প্রশাসন যদি কোনও শিক্ষা নিতে চায়
এ বারের দেশপ্রিয় পার্ক পুজোর ঘটনা যদি প্রশাসনকে বিন্দুমাত্র ভাবিত করে থাকে, তবে শারদোৎসবের হিড়িকে কয়েকটি শর্ত আরোপিত হোক।
প্রথমত, কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ হোক পঞ্চমীর আগে পুজো উদ্বোধনের ‘ধামাকা’। মহাষষ্ঠীর আগে কোনও মতেই উন্মুক্ত হবে না প্রবেশ দ্বার। পুজো উদ্যোক্তাদের এবং প্রশাসনকে হয়তো সইতে হবে জনরোষের ধিক্কার। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে এই বিধিনিষেধ চালু হলে রাজ্য তথা কলকাতার নাগরিকদের উপকার হবে। দ্বিতীয়ত, বন্ধ করা হোক পুজোর চার/পাঁচ মাস আগে থেকে গদ্য-পদ্য-ভুলভাল উদ্ধৃতি সহকারে শহরময় পুজো হোর্ডিংয়ের বিজ্ঞাপনী চমক। তৃতীয়ত, সখেদে বলতে ইচ্ছে করে, পুজোটা বিপণন হতে হতে বনেদি বাড়ির অন্দরমহলেও ঢুকে পড়েছে। ঐতিহ্যসম্পন্ন আরাধনা সরাসরি যদি বোকা বাক্সে সম্প্রচারিত হয়, তখন প্রচার এবং প্রযুক্তির দৌলতে পাওয়া প্রাপ্তির ভাণ্ডার ভক্তিটক্তি (যদি থেকে থাকে) সব কিছুকে নস্যাৎ করে দেয়। থিম পুজোও হয়েছে তেমনই। কে কত জৌলুস অর্থব্যয় চমক এবং চোখধাঁধানিয়া বিচিত্র শিল্পকর্ম প্রদর্শন করতে পারে তারই এক অপ্রতিরোধ্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
সর্বশেষে, বিধিনিষেধ সম্পর্কে (প্যান্ডাল আয়তন পরিবেশ ইত্যাদি) প্রশাসনিক তরফে চূড়ান্ত সতর্ক-সিদ্ধান্ত অবহিত করা হোক পুজো উদ্যোক্তাদের।
খুঁটি পুজোর হাস্যকর অকেজো আবহে যে পুজো প্রস্তুতি পর্বের আগমনি সূচিত হওয়ার রীতি চালু হয়ে গিয়েছে তার রাশ টানা ভীষণ প্রয়োজন। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখতে অনুরোধ করি। পুজো এখন শহুরে বিনোদনের চরম স্তরে উপনীত। আমরা উৎসবপ্রিয় জাতি, এই তকমা শরীরে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। তাকে ঝেড়ে ফেলার কথা আসছে না। শুধু একটু সহনশীলতার কাঁটাতার দিয়ে উন্মত্ততাকে সীমাবদ্ধ করা হোক।
ধ্রুবজ্যোতি বাগচী। কলকাতা-১২৫
চামুণ্ডা
মহাভারতে (বনপর্ব ১২৯ অধ্যায়) আছে কুমার কার্ত্তিকেয় মহিষাসুর বধ করেছিলেন। জহর সরকার এ ঘটনাটির উল্লেখ করেছেন (‘অসুরকেও বাপের বাড়ি...’, ২০-১০)। মহাভারতের বনপর্বে কার্ত্তিকের পিতার নাম অগ্নি, মা কৃত্তিকা। তারকাসুর বধের জন্য কার্ত্তিকের জন্ম। তারকাসুরই মহিষাসুর। মহাভারতে দুর্গা অসুরনাশিনী নন। দুর্গা কুমারী। তাই এখনও কুমারী পুজো চলিত। ভাস্কর্যে দুর্গার আদিরূপ জটাজুটধারিণী মহিষমর্দিনী। জহরবাবুর অনুমান, এই মহিষ নিধনের সঙ্গে কৃষিজীবী মানুষের ‘মোষ তাড়িয়ে মেরে জমি দখল’-এর সম্পর্ক থাকতে পারে। এ প্রসঙ্গে কয়েকটা কথা।
এক, অষ্টমীর সন্ধিক্ষণে দুর্গার সঙ্গে চামুণ্ডা পুজো হয়। চামুণ্ডার রাজসিক ভোগ দেওয়া হয়। চামুণ্ডা অসিতবরণা, জটাজুটা। চামুণ্ডা এখন কালীতে রূপান্তরিতা। চামুণ্ডার দশম- একাদশ শতকের বহু প্রস্তরপ্রতিমা বাঁকুড়া এলাকায় আছে। চামুণ্ডা বা কালীপুজোতে প্রচুর মহিষ বলি হয় এখানে। আবার মানবাজারের খাটচিরিতে দশমীর দিন দুর্গার সামনে অনেক মোষ বলি হয়, তাও চামুণ্ডার উদ্দেশে। খাতড়ায় মোষ বলি হয় চতুর্ভুজা সিংহবাহিনীর প্রস্তরপ্রতিমার সামনে মাঘ মাসে। খাটচিরি, খাতড়ার পূজক হলেন আদিবাসীরা। অতএব, মোষ নিধনের সঙ্গে আদিপর্বে চামুণ্ডার যোগ থাকতে পারে।
