Advertisement
E-Paper

টাকার দাম

টাকা শুধু টাকা। বাড়ির চারিদিকে টাকা। দেওয়ালে টাকা, মেঝেয় টাকা, কমোডে টাকা। কত টাকা তাহার হিসাব অবধি নাই। টাকাতে সত্যই ছাতা পড়িয়াছে। বান্ডিলে লাগানো ‘গার্ডার’ গলিয়াছে। আর যাঁহার তহবিলে এই দুর্নীতির টাকা তিনি দিবারাত্র ঘুমহারা।

শেষ আপডেট: ২৩ অগস্ট ২০১৫ ০০:০১

টাকা শুধু টাকা। বাড়ির চারিদিকে টাকা। দেওয়ালে টাকা, মেঝেয় টাকা, কমোডে টাকা। কত টাকা তাহার হিসাব অবধি নাই। টাকাতে সত্যই ছাতা পড়িয়াছে। বান্ডিলে লাগানো ‘গার্ডার’ গলিয়াছে। আর যাঁহার তহবিলে এই দুর্নীতির টাকা তিনি দিবারাত্র ঘুমহারা। মুখ-মন শুকাইয়া গিয়াছে। টাকা লইয়া তিনি উড়াইয়া দেন নাই, ভোগ করেন নাই। বরং তিনি সামান্য জিনিসের দাম কমাইতে তৎপর, পাড়ার ছেলেদের চাঁদার আবদার ফিরাইতে বদ্ধপরিকর। তবে কি টাকা দেখিয়া দেখিয়া তাঁহার চিত্ত বিকল হইয়াছিল? বালির ইঞ্জিনিয়ারটির বাড়ি হইতে যে পরিমাণ অব্যবহৃত ছাতা পড়া টাকা আবিষ্কৃত হইয়াছে তাহা সেই অমোঘ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাইয়া দেয়। টাকা লইয়া আমরা কী করিব ? জীবন লইয়া আমরা কী করিব-র ন্যায় ইহাও একটি মৌলিক প্রশ্ন। অসৎ উপায়ে হউক সৎ উপায়ে হউক যে টাকা কাজে লাগানো যায় না সে টাকা মাটির ঢেলা ছাড়া আর কী? বান্ডিল বান্ডিল টাকা ব্যবহৃত না হইলে তাহা নিতান্ত মূল্যহীন। দরিদ্র মানুষের নিকট প্রশ্নটির খানিক সদুত্তর রহিয়াছে। তাঁহারা বলিতে পারেন ভাল-মন্দ খাইব, দামি বস্ত্রাদি পরিব, গাড়ি চাপিব, বাড়ি বানাইব। কিন্তু চাহিদা মিটিয়া যাইবার পর যদি আরও আরও দেওয়া হয় তখন? তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি প্রথম যে পাত্র হইতে জল পান করেন সেই পাত্রটি তৃষ্ণার্তের উদগ্র পিপাসার স্পর্শ পায়। তৃষ্ণার্তও প্রথম বারের জল পানে অপূর্ব তৃপ্তি পান। পরে সেই প্রথম বারের ন্যায় তৃপ্তি কিন্তু আর হয় না। ক্রমাগত জলপানে বাধ্য হইলে তাহা শেষ অবধি যন্ত্রণার কারণ হইয়া দাঁড়ায়। ক্রমহ্রাসমান উপযোগিতার তত্ত্ব অর্থনীতির শাস্ত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক ভূমিকা পালন করে। অর্থের ক্ষেত্রেও কি তাহাই ঘটে? আরও আরও পাইতে পাইতে তখন এই প্রশ্নটি যন্ত্রণা দেয়: টাকা লইয়া কী করিব? ইহার সদুত্তর না থাকিলে কিন্তু বিপদ। রূপকথার সেই রাজার কথা মনে পড়িবে। তাঁহার স্পর্শে সকলই সোনা। এত সোনা লইয়া তিনি কী করিবেন? সোনা তো আর চিবাইয়া খাওয়া যায় না।

মোদ্দা কথা হইল, টাকার ব্যবহার জানা চাই। কতটা টাকা কী কাজে লাগাইতে পারা যাবে সেটা জানা ও ভাবা না থাকিলে সমূহ বিপদ। নীতির টাকা ও দুর্নীতির টাকা উভয়ের ক্ষেত্রেই কথাটি সত্য। কথায় অবশ্য বলে, টাকায় টাকা বৃদ্ধি হয়। হক কথা। কিন্তু ইহাও অনস্বীকার্য যে, টাকা খাটাইতে জানিতে হয়। টাকা খাটাইয়া টাকা বাড়াইবার বুদ্ধিই আধুনিক অর্থনীতির চাকা চালাইতেছে। সেই বর্ধিত টাকা লইয়া শেষ অবধি কী করা হইবে, তাহা অবশ্য কম কঠিন প্রশ্ন নহে, তবে মুনাফার সন্ধানীরা সেই প্রশ্নকে গ্রাহ্য করিবেন না। কিন্তু কথা হইল, টাকা খাটাইবার সামর্থ না থাকিলে সেই টাকা ভোগ করিবার প্রয়াস করিতে হয়। ভোগ সর্বদা অমঙ্গলজনক নহে। বরং ধর্মানুসারে ভোগ সমাজ ও অর্থনীতির পক্ষে মঙ্গলজনক। বাড়িতে টাকা জমাইয়া না রাখিয়া সেই টাকা ক্রয়বিক্রয়ে কাজে লাগাইলে অর্থনীতি চাঙ্গা হয়। অন্তত ক্ষেত্রবিশেষে। মহামতি জন মেনার্ড কেইনসও তাহা শিখাইয়াছিলেন। কাজেই ছাতাপড়া টাকার সাম্প্রতিক ঘটনাটি এক দিক হইতে গভীর একটি বিষয় শিখাইতেছে। এই ঘটনা প্রমাণ করিতেছে ভোগ করা সহজ নহে। প্রাচীন শাস্ত্রে বলিত, ত্যাগের মাধ্যমে ভোগ করিতে হয়। যুগ পালটাইয়াছে। শাস্ত্রেরও মতিগতি এক থাকে নাই। আধুনিক কাণ্ডজ্ঞান বুঝাইতেছে, শুধু টাকার নেশা সর্বনাশা হইতে পারে। রক্তকরবী-র রাজা তাল তাল সোনা জমাইত। কাজে লাগিত না। রবীন্দ্রনাথেরই ‘গুপ্তধন’ গল্পে একটি স্বর্ণময় আলোবাতাসবিহীন ঘরের ছবি রহিয়াছে। দমবন্ধ করা সেই প্রকোষ্ঠ। সেই জমা-ধন মরা ধন। বালির বাড়িটিও মরা ধনের আধার। দুর্নীতির ভয়াবহ কাহিনির আড়ালে এই কাহিনি এক অর্থে আরও বেশি ভয়াবহ।

যৎকিঞ্চিৎ

Advertisement

নারী ও পুরুষ পরস্পরকে সহ্য করতে পারে না। হিংস্র সাম্প্রদায়িকতায় সর্ব ক্ষণ ফোঁসফোঁস করে, সুযোগ পেলেই এ-ওর ওপর নখ দাঁত থুতু খিস্তি সহ ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু প্রেম বিষম দায়, এদেরই হলায়-গলায় বাঁচতে হয়, সংসারে দ্বৈত জোয়াল টানতে হয়, বানিয়ে বানিয়ে মিষ্টি কথাবার্তাও সাপ্লাই করতে হয়। যদি পৃথিবীটা সমকামী হত, এ সব বখেড়াই থাকত না, ‘মাতৃভূমি’ নিয়ে পাটকেলবাজিও হত না। হ্যাঁ, প্রজাসৃষ্টির ব্যাপারটা হোঁচট খেত, ও বিজ্ঞানীরা ল্যাব-এ বুঝে নিতেন।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy