Advertisement
E-Paper

বিশ্ববিদ্যালয় তো প্রশ্ন করতেই শেখায়

সঙ্ঘের রাজনীতি কখনও যুক্তি-প্রতিযুক্তির পরিসরে ঢুকতে পারেনি। অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে নাচার হিন্দুত্ববাদীদের অস্ত্র তাই দেশপ্রেমের লাঠি, তাদের সঙ্গে একমত না হলেই তুমি দেশবিরোধী। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রী প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে লাগাতার দেশদ্রোহিতার অভিযোগ শুনছেন। শুনছেন যে তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া উচিত, শুনছেন যে পাকিস্তানি জঙ্গির সঙ্গে তাঁদের আঁতাঁত আছে। দেশের সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত। ছাত্র সংসদের সভাপতি দেশদ্রোহিতার দায়ে গ্রেফতার। ক্যাম্পাসের গেটের বাইরে হিংস্র স্লোগান দিচ্ছে গেরুয়াধারী মস্তান বাহিনী।

শুভনীল চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০০:১৫
দু’বেলা মরার আগে। ছাত্র সংসদের সাংবাদিক সম্মেলন। জেএনইউ। ১৯ ফেব্রুয়ারি

দু’বেলা মরার আগে। ছাত্র সংসদের সাংবাদিক সম্মেলন। জেএনইউ। ১৯ ফেব্রুয়ারি

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রী প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে লাগাতার দেশদ্রোহিতার অভিযোগ শুনছেন। শুনছেন যে তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া উচিত, শুনছেন যে পাকিস্তানি জঙ্গির সঙ্গে তাঁদের আঁতাঁত আছে। দেশের সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত। ছাত্র সংসদের সভাপতি দেশদ্রোহিতার দায়ে গ্রেফতার। ক্যাম্পাসের গেটের বাইরে হিংস্র স্লোগান দিচ্ছে গেরুয়াধারী মস্তান বাহিনী।

গেটের ভিতরে? ছাত্র সংঘর্ষ? ছাত্ররা ভীত, সন্ত্রস্ত? অনেকেই বাড়ি চলে গেছে? বিক্ষিপ্ত জটলা বাদ দিয়ে জমায়েত নেই? না। এই বিক্ষুব্ধ সময়েও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের দিকে তাকালে যা দেখতে পাবেন, শুধু সেটুকুই চিনিয়ে দিতে পারে এই প্রতিষ্ঠানটিকে। বলে দিতে পারে, কেন তাকে ভয় পায় খাকি হাফপ্যান্ট-বাহিনী।

ছাত্ররা সমবেত প্রশাসনিক ভবনের সামনে। গান গাইছেন ‘আমরা করব জয়’। অন্তত পাঁচটি ভাষায় (বাংলা, হিন্দি, মালায়লম, অসমিয়া ও ইংরেজি)। গাইছেন ‘তু জিন্দা হ্যায় তো জিন্দেগি কি জিৎ পে য়কীন কর’। কবিতা পাঠ, বক্তৃতা, স্লোগান। প্রতি দিন বিকেলে জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন দিক নিয়ে ভাষণ দিচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা। জেএনইউ-তে লাঠির জোরে রাজনীতি হয়নি কখনও। এখানে রাজনীতি মানে আলোচনা, যুক্তি-প্রতিযুক্তি। সেই কারণেই জেএনইউ-কে ভয় পায় ‘ভগওয়া ধ্বজ’-এর অনুগতরা।

তারাও এসে পাল্টা স্লোগান দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মানবশৃঙ্খল বানিয়ে দুই তরফের ছাত্রদের মাঝখানে দাঁড়াচ্ছেন, বলছেন, দুই দলেরই প্রতিবাদ করার অধিকার আছে। জেএনইউ শিক্ষকরা ছাত্রদের মাঠে নেমে শেখাচ্ছেন, সহিষ্ণুতা কাকে বলে, বোঝাচ্ছেন গণতন্ত্রে বিরোধী মত শোনা আবশ্যিক, সেখানে হিংসার স্থান নেই। গণতন্ত্র ও পরমতসহিষ্ণুতার অনন্য পাঠ নিচ্ছেন ও দিচ্ছেন শিক্ষক ও ছাত্ররা। বিশ্ববিদ্যালয় বললে তো এই পরিসরটির কথাই মনে হয়, তাই না?

এই পরিসর কী ভাবে চিন্তায় স্থায়ী ছাপ ফেলতে পারে, তার প্রমাণ দিলেন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের তিন ছাত্র: প্রদীপ, রাহুল যাদব আর অঙ্কিত হন্‌স। তিন জনই ক্যাম্পাস রাজনীতিতে বিজেপি-র ছাত্র সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক বৈরের। অথচ, এঁরা তিন জনই কানহাইয়া কুমার-কাণ্ডের পর দলীয় সংগঠন থেকে পদত্যাগ করলেন, পদত্যাগপত্রে লিখলেন, ‘যে সরকার ছাত্রদের বিরুদ্ধে দমননীতি গ্রহণ করতে পারে, আমরা তার মুখপাত্র হতে পারব না।’ লিখলেন, ‘দেশপ্রেম আর গুন্ডামির মধ্যে ফারাক গুলিয়ে ফেললে চলবে না’, ‘বামপন্থী মাত্রেই দেশদ্রোহী, এই ধারণা পোষণ করা মারাত্মক’। নিজেদের এত দিনের রাজনৈতিক অবস্থানের বিরুদ্ধে, সম্পূর্ণ রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে এই কথাগুলো বলতে সাহস লাগে, নিজের বোধের প্রতি অনড় বিশ্বাসের প্রয়োজন হয়। জেএনইউ এই বোধটা তৈরি করে দিতে পারে।

২০০২ সালে যখন গুজরাত গণহত্যা হয়, তখন আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমরা দাঙ্গাবিধ্বস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের সাধারণ সভায় গোধরায় করসেবকদের পুড়িয়ে মারার ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ করা হয়, শান্তি মিছিল সংগঠিত করা হয়। যেহেতু আমরা গুজরাতে দাঙ্গাপীড়িতদের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ করেছিলাম, পর্যবেক্ষক টিম পাঠিয়েছিলাম, তাই প্রবীণ তোগাড়িয়ার মতো হিন্দুত্ববাদী নেতারা বললেন, বন্ধ করে দেওয়া উচিত এই বিশ্ববিদ্যালয়। মাস কয়েক পরে অশোক সিঙ্ঘল এসে সাম্প্রদায়িক ভাষণ দিলেন। বামপন্থী ছাত্ররা প্রতিবাদ করায় তাদের বেদম পেটাল গুন্ডারা। সে দিনও কিন্তু এক জন এবিভিপি সদস্যের গায়েও হাত তোলেনি কেউ। পরের দিন হয়েছে গণ-জমায়েত, হয়েছে মিছিল। এ ভাবেই বার বার সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে বৌদ্ধিক এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদ সংগঠিত করেছে জেএনইউ’র ছাত্ররা। আক্রমণ চলছে। কিছু আপত্তিকর স্লোগানের অজুহাতে কানহাইয়া কুমারকে হেনস্থা করার ঘটনাটি একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। কয়েক মাস আগে আরএসএস’এর মুখপত্রে বলা শুরু হল যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশদ্রোহীদের ভিড়। তৎকালীন উপাচার্য এর তীব্র প্রতিবাদ করে বিবৃতি দিলেন। সুব্রহ্মনিয়ম স্বামীরা বললেন এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেশবিরোধী শক্তিকে নিকেশ করতে হবে।

প্রশ্ন করো শিক্ষকদেরও

জেএনইউ-এর পঠনপাঠনের মধ্যে দিয়ে আমাদের শিক্ষকরা শিখিয়েছেন কোনও ব্যক্তি, মতাদর্শ বা চিন্তা প্রশ্নাতীত নয়। তাই, প্রশ্ন করো। সেই প্রশ্ন ও উত্তরের আদানপ্রদান, বিতর্কের মাধ্যমেই সত্যকে জানা সম্ভব। সেই প্রশ্নের দায়রায় সমস্ত কিছুই পড়ে। তাই জেএনইউতে প্রশ্ন ওঠে কাশ্মীরের মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে, বিতর্ক ওঠে কাশ্মীরের স্বাধীনতার প্রশ্ন নিয়ে, বা আফস্পা’র মতো কালা কানুন নিয়ে। জেএনইউ প্রশ্ন তোলে জাতি-প্রথা নিয়ে, প্রশ্ন তোলে পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে। ইতিহাস বিভাগ প্রশ্ন তোলে ইতিহাসের গৈরিককরণ নিয়ে, অর্থনীতি বিভাগ প্রশ্ন তোলে নব-উদারবাদী অর্থনীতির মডেলের উপযোগিতা নিয়ে, আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিভাগ প্রশ্ন করতে শেখায় মার্কিন আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে। কোনও একমাত্রিক চিন্তাকে সত্য বলে ধরে নিয়ে সবার উপরে তা চাপিয়ে দেওয়া নয়। জেএনইউ শুধু শেখায় যে সত্য জটিল এবং গভীর। শেখায়, পথচলতি যুক্তিহীন কথাকে বিশ্বাস কোরো না, সত্যের সন্ধানে যুক্তিতে শান দাও, প্রশ্ন করতে ভয় পেয়ো না। এমনকী শিক্ষকদেরও প্রশ্ন করো।

