বাইক আরোহীদের হেলমেট পরাইবার জন্য সরকারের তরফে আদৌ কি কোনও উদ্যোগ প্রয়োজন? হেলমেট না পরিলে মাথায় হাওয়া খেলে, অথবা হেলমেট কিনিবার টাকাটুকু বাঁচে বটে, কিন্তু একেবারে প্রাণের মূল্যে তাহার দাম চুকাইতেও হইতে পারে। অতএব, নিজের ভাল বুঝিবার মতো বুদ্ধি থাকিলে যে কোনও মানুষেরই বাইকে চড়িবার পূর্বে মাথায় হেলমেট চাপাইবার কথা। কলিকাতার রাস্তা দেখিলে প্রত্যয় হয়, ‘নিজের ভাল বুঝিবার বুদ্ধি’ বস্তুটি রীতিমত বিরল। অতএব, সরকারকেই উদ্যোগ করিতে হয়। বিনা হেলমেটে বাইকসওয়ারি দেখিলেই পুলিশ তাহাদের পাকড়াও করিবে, ইহা এক প্রকার উদ্যোগ। বাইক কিনিবার সময়ই বাধ্যতামূলক ভাবে দুইটি হেলমেট কিনিতে হইবে, ইহা আর এক গোত্রের উদ্যোগ। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী প্রস্তাব করিলেন, মাথায় হেলমেট না থাকিলে যেন বাইকচালকদের পেট্রোল বিক্রি না করা হয়। এই প্রস্তাবটি কার্যকর হইলে তাহাও একটি উদ্যোগ। ভারতের কয়েকটি রাজ্যে ইতিমধ্যেই এই ব্যবস্থা চালু হইয়াছে। তাহার ফাঁক গলিবার মরিয়া প্রচেষ্টায় কিছু বাইক-আরোহী অকল্পনীয় সব পথ খুঁজিয়া বাহির করিতেছেন বটে, কিন্তু সামগ্রিক ভাবে লাভও হইতেছে। আশা করা যায়, পশ্চিমবঙ্গেও হইবে।
মুখ্যমন্ত্রী-নির্দেশিত পন্থাটির সুবিধা, ইহাতে কোনও বাড়তি খরচ নাই। অধিকতর পুলিশকর্মী বা নূতন নজরদারি ব্যবস্থার প্রয়োজন নাই, মামলা ঠুকিবারও প্রশ্ন নাই। পেট্রোল পাম্পের কর্মীরা বিনা হেলমেটের আরোহীকে তেল বিক্রয় করিতে অস্বীকার করিলেই হেলমেট পরিবার অভ্যাস হইয়া যাইবে। সিদ্ধান্তটি বিচক্ষণ প্রশাসনিকতার একটি নিদর্শন। তেল বিক্রয় বন্ধ করিলে বাইক আরোহীদের যে অসুবিধা হইবে, তাহাই এই সিদ্ধান্তের একমাত্র দিক নহে। হেলমেট পরা কেন জরুরি, এই কথাটি অনেকেরই সর্বদা খেয়াল থাকে না। নিজের ভাল বুঝিবার বুদ্ধি সর্বক্ষণ প্রখর থাকিলে হয়তো ভুল হইত না। কিন্তু, বহু ক্ষেত্রেই হেলমেট না পরিবার বিপদের কথাটি স্মরণে থাকে না। বিপদ মারাত্মক হইলেও তাহা প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার অঙ্গ নহে বলিয়াই। এই বিপদের কথা যদি তাঁহাদের প্রত্যহ স্মরণ করাইয়া দেওয়া যায়, হয়তো কোনও শাস্তি ব্যতীতই অনেকে হেলমেট ব্যবহার করিতে আরম্ভ করিবেন। আর, তাহাতে যাঁহাদের হুঁশ ফিরিবে না, তাঁহাদের জন্য কঠোর শাস্তি প্রয়োজন। কয়েক শত টাকা জরিমানা নহে, এমন বেপরোয়া সওয়ারিদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নাকচ করিয়া দেওয়াই বিধেয়। এবং, তাহা দ্বিতীয় বা তৃতীয় অপরাধের পরই। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এমন অনেক কাজ করিতে পারে, ভাল কথায় যাহা হয় না।
মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাবের একটি অংশ লইয়া কিঞ্চিৎ বিতর্ক হইতে পারে। তিনি বলিয়াছেন, যাঁহাদের সামর্থ্য নাই, সরকার তাঁহাদের হেলমেটের ব্যবস্থা করিয়া দিবে। পঞ্চাশ হাজার টাকা বা ততোধিক মূল্যে যাঁহারা বাইক কিনিতে পারেন, এক হাজার টাকার হেলমেট তাঁহাদের সাধ্যাতীত হইবে কেন, মুখ্যমন্ত্রী বলেন নাই। হয়তো তিনি প্রশাসনিকতার একটি নূতন মডেল নির্মাণে উদ্যোগী, যেখানে সরকার শাসন করিবে বটে, কিন্তু তাহার পূর্বে দোষত্রুটি সংশোধন করিয়া লইবার সুযোগও দিবে, এমনকী প্রয়োজনে সে জন্য সাহায্যও করিবে। হেলমেট কিনিয়া দেওয়ার সিদ্ধান্তটি কতখানি যথার্থ, সে তর্ক চলিবে— কিন্তু প্রশাসনিকতার রূপ বদলাইতেছে কি না, সেই দিকেও নজর থাকুক।