নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিনটিকে ‘সেবা দিবস’ রূপে উদ্যাপনের বুদ্ধিটি অমিত শাহের। তবে কি নিজেকে দেশের ‘প্রধান সেবক’ হিসাবে বর্ণনা করিবার পরামর্শও নরেন্দ্রভাইকে তিনিই দিয়াছিলেন, কোনও বিজ্ঞাপন বা জনসংযোগ সংস্থা নহে? সেবা তিনি করিয়াছেন, সংশয় নাই। বিদেশ ভ্রমণের ফাঁকে ফাঁকে যখনই সময় পাইয়াছেন, বায়ুসেনার হেলিকল্টারে চাপিয়া বন্যাবিধ্বস্ত চেন্নাই পরিদর্শনে গিয়াছেন, সম্মার্জনী হস্তে রাস্তায় সযত্নে সাজাইয়া রাখা ঝরা পাতা সাফ করিয়া দেশকে স্বচ্ছ করিয়াছেন, প্রতি মাসে বেতারে ‘মন কি বাত’ খোলসা করিয়াছেন। জন্মদিনে তিনি সেবার বিশ্বরেকর্ড করিবেন বলিয়া স্থির হইয়াছে। এক দিনে এগারো হাজার প্রতিবন্ধীর হাতে বিভিন্ন সামগ্রী তুলিয়া দেওয়া, সে কি সহজ কথা? দুনিয়ার আর কোনও রাষ্ট্রনায়ক পারিয়াছেন? রেকর্ডটি তৈরি হইলেই, ব্যস— নিন্দুকদের মুখ খুলিবার উপায় থাকিবে না। যাহারা বলে, ফোটোশপ না থাকিলে নরেন্দ্রভাইও থাকিতেন না; যাহারা রটাইয়া বেড়ায়, প্রধানমন্ত্রীর যাবতীয় সদিচ্ছা শুধুমাত্র ক্যামেরার সম্মুখেই; যাহারা বলে, পহলাজ নিহালনিদের ন্যায় ভক্তরা মিউজিক ভিডিয়ো না বানাইলে মোদীজির ছাতি আরও চুপসাইয়া যাইত— এই বিশ্বরেকর্ড তাহাদের প্রত্যেকের মুখে মোক্ষম কুলুপ আঁটিয়া দিবে। অমিত শাহ অবশ্য বলেন নাই, দীর্ঘতম নীরবতার বিশ্বরেকর্ড করিবার বাসনাও প্রধানমন্ত্রীর আছে কি না। তিনি দাদরি-কাণ্ডে নীরব ছিলেন, হরিয়ানায় মনোহরলাল খট্টারের গোমাংস সন্ধানে চুপ, কর্নাটকের তাণ্ডব বিষয়ে চুপ, কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে চুপ। নৈঃশব্দ্য অপার।
হঠাৎ সেবার দিকে নজর পড়িল কেন? বিপণন দুনিয়ার লোকমাত্রেই জানিবেন, আকর্ষক ক্যাচলাইন ভিন্ন পণ্য বেচা মুশকিল। এমন কথা, যাহা লোকের মুখে মুখে ফিরিবে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর ক্যাচলাইনের অভাব ছিল না। কিন্তু, ছিপ লইয়া গিয়াছে কোলাব্যাঙে, আর মাছ লইয়াছে চিলে। কিছু স্লোগানকে অমিত শাহ ‘জুমলা’ ঘোষণা করিয়া দিয়াছেন, কিছু স্লোগান এমনই অন্তঃসারশূন্য যে চরম ভক্তও বিশ্বাস বজায় রাখিতে পারেন নাই। পড়িয়া ছিল ‘অচ্ছে দিন’— নিতিন গড়করী আসিয়া তাহাকেও লোপাট করিলেন। আরও কেলেঙ্কারি, তিনি জানাইয়া দিলেন, স্লোগানটি তাঁহারা মনমোহন সিংহের নিকট হইতে টুকিয়াছিলেন। ক্যাচলাইন বিনা সরকার চলে কী উপায়ে? অতএব, সেবা। কথাটির মধ্যে গভীরতা আছে, কেহ চাহিলে একেবারে স্বামী বিবেকানন্দ হইতে দীনদয়াল উপাধ্যায়, যাঁহাকে ইচ্ছা এই স্লোগানে জুড়িয়া লইতে পারেন। ‘সেবা’র ধারণাটি সনাতন সংস্কৃতির সহিতও দিব্য যায়। সত্যই কোনও বিপণন সংস্থা নহে, বুদ্ধিটি অমিত শাহর মাথায় খেলিয়াছে?
তবে, দুষ্ট লোকের তো অভাব নাই। ইতিমধ্যেই তাহারা প্রশ্ন করিতেছে, প্রধানমন্ত্রী ঠিক কোন বিনিয়োগকারীর সেবক? যাঁহার মোবাইল পরিষেবার বিজ্ঞাপনে পাতা জুড়িয়া প্রধানমন্ত্রীর ছবি প্রকাশিত হইল, তাঁহার; না কি, যে যোগবিশারদ বর্তমানে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য ফাঁদিয়া বসিয়াছেন, তাঁহার? না কি, কোনও এক জনের নহেন, তিনি বহু বিনিয়োগকারীরই একনিষ্ঠ সেবক? দুর্জনের কথায় কান দিতে নাই, নচেৎ প্রধানমন্ত্রী তাঁহার গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী অবতারের কিছু গল্প শুনাইয়া সব সন্দেহের নিরসন করিতে পারিতেন। তবে, তিনি ‘সাধারণ মানুষের সেবক’, এই কথাটিকে কী উপায়ে বিশ্বাসযোগ্য করিয়া তুলিবেন, মোদী ভাবিয়াছেন কি? জন্মদিনের অসংখ্য ছবি, এবং সাইবার দুনিয়ায় নিরলস কর্মীদের ভরসায় থাকিলেই যথেষ্ট হইবে? আব্রাহাম লিঙ্কনের নামে একটি কথা চালু আছে— সব লোককে সব সময় বোকা বানানো অসম্ভব। কথাটি কি প্রধানমন্ত্রী শুনিয়াছেন?