দুই, বাঁকুড়ায় দুর্গার একটি প্রস্তরমূর্তি মহামায়া দুর্গা রূপে পূজিতা। তিনি কোকমুখা, এবং, মহিষ নয়, দু’হাত দিয়ে মর্দন করে হাতি বধ করছেন— ‘করিন্দাসুর মর্দিনী’। দেবী সাউথ ইন্ডিয়ান স্টাইলে শাড়ি পরিহিতা। পুরোহিত বলেন, ইনি দ্রাবিড়ি দুর্গা। মূর্তিটি অন্তত দশম-একাদশ শতকের।
তিন, পুত্রকন্যার সামনে দশভুজা মহিষাসুর বধ করছেন। ছেলেমেয়েরা হাঁটু মুড়ে বসে, দাঁড়িয়ে আছেন। মায়ের হাত গৌরবর্ণা, রক্তের দাগ নেই। এই প্রতিমা অধুনা কালের এবং আগমার্কা বাঙালি টাইপ। এর সঙ্গে উমা ও চণ্ডীর মিশেল কনসেপ্ট। প্রসঙ্গত, হাজার বছর আগেও বাঁকুড়া পুরুলিয়ায় শুধু মহিষমর্দিনী নয়, বহু রূপে দুর্গাপ্রতিমা নির্মিত ও পূজিতা হতেন। জৈনধর্মী মানুষ এই এলাকায় বহু রূপে দুর্গাপুজো করতেন। তাঁদের প্রতিষ্ঠিত দশম-একাদশ শতকের কিছু পাথরের প্রতিমা পাওয়া গেছে। সেগুলিতে শিব-দুর্গার কোলে দুই পুত্র আছেন, মেয়েরা নেই। পদতলে অন্নপূর্ণার ঝাঁপি, সিংহ বা মোষ নেই। মস্তকশীর্ষে ধানের ফলন্ত ঝাড়। একেবারে ওপরে ধ্যানাসীন মহাবীর। বর্তমানে বাঁকুড়া জেলায় ৬০টি মুণ্ড-দুর্গার পুজো হয়। শুধুমাত্র মাটির তৈরি মুণ্ডটি। এগুলির তাৎপর্য অনেক চেষ্টা করেও জানতে পারিনি।
অরবিন্দ চট্টোপাধ্যায়। বাঁকুড়া খ্রিশ্চান কলেজ, বাঁকুড়া
দুর্গা ও লোককথা
জহর সরকার লিখেছেন দুর্গা নামের উৎস ‘দুর্গম’ বা ‘গুহার দেবী’। এ বিষয়ে সাঁওতালি লোকসাহিত্যে একটি কাহিনি প্রচলিত। দেবাসুর সংগ্রামের সময় আর্যদের দলনেতা ছিলেন ইন্দ্র আর অসুর অর্থাৎ অনার্য গোষ্ঠীর দলনেতা ছিলেন দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী খেরোয়াল হুদুড় দুর্গা। এই খেরোয়ালরা এক সময় ভারতবর্ষের উত্তরে বসবাস করতেন। আর্য ভাষাগোষ্ঠীর মানুষের আধিপত্য বিস্তারের জন্য খেরোয়ালদের সঙ্গে আর্যদের প্রায়ই যুদ্ধ হত। আর্যদের সমস্ত চেষ্টা খেরোয়াল হুদুড় দুর্গা ব্যর্থ করে দিচ্ছিলেন। তখন ইন্দ্র এক কৌশল করলেন। তিনি পরমাসুন্দরী এক আর্য নারীকে কৌশলে হুদুড় দুর্গার কাছে উপহার হিসেবে পাঠালেন। হুদুড় দুর্গা সুন্দরী যুবতীর মোহিনী রূপে ক্রমে ক্রমে বশীভূত হলেন। খেরোয়ালদের সর্বনাশের পথ প্রশস্ত হল। আর্যসুন্দরীর হাতে হুদুড় দুর্গাকে মৃত্যুবরণ করতে হল। হুদুড় দুর্গা নিহত হওয়ার পর ভূমিপুত্র খেরোয়ালরা দুর্বল হয়ে পড়ে উত্তর ও পূর্বের দুর্গম পাহাড় ও জঙ্গলের দিকে পিছু হঠতে থাকে। আর্যাবর্তে আর্যদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
এর বহুকাল পরে পুরাণ রচয়িতারা সেই ছলনাময়ী নারীকে দেবী রূপে প্রতিষ্ঠিত করলেন। রচিত হল দেবীপুরাণ। হুদুড় দুর্গাকে বধ করার জন্য ওই নারীর তথা দেবীর নাম রাখা হল দুর্গা।
অশোক মুখোপাধ্যায়। কলকাতা-৫৩