প্রশাসনিক ভবন চত্বরে জাতীয়তাবাদ বিষয়ক ভাষণমালাও প্রশ্ন করার, আলোচনার মাধ্যমে উত্তর খোঁজার অনুশীলনেরই অংশ। দু’হাজার ছাত্র-শিক্ষকের সামনে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক গোপাল গুরু বললেন, ভারতীয় জাতীয়তার দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক রয়েছে: ভারতের পতাকায় অশোকচক্র ও ভারতমাতা। প্রথম প্রতীকটি চলমান, গতিশীল। চক্রের আবর্তেই নিহিত আছে নিচু কাল উপরে আসবে, উঁচু যাবে নিচুতে। বলা যেতে পারে অশোকচক্রের প্রতীকে নিহিত আছে দেশের পিছিয়ে পড়া মানুষের এগিয়ে আশার সম্ভাবনা ও সঙ্কল্প, যা দেশের সংবিধানে নিহিত। আর ভারতমাতার দৃশ্যকল্প স্থিতিশীল, পরিবর্তনের বার্তা তা বহন করে না। দুটি প্রতীকই ভারতের। কিন্তু কোন প্রতীকটি কে বেছে নেবে তা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না।

জেএনইউ সেই অশোকচক্র, গতিশীল ও উন্নয়নমুখী। ছাত্রাবস্থায় এমন ছাত্রদের এখানে আসতে দেখেছি যাঁরা ইংরেজি বলতে পারতেন না। বাবা খেতমজুর, বাড়ি শহরের ঝুপড়িতে বা বস্তিতে। এমন ছাত্র দেখেছি, সংরক্ষণ না থাকলে যাঁরা কোনও দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছতে পারতেন না। তাঁদের অনেকেই এখন দেশে-বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত। এই গতিশীলতা, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষকে উন্নত করার পীঠস্থান জেএনইউ। এর জ্বলন্ত উদাহরণ কানহাইয়া কুমার, যিনি এক দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে শুধু জেএনইউ’র ছাত্র হননি, হয়েছেন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি। আজ যাঁরা এই বিশ্ববিদ্যালয়কে বন্ধ করে দিতে চান, তাঁরা আমাদের সংবিধানে পিছিয়ে পড়া
মানুষের উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতি আছে, যা অশোকচক্রের প্রতীকে ব্যক্ত, তাকে অস্বীকার করছেন, অপমান করছেন।

জেএনইউ ক্যাম্পাসে শুধু ক্লাসরুম বা আলোচনা-কক্ষে নয়, গঙ্গা ধাবায়, ওপেন এয়ার থিয়েটারে, স্কুল-ক্যান্টিনে, চায়ের দোকানেও নিরন্তর চলতে থাকে যুক্তি-প্রতিযুক্তির এই আদানপ্রদান। মত তৈরি হয়, মত বদলায়। সমস্যা হল, সঙ্ঘের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি কখনও সেই আলোচনায় ঢুকতে পারেনি। কারণ, জেএনইউ যে প্রথাগুলিকে, যে নিয়মগুলিকে প্রশ্ন করে, সেগুলোর বৃত্তে দাঁড়িয়ে যুক্তিগ্রাহ্য রাজনৈতিক তত্ত্ব খাড়া করা মুশকিল। তাঁরা বোঝাতে পারেন না, দেশ বলতে কেন একমাত্রিক সাম্প্রদায়িক এক অলীক কল্পনা করতে হবে। তাঁরা বোঝাতে ব্যর্থ যে কেন জাতিভেদ প্রথা থাকবে। আধুনিক নারীবাদী আখ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে সঙ্ঘ পরিবারের কোনও যুক্তিপূর্ণ অবস্থান নেই। কাশ্মীর বা উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে দেশের নামে রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন চলবে কেন, সেই উত্তর তাঁরা দিতে পারেন না। অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে নাচার হিন্দুত্ববাদীদের অস্ত্র তাই দেশপ্রেমের লাঠি, তাদের সঙ্গে একমত না হলেই তুমি দেশবিরোধী।

অবশ্য শুধু জেএনইউ নয়। যাদবপুর থেকে পুণের এফটিআইআই, মাদ্রাজ আইআইটি— যে প্রতিষ্ঠানেই ছাত্ররা প্রশ্ন করেছে, যুক্তি দিয়ে বুঝে নিতে চেয়েছে সব কিছু, সেখানেই সঙ্ঘ পরিবারের রক্তচক্ষু। এর প্রতিরোধও তাই দেশজোড়া হতে হবে। ভারতীয় গণতন্ত্রের স্বার্থ রক্ষার ল়়ড়াইটা কোনও প্রতিষ্ঠানের একার হতে পারে না।

আইডিএসকে’তে অর্থনীতির শিক্ষক

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy