এক সঙ্গে দুই কিলোগ্রাম পেঁয়াজ কিনিলে প্যান কার্ড দেখাইতে হইবে, কারণ উহা ‘হাই ভ্যালু ট্র্যানজাকশন’, এমন রসিকতা যখন সর্বজনীন হইয়া উঠে, তখন বোঝা সম্ভব, পরিস্থিতি অসহ্য হইয়াছে। এক কেজি পেঁয়াজের দাম পঁচাশি টাকায় ঠেকিলে রসিকতাই একমাত্র পথ। পেঁয়াজের দাম অবশ্য বাড়িয়াই থাকে। কখনও শোনা যায়, বৃষ্টি কম হইয়াছে বলিয়া ফসলের জোগানে টান পড়িয়াছে, কখনও অতিবৃষ্টির ঘাড়ে দোষ চাপে। অর্থাৎ, সমস্যাটি এই বৎসরের বিশেষ নহে, তাহা কাঠামোগত। এই দফায় কেন্দ্রীয় সরকার পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টাটি মন্দ করে নাই। পেঁয়াজ রফতানির উপর আংশিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হইয়াছে, পেঁয়াজ আমদানি করা হইতেছে, এবং রাজ্যগুলির জন্য মোট ৫০০ কোটি টাকার তহবিল তৈরি হইয়াছে। পেঁয়াজের দামে ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজনে রাজ্যগুলি সেই তহবিল হইতে অর্থসাহায্য পাইবে। বাজারের আগুন নিভাইবার এই চেষ্টা কত দূর কার্যকর হইবে, তাহা এখনই বলা দুষ্কর। প্রাথমিক লক্ষণ অবশ্য মন্দ নহে।
নির্বাচন বড় বালাই। অতীতে পেঁয়াজের দামের ঝাঁঝে অনেক দলের চোখেই জল আসিয়াছিল। কাজেই, বিহারের নির্বাচনের প্রাক্কালে নরেন্দ্র মোদী সাবধানী হইবেন, তাহা প্রত্যাশিত। কিন্তু, তাহাতে সাময়িক স্বস্তি মিলিতে পারে, সমস্যাটি মিটিবে না। পেঁয়াজের উৎপাদনের ওঠাপড়া তাহার দামে প্রভাব ফেলে, সে কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু, তাহাই একমাত্র কারণ নহে। পশ্চিমবঙ্গের আলুর বাজারে যে সমস্যা, মহারাষ্ট্রের পেঁয়াজের বাজারও সেই সমস্যাতেই ভুগিতেছে। বাজারের নিয়ন্ত্রণ মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির হাতে। দাম বাড়িবার ইঙ্গিতমাত্র পাইলেই তাঁহারা পেঁয়াজ মজুত করিতে থাকেন, ফলে বাজারে জোগান কমিয়া সত্যই দাম বাড়িতে থাকে। এই দফায় নরেন্দ্র মোদী মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দিয়াছিলেন, তাহাতেও খানিক কাজ হইয়াছে। কিন্তু, অর্থনীতির সমস্যাকে অর্থনৈতিক পথে মিটাইবার চেষ্টা করাই বিধেয়। মজুতদাররা থাকিবেনই। সামনেই নির্বাচনের খাঁড়া না ঝুলিলে তাঁহাদের মাথায় রাজনীতিকদের হাতও থাকিবে। কাজেই, মজুতদারির সমস্যাটিকে যদি পাকাপাকি ভাবে দূর করিতে হয়, তবে তাহা অর্থনীতির পথে করাই বিধেয়।
মজুতদারির পিছনে রহিয়াছে ভবিষ্যতের দাম সম্বন্ধে অনিশ্চয়তা ও প্রত্যাশা। মধ্যস্বত্বভোগীরা যখন অদূর ভবিষ্যতে পণ্যের দাম বাড়িবার প্রত্যাশা করেন, তখনই তাঁহারা পণ্য মজুত করেন। সেই অনিশ্চয়তা যদি কাটিয়া যায়, যদি ভবিষ্যতের মূল্যস্তর সম্বন্ধে প্রত্যেকেরই স্পষ্ট ধারণা থাকে, তবে আর মজুতদারির কোনও প্রণোদনা অবশিষ্ট থাকে না। দুইটি পথে এমন অবস্থায় পৌঁছানো সম্ভব। প্রথম পথটি সনাতন ভারতীয় পথ। সরকার কৃষকদের হইতে পেঁয়াজ কিনিবে, এবং বাজারে দাম একটি নির্দিষ্ট স্তর অতিক্রম করিলেই সেই পেঁয়াজ বিক্রয় করিবে। পথটি শুনিতে সহজ, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে নহে। আর, পেঁয়াজ বিক্রয় করা সরকারের কাজ নহে। কাজেই, দ্বিতীয় পথটিই ভরসা। তাহা কমোডিটি এক্সচেঞ্জে আলু-পেঁয়াজের ন্যায় পণ্যের ফিউচার্স বাজার খুলিবার পথ। এই বাজারটি খুলিলে ভবিষ্যতের দাম সম্বন্ধে অনিশ্চয়তা বহুলাংশে কাটিয়া যাইবে। এই দুইটি ফসল মজুতযোগ্য, এবং অতি প্রয়োজনীয়। ভারতে তো দেওয়ালে পিঠ না ঠেকিলে সংস্কার হয় না। আলু-পেঁয়াজের দাম সাধারণ মানুষকে সেই অবস্থায় আনিয়া ফেলিয়াছে। সংস্কারটিও হউক।