Advertisement
E-Paper

আরোগ্য-নিকেতন

রা জ্য বাজেট পেশ করিবার সময় অর্থমন্ত্রীর কি জীবনমশাই-এর কথা মনে পড়িয়াছিল? ‘আরোগ্য-নিকেতন’ উপন্যাসের সেই বৃদ্ধ চিকিৎসক, যিনি নাড়ির গতিতে বুঝিতেন কাহার দিন ফুরাইয়াছে, কোনও চিকিৎসাতেই আর কিছু হইবার নহে। পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির নাড়ি অমিত মিত্রের হাতে ধরা। তিনিও সম্ভবত টের পাইয়াছেন, আর কিছু করিবার নাই।

শেষ আপডেট: ২৭ জুন ২০১৬ ০০:০০

রা জ্য বাজেট পেশ করিবার সময় অর্থমন্ত্রীর কি জীবনমশাই-এর কথা মনে পড়িয়াছিল? ‘আরোগ্য-নিকেতন’ উপন্যাসের সেই বৃদ্ধ চিকিৎসক, যিনি নাড়ির গতিতে বুঝিতেন কাহার দিন ফুরাইয়াছে, কোনও চিকিৎসাতেই আর কিছু হইবার নহে। পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির নাড়ি অমিত মিত্রের হাতে ধরা। তিনিও সম্ভবত টের পাইয়াছেন, আর কিছু করিবার নাই। তাঁহার পক্ষে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ যত দূর বাড়ানো সম্ভব, তিনি বাড়াইয়া ফেলিয়াছেন। যুক্তমূল্য কর আরও এক শতাংশ বৃদ্ধি করিয়া লাভ হইবে না। কেন্দ্রের নিকট হইতেও যাহা পাওনা, তাহা পাইতেছেন— রাজ্যের মোট রাজস্বের প্রায় ৬০ শতাংশই দিল্লি হইতে আসে। এই অবস্থায় একটিই উপায় ছিল: অস্ত্রোপচার। সরকারি নীতি হইতে জনমোহিনী রাজনীতিকে সম্পূর্ণ ছাঁটিয়া ফেলিয়া তাহাকে শিল্পায়নের পথে ঠেলিয়া দেওয়া। কিন্তু, রোগীর অভিভাবক, দিদি, সেই চিকিৎসায় মত দিবেন না, তাহা মিত্রমহাশয় বিলক্ষণ জানেন। অতএব, তিনি ‘ঋণের বোঝা’ নামক রোগটির কথা বলিয়া কিঞ্চিৎ পথ্যের ব্যবস্থা করিয়াই হাত গুটাইয়া ফেলিয়াছেন। পথ্যটি পরিচিত, কেইনসীয় অর্থনীতি— রাজ্য সরকার মূলধনী খাতে ব্যয় বাড়াইবে, এবং তাহার ‘মাল্টিপ্লায়ার এফেক্ট’-এ রাজ্যের আয় বাড়িবে, তাহার টানে রাজস্ব। কিন্তু, চিকিৎসার কাজ পথ্যে হয় না। অতএব, মৃত্যু নিশ্চিত জানিলে জীবনমশাই যেমন অহেতুক কালক্ষেপ করিতেন না, অমিত মিত্রও এই বাজেটে তেমনই অনুদ্বিগ্নমনা।

ফলে, বাজেটে রাজনীতি আছে, অর্থনীতি নহে। বাজেটের আগের দিন মুখ্যমন্ত্রী জানাইয়াছিলেন, ঋণের বোঝা ক্রমে মারণফাঁস হইয়া উঠিতেছে। কথাটি অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু, তাহার সমাধান কী? মুখ্যমন্ত্রী বিগত পাঁচ বৎসর তাঁহার অবস্থানে অনড়— কেন্দ্রীয় সরকারকেই সুরাহা করিতে হইবে। স্পষ্টতই, এই দাবিটিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রীয়তার রাজনীতিতে পরিণত করিতে চাহেন। অন্যান্য যে রাজ্যগুলি ঋণের ভারে কাবু, তিনি তাহাদের একত্র করিবার ডাক দিয়াছেন। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এই রাজনীতির গুরুত্ব আছে। গত শতকের আশির দশকে কনক্লেভ তৈরি করিয়া জ্যোতি বসু-ফারুক আবদুল্লারা এই রাজনীতির পথেই হাঁটিয়াছিলেন। কিন্তু, ভারত বদলাইয়া গিয়াছে। রাজনীতির চাপে কেন্দ্র অর্থবরাদ্দ বাড়াইয়া দিবে, সেই দিন আর নাই। তাহার বৃহত্তম কারণ, না চাহিতেই কেন্দ্র উন্নয়ন ব্যয় বাবদ অর্থ রাজ্যগুলির হাতে ছাড়িয়া দিয়াছে, তাহার সহিত উন্নয়নের দায়িত্বও। বস্তুত, সেই টাকা আছে বলিয়াই অমিত মিত্রের বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ প্লীহা চমকাইয়া দেয় নাই। কিন্তু, তাহার পর কী?

ঋণ শোধ করিবার টাকা রাজ্যকেই জোগাড় করিতে হইবে। নূতন ঋণ করিয়া নহে, কারণ তাহাতে সমস্যাটি গভীরতর হইবে মাত্র। রাজ্যকে আয়বৃদ্ধি করিতে হইবে। এতখানি, যাহাতে ঋণ পরিশোধের পরও উন্নয়নের জন্য— খয়রাতির জন্যও— যথেষ্ট টাকা পড়িয়া থাকে। এই পথেই পশ্চিমবঙ্গ বাঁচিতে পারে। কোন চিকিৎসায় তাহা সম্ভব? একমাত্র উত্তর: শল্য চিকিৎসা। বাঁচিতে চাহিলে গত দফার যাবতীয় ভুল রাজনীতি ছাঁটিয়া ফেলিতে হইবে। পশ্চিমবঙ্গকে বাঁচাইতে পারে শুধু শিল্প। কলা নহে, তেলেভাজা-ল্যাংচা নহে, প্রকৃত শিল্প। অমিত মিত্র যে কেইনসীয় পথ্যের কথা বলিয়াছেন, তাহা জরুরি, কিন্তু এই অস্ত্রোপচারের পর। রাজস্বের পরিমাণ বাড়াইতে হইলে প্রথমে রাজ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। শিল্প বই তাহা সম্ভব নহে। আর, মুখ্যমন্ত্রীর মন পরিবর্তন বই শিল্প সম্ভব নহে। প্রশ্ন হইল, জীবনমশাই তাঁহার রোগীর অভিভাবককে রাজি করাইতে পারিবেন কি?

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy