জায়গায় ঋতুমতী মহিলাদের প্রতি সংগঠিত বৈষম্যের জ্বলন্ত উদাহরণ এই কিছু দিন আগে খবরের কাগজে দেখা গিয়েছে। কেরলের এক কারখানার শৌচাগারে ব্যবহৃত ন্যাপকিন পাওয়া যায়। সেই ‘অপরাধী’ চিহ্নিত করতে প্রায় চল্লিশ জন মহিলাকর্মীকে বিবস্ত্র করে তল্লাশি করা হয়েছিল। এই নিয়ে প্রচুর প্রতিবাদ হয়েছিল তখন। ঋতুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর অভাব মেয়েদের কর্মক্ষেত্রে একটা বড় মুশকিল। শুধু অফিসের কথা নয়। একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার দিগম্বরপুরে মৎস্যজীবী মহিলাদের নিয়ে দল তৈরি করে তাঁদের মাছ চাষের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তাঁরা মাছ উৎপাদন করে তা নিজেরাই বাজারে বিক্রি করবেন। প্রশিক্ষণ চলাকালীন এক মাঝবয়সি মহিলা বললেন ‘সারা দিন যে বাজারে ব্যবসা করব, সেখানে তো বাথরুমের ব্যবস্থা নেই। কাজ হবে কী করে?’

ঋতুস্রাব ও তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ভয়, কুসংস্কার আর অধিকার হরণের যে জগদ্দল পাথর চেপে বসেছে সমাজের ওপর, তার একটা বিকল্প পাঠ কিন্তু আমাদের ধর্মীয়-সাস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্যেই আছে। পবিত্র একান্ন পীঠের একটি কামরূপ কামাখ্যা, যেখানে সতীর যোনি পতিত হয়েছিল। অম্বুবাচীর সময় তিন দিন মন্দির বন্ধ থাকে আর চতুর্থ দিন থেকে শুরু হয় বাৎসরিক মেলা ও উৎসব। কথিত আছে যে এই তিন দিন দেবী বাৎসরিক ঋতুচক্রের মধ্যে দিয়ে যান। মন্দিরটি পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে খ্যাত।

আমাদের দেশে বাউল, ফকির, দরবেশ, সাঁই ইত্যাদিদের অনেকের ধর্মেই কিছু গোপন ক্রিয়াকলাপ আছে, যা গুরু থেকে শিষ্যে প্রবাহিত হতে থাকে। কিছু গোষ্ঠী চারচন্দ্রের সাধনা করেন, যার মধ্যে ঋতুস্রাবের রক্ত একটি পবিত্র সাধন উপকরণ।

তবে একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে ঋতুস্রাবের রক্ত বা ঋতুমতী মহিলার কোন অতিপ্রাকৃতিক শক্তি নেই। হয় দানবী নয় দেবী, এই দুই বিন্দুর মধ্যে আটকে আছে আমাদের চিন্তা। এক জন সাধারণ মানুষ একটি সাধারণ শরীরবৃত্তীয় চক্রের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, এর মধ্যে অন্য কোনও মানে খোঁজা অর্থহীন।

এক জন মানুষকে ‘মেয়ে’ নয়, শুধু মানুষ হিসাবে দেখার অভ্যাস করুক সমাজ। সুরক্ষিত হোক মেয়েদের মানবাধিকার।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy