Advertisement
E-Paper

যে শিক্ষা নাই

পার্থ চট্টোপাধ্যায়ও বিলক্ষণ জানিবেন, তিনি যাহা বলিতেছেন, তাহা হয় না। কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষদেরই চাকুরির মেয়াদ বাড়াইয়া কাজ চালাইয়া যাইতে বলা বড় জোর একটি তাৎক্ষণিক সমাধান হইতে পারে, কিন্তু তাহাতে মূল সমস্যার গায়ে আঁচড়টিও পড়িবে না। সত্য কথা হইল, পশ্চিমবঙ্গে কেহ আর কলেজের অধ্যক্ষ হইতে চাহেন না।

শেষ আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০০:০০

পার্থ চট্টোপাধ্যায়ও বিলক্ষণ জানিবেন, তিনি যাহা বলিতেছেন, তাহা হয় না। কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষদেরই চাকুরির মেয়াদ বাড়াইয়া কাজ চালাইয়া যাইতে বলা বড় জোর একটি তাৎক্ষণিক সমাধান হইতে পারে, কিন্তু তাহাতে মূল সমস্যার গায়ে আঁচড়টিও পড়িবে না। সত্য কথা হইল, পশ্চিমবঙ্গে কেহ আর কলেজের অধ্যক্ষ হইতে চাহেন না। সুখে থাকিতে ছাত্রনেতাদের কিল খাইতে কাহারই বা সাধ যায়? এই সমস্যার দুইটি স্বল্পমেয়াদি সমাধান সম্ভব। এক, কলেজ পরিচালনার দফতরি কাজগুলি হইতে অধ্যক্ষদের নিষ্কৃতি দেওয়া, তাঁহাদের শুধু পঠনপাঠনের তত্ত্বাবধানের কাজে মন দেওয়ার সুযোগ করিয়া দেওয়া। দুই, অধ্যক্ষদের বেতন তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বৃদ্ধি করা, যাহাতে তাঁহারা বাড়তি অশান্তির বোঝা বহন করিবার কিছু প্রণোদনা পান। সরকার এই দুইটি বিকল্পের যে কোনও একটি, বা দুইটিই, বাছিয়া লইলে অন্তত কিছু কলেজ শিক্ষক হয়তো অধ্যক্ষের দায়িত্ব লইতে আগ্রহী হইবেন। কেন শিক্ষকদের কলেজ অধ্যক্ষ হইতে কম কাজ বা অধিকতর বেতনের লোভ দেখাইতে হইবে, বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে এই প্রশ্ন করিয়া লাভ নাই। অতীতে পদটির যে সামাজিক সম্মান ছিল, রাজনীতির বেনোজলে তাহা পূর্বেই ভাসিয়া গিয়াছে। এখন পশ্চিমবঙ্গে আরাবুল ইসলাম সত্য, কেশপুর-জয়পুরিয়া-শান্তিপুর কলেজ সত্য। অতএব, লোভ দেখাইয়া যদি কিছু অধ্যক্ষ পাওয়া যায়, তবে তাহাই সই।

কিন্তু, এই সমাধানও সাময়িক। যত ক্ষণ না কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের স্বাভাবিকতা ফিরিতেছে, তত ক্ষণ অবধি সমস্যাটিও থাকিবে। পশ্চিমবঙ্গের দামাল ছাত্রদের স্মরণ করাইয়া দেওয়া প্রয়োজন, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক মানেই যে উচ্চাবচ, তাহা নহে। শিক্ষকরা বলিবেন, ছাত্ররা বিনা প্রশ্নে শুনিবে এবং মানিবে, এই ব্যবস্থা নাগপুরের পাঠশালায় মানানসই, কোনও গণতান্ত্রিক পরিসরে নহে। ছাত্ররা শিক্ষকদের প্রশ্ন করিবার অধিকারী, তাঁহাদের কোনও আচরণের বা সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করিবারও অধিকারী। এই প্রতিবাদও স্বাভাবিকতারই অঙ্গ। কিন্তু, সম্পর্কটিকে দাঁড়াইতে হইবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের ভিতে। কোনও অবস্থাতেই যে শিক্ষকের অসম্মান করা চলে না, এই কথাটি ছাত্রদের বুঝিতে হইবে। প্রাত্যহিকতা, সংঘাত বা মনান্তরের ঊর্ধ্বেও যে কিছু আছে, এবং শেষ অবধি সেই সংজ্ঞাতীত বিমূর্ত অনুভূতিটুকুই যে শিক্ষাক্ষেত্রের পরিবেশকে বাঁচাইয়া রাখিতে পারে, এই কথাটি ছাত্ররা যত দ্রুত বুঝিবে, পার্থবাবুদের সমস্যাও তত দ্রুত কমিবে। আগে এই কথাগুলি বলিয়া দেওয়ার প্রয়োজন পড়িত না, তাহা স্বাভাবিক সহবতের অঙ্গ ছিল। কালের অসুখ আসিয়া সহবতকে লইয়া গিয়াছে।

এই কথাগুলি ছাত্রদের বলিতে হইবে। সেই দায়িত্ব পার্থ চট্টোপাধ্যায়দের। মন্ত্রী হিসাবে যতখানি, রাজনৈতিক নেতা হিসাবে আরও বেশি। কারণ, যে বিষে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের স্বাভাবিক সুর মরিয়া গিয়াছে, তাহার নাম রাজনীতি। বিষবৃক্ষটি বাম আমলে রোপিত। কিন্তু পার্থবাবুরা তাহার মূলোচ্ছেদ করিতে বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেন নাই। রাজনীতির প্রশ্রয় আছে বলিয়াই ছাত্ররা শিক্ষকদের অপমান করিতে দ্বিধা করে না। বস্তুত, রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের কারণেই এহেন অনৈতিক, অনুচিত আচরণ ক্রমে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পাইতেছে। পার্থবাবুরা এই প্রশ্রয় বন্ধ করিতে পারিবেন কি? যদি না পারেন, কলেজে সমস্যা আরও বাড়িবে।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy