দয়াশংকর সিংহের চাকুরি গিয়াছে। উত্তরপ্রদেশে বিজেপির সহসভাপতির পদ হইতে তিনি বরখাস্ত, দল হইতে বহিষ্কৃত। কিন্তু আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যজয়ের খোয়াব না দেখিলেও নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহরা এতখানি তৎপর হইতেন, অরুণ জেটলি সংসদে এত দ্রুত মায়াবতীর নিকট নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থনা করিয়া লইতেন বলিয়া বোধ হয় না। কারণ, দয়াশংকর সিংহ যাহা করিয়াছেন, তাহা চূড়ান্ত ঘৃণ্য হইতে পারে, ব্যতিক্রমী নহে। ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে বিজেপির সর্বভারতীয় মুখপত্র শায়না এন সি বলিয়াছিলেন, মায়াবতী মহিলা না পুরুষ, তাহাই তিনি বুঝিয়া উঠিতে পারেন না। মন্তব্যটি ঘৃণার রাজনীতির মাপকাঠিতে দয়াশংকর সিংহের উক্তির তুলনায় খুব পিছাইয়া ছিল না। উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন তখনও আড়াই বৎসর দূরে, অতএব তখন দলিতদের ‘ভাবাবেগে আঘাত’ করিলেও তেমন দোষ ছিল না। দয়াশংকর সিংহ ভুল সময়ে মুখ খুলিয়াই বিপাকে পড়িলেন। অবশ্য, শুধু উত্তরপ্রদেশেই নহে, ভারতের পশ্চিম ও দক্ষিণ প্রান্তেও বিজেপি আপাতত দলিত প্রশ্নে বেকায়দায় আছে। হায়দরাবাদ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দলিত ছাত্র রোহিত ভেমুলার মৃত্যুর পর স্মৃতি ইরানির অবিমৃশ্যকারিতা যে ক্ষতিটুকু করিতে বাকি রাখিয়াছিল, গুজরাতের গোরক্ষা সমিতির অত্যুৎসাহীরা চার দলিতকে নির্মম প্রহার করিয়া তাহা সম্পূর্ণ করিয়াছে। অমিত শাহরা যখন মায়াবতীর দলিত ভোটে বড়সড় ভাগ বসাইয়া লখনউ-এর তখ্তে বসিবার কথা ভাবিতেছেন, ঠিক সেই সময়েই বারে বারে প্রকাশ হইতেছে, দলিত সম্বন্ধে দলের নানা জনে কী ভাবেন।
মায়াবতী সম্বন্ধে কটূক্তিটি দয়াশংকর সিংহ মুখ ফসকাইয়া করিয়া ফেলিয়াছেন, সন্দেহ নাই। কিন্তু, মনে যাহা থাকে, মুখ হইতে তাহাই ফসকাইতে পারে। ভারতীয় রাজনীতির মন এখনও নির্বিকল্প উচ্চবর্ণ পুরুষের। এই দেশে এক মহিলা প্রধানমন্ত্রী হইয়াছেন, আর এক জন রাষ্ট্রপতি। বিভিন্ন রাজ্যে বেশ কয়েক জন মহিলা মুখ্যমন্ত্রী দাপটের সঙ্গে শাসন করিয়াছেন ও করিতেছেন। কিন্তু, এখনও কোনও মহিলা রাজনীতিককে আক্রমণ করিতে হইলে তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বীরা রাজনৈতিক অস্ত্র খুঁজিবার কষ্ট করেন না। তাঁহার নারীত্ব লইয়া ব্যক্তিগত আক্রমণ সহজতর বিকল্প। দয়াশংকর সিংহ বা শায়না এন সি-রা যেমন, ২০১৫ সালে মুলায়ম সিংহ যাদবও মায়াবতীকে তেমনই ব্যক্তিগত আক্রমণ করিয়াছিলেন। এমনকী, বঙ্গজ নেতারাও কম যান নাই। অনিল বসু, আনিসুর রহমান বা বিনয় কোঙারদের অমর উক্তিগুলি স্মর্তব্য। রাজনীতির রঙে তাঁহারা পৃথক হইতে পারেন, নারীবিদ্বেষ তাঁহাদের এক করিয়াছে।
তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষও রাজনীতির নিকট নেহাত ভোটব্যাঙ্ক হইয়াই থাকিয়া গিয়াছেন। নির্বাচনের সময় তাঁহাদের উদ্দেশে দুই-চারটি মধুমাখা কথা বলিলেই হইবে, মন পাল্টাইবার কোনও প্রয়োজন নাই— রাজনীতির মূল ধারা এখনও এমনটাই ভাবে। সমস্যা হইল, দেশ বদলাইয়া গিয়াছে। ‘তিলক, তরাজু ওউর তলওয়ার’-কে চার ঘা জুতা কষাইয়া দেওয়ার স্লোগানটি, কালের প্রভাবে, নিম্নবর্ণের মানুষের মনে বসিয়া গিয়াছে। ফলে, অপ্রত্যাশিত প্রত্যাঘাত এখন রাজনৈতিক বাস্তব। গুজরাতের গোরক্ষা সমিতির সদস্যরা আঁচ করিতে পারেন নাই, চির কাল যাঁহারা উচ্চবর্ণের অত্যাচার সহ্য করিয়াও নিজেদের ‘বর্ণাশ্রমগত পেশা’-র দায়িত্ব পালন করিয়া গিয়াছেন, তাঁহারা শহরের রাস্তায় গরুর লাশ ফেলিয়া যাইতে পারেন। উচ্চবর্ণের মুখের উপর সরাসরি প্রতিবাদ করিতে পারেন। এই প্রতিবাদ উচ্চবর্ণের রাজনীতিকে কাঁপাইয়া দিয়াছে। ফলে, বিজেপি আর ঝুঁকি লয় নাই। দয়াশংকর সিংহ নামক নেতাটি সরিলেন। মন বদলাইল কি?