Advertisement
E-Paper

জেহাদ

আড়াই বৎসর কাটিয়া গিয়াছে, প্রত্যেক ভারতীয়র ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা আসে নাই। আসিবে, সেই সম্ভাবনাও ক্ষীণ— অমিত শাহ বলিয়াই দিয়াছেন, ‘জুমলা’।

শেষ আপডেট: ১০ নভেম্বর ২০১৬ ০০:০০

আড়াই বৎসর কাটিয়া গিয়াছে, প্রত্যেক ভারতীয়র ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা আসে নাই। আসিবে, সেই সম্ভাবনাও ক্ষীণ— অমিত শাহ বলিয়াই দিয়াছেন, ‘জুমলা’। কিন্তু, কালো টাকার বিরুদ্ধে তাঁহার জেহাদ যে শেষ হয় নাই, নরেন্দ্র মোদী তাহা নাটকীয় ভঙ্গিতে জানাইয়া দিলেন। মাত্র চার ঘণ্টার নোটিসে ১,০০০ ও ৫০০ টাকার নোট বাতিল হইয়া গেল। ভক্তরা বলিতেছেন, আরও এক দফা সার্জিকাল স্ট্রাইক। যাঁহাদের ভক্তি তেমন জোরালো নহে, তাঁহারা প্রশ্ন করিতেছেন, আচমকা এমন সিদ্ধান্ত ঘোষিত হইলে সাধারণ মানুষের যে হয়রানি, তাহার কী হইবে? হোয়াইট হাউসে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের প্রত্যাবর্তনের লগ্নে জর্জ ডব্লিউ বুশ বলিতে পারিতেন, যুদ্ধে কোল্যাটারাল ড্যামেজ অনিবার্য। সত্য হইল, যে কোনও সমাজেই অর্থনীতির একটি নিজস্ব চালিকাশক্তি থাকে, যাহা এই জাতীয় আকস্মিক ধাক্কা হইতে সাধারণ মানুষকে বহুলাংশে রক্ষা করে। গত কালের অভিজ্ঞতা বলিতেছে, নরেন্দ্র মোদীর চাঞ্চল্যকর সিদ্ধান্তেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা প্রায়-স্বাভাবিক থাকিয়াছে, সামাজিক পরিসর এই ধাক্কার বড় অংশই শুষিয়া লইয়াছে। যেটুকু সমস্যা হইয়াছে, বড় যুদ্ধের স্বার্থে সেটুকু মানিয়া লওয়া যায়।

এই যুদ্ধের যৌক্তিকতা কতখানি? প্রধানমন্ত্রী দুইটি উদ্দেশ্যের কথা বলিয়াছেন। কালো টাকা নিয়ন্ত্রণ তো বটেই, এই নীতি একই সঙ্গে দেশের বাজারে ঘোরা নকল টাকার রমরমাও শেষ করিবে বলিয়া প্রধানমন্ত্রী জানাইয়াছেন। দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি সফল হইবার একটি শর্ত আছে— সরকার নূতন যে নোটগুলি বাজারে ছাড়িবে, তাহাকে নকল-অসাধ্য করিয়া তুলিতে হইবে। তাহা সম্ভব কি না, ভবিষ্যৎই বলিবে। কিন্তু, তেমন নোট বাজারে আনিতেও রাতারাতি পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল না। সময় দিয়া পুরাতন নোট তুলিয়া নূতন নোট বাজারে ছাড়িলেও কার্যসিদ্ধি হইত। এই আকস্মিকতার প্রয়োজন মূলত কালো টাকা নিয়ন্ত্রণে। আগাম ঘোষণা করিলে উদ্দেশ্যটিই মাটি হইত। রাঘব বোয়ালরা বাড়িতে থরে থরে হাজার ও পাঁচশত টাকার বান্ডিল জমাইয়া রাখেন, এমনটা সম্ভবত অন্ধ ভক্তরাও ভাবেন না। কিন্তু, তাহাতেও যে পরিমাণ নগদ কালো টাকা বাজারে রহিয়াছে— সিন্ডিকেটে, ব্যবসায়ীদের দেরাজে, উত্তরপ্রদেশে বা অন্যত্র বিভিন্ন স্থলে— তাহাতে এই ধাক্কাতেও বিপুল কালো টাকা নষ্ট হইতে চলিয়াছে। দেশের মোট কালো টাকার অনুপাতে তাহার পরিমাণ কতখানি, প্রশ্ন উঠিতেই পারে। কিন্তু, অনুপাতটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, টাকার অঙ্কটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নহে।

ইহার পরেও একটি গুরুতর কথা থাকিয়া যায়। ‘কালো টাকা’ বস্তুটিকে স্থাণু ভাবিলে ভুল হইবে। সিন্দুকে জমিয়া থাকা নহে, তাহার কাজ অর্থনীতিতে নিয়োজিত হইয়া মুনাফা অর্জন করা। ‘সাদা’ আর ‘কালো’-র ধর্মে ফারাক নাই। যে আয় ঘোষিত এবং যাহার জন্য কর দেওয়া হয়, তাহাই সাদা টাকা; অন্যথায়, কালো। অতএব, কালো টাকার বড় অংশই কাহারও ঘরে নাই, তাহা বাজারে ঘুরিতেছে। কোথাও বাণিজ্যে লগ্নি করা হইয়াছে, কোথাও হাওয়ালা পথে তাহা বিদেশে পাড়ি দিয়াছে, কোথাও সোনায় লগ্নি হইয়া আছে। পুরাতন নোট বাতিল হইলেও এই কালো টাকার গায়ে আঁচড় পড়িবে না। আশঙ্কা হইতেছে, ৫০০ ও ১,০০০ টাকার নোট উঠাইয়া লওয়ার সিদ্ধান্তটি কালো টাকার এই চরিত্রের দিকে যথেষ্ট নজর রাখে নাই; টাকা যাহাতে কালো না হইতে পারে, তাহা নিশ্চিত করিবার কোনও ব্যবস্থা হয় নাই। ইহা রোগের চিকিৎসা না হইয়া উপসর্গের বিরুদ্ধে কামান দাগা কি না, মোদীর জেহাদটি মাঠেই মারা যাইবে কি না, ইহাই এখন ১৪,৯৫,০০০ কোটি টাকার প্রশ্ন।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy