একের পর এক স্কুলে চলছে পদত্যাগের পালা। পরিচালন সমিতির সভাপতিরা পদ ছাড়ছেন।
আপাত ভাবে বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হলেও ওয়াকিবহালমহল বলছে নির্বাচনের আগে এই চিত্র অতিস্বাভাবিক। আর সেখানেই উঠে আসছে শিক্ষা ব্যবস্থায় শাসকদলের হস্তক্ষেপের প্রসঙ্গটি।
শিক্ষা ব্যবস্থার উপর শাসকদলের আধিপত্য কায়েম নতুন কোনও ঘটনা নয়। প্রায় সব জমানাতেই এই অভিযোগ উঠেছে। বাম আমলে বিরোধী দলগুলির পছন্দের শব্দবন্ধ ছিল ‘শিক্ষার অনিলায়ন’। শিক্ষা ব্যবস্থা কী ভাবে শাসকের মুঠোয় বন্দী, তা বোঝাতেই এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হতো। রং বদলে রাজ্যের ক্ষমতা যখন তৃণমূলের হাতে গেল, তখন তা হয়ে গেল ‘টাকা দিই, তাই নাক গলাই’। ২০১৫ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের এমন উক্তির ফলে সরাসরি এই ‘নাক গলানো’র প্রসঙ্গ উঠে আসতে শুরু করল। শিক্ষকদের একাংশের অভিযোগ, শাসকদলের আধিপত্য কায়েমের অন্যতম হাতিয়ার যে কোনও সরকারি বা সরকার অধীনস্থ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালন সমিতি।
সে অভিযোগ যে মিথ্যে নয়, তা ফের প্রমাণ করছে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬। বিকাশ ভবন সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে, শুক্রবার পর্যন্ত ৪০টিরও বেশি স্কুলের পরিচালন সমিতি থেকে পদত্যাগ করেছেন সভাপতিরা। এই প্রবণতা অবশ্য নতুন কিছু নয়, জানাচ্ছে বিকাশ ভবনেরই একটি সূত্র। প্রায় প্রতিটি নির্বাচনের আগেই সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালন সমিতিতে সভাপতি পদ ছাড়ার হিড়িক পড়ে যায়।
আরও পড়ুন:
কারণ, ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনে লড়তে হলে প্রার্থীকে যে কোন সরকারি পদ ছাড়তেই হবে। স্কুল পরিচালন সমিতির সভাপতির পদ সরকার মনোনীত। তাই নির্বাচনী মনোনয়ন পেশের আগে সেই পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। অর্থাৎ যাঁরা পদত্যাগ করতে চাইছেন, সকলেই এ বারে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সূত্রের দাবি, তাঁরা সকলেই শাসকদলের প্রার্থী। ফলে, দলীয় হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষকেরা।
বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, ‘‘এ থেকেই প্রমাণ হয় শিক্ষায় দলীয় রাজনীতি কী ভাবে চেপে বসেছে। ক্ষমতায় আসার আগে যাঁরা বলেছিলেন শিক্ষাকে রাজনীতি মুক্ত করবেন, তাঁরা সম্পূর্ণ উল্টো কাজই করে যাচ্ছেন।’’ মাধ্যমিক শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সম্পাদক অনিমেষ হালদার বলেন, ‘‘আমরা আগেই বলেছিলাম স্কুলগুলিকে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত থেকে যে ভাবে সরকার পোষিত করা হচ্ছে তার ফলে শাসকদল স্কুলের পরিচালন সমিতিতে নাক গলানোর রাস্তা তৈরি হচ্ছে। এখন সেটাই বাস্তব।’’
শিক্ষকদের একাংশের অভিযোগ, সরকার ও বিরোধীদের আসনের শুধু বদল হয়েছে। দলীয় হস্তক্ষেপ রয়ে গিয়েছে আগের মতোই। বাম আমলের ঐতিহ্যই তৃণমূল বহন করে চলেছে বলে অভিযোগ।
নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুজিত দাস অবশ্য বলেন, ‘‘অনিলায়ন বলে কিছুই কোনও দিন ছিল না। থাকলে বাম সমর্থিত নয় এ রকম কেউ চাকরিই পেতেন না। যোগ্যতাই ছিল একমাত্র মাপকাঠি। এখন পরিচালন সমিতির নির্বাচন বন্ধ করে দলীয় রাজ কায়েম হয়েছে।’’
তবে দলীয় হস্তক্ষেপের অভিযোগ মানতে চাননি পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির রাজ্য সভাপতি প্রীতমকুমার হালদার। তিনি বলেন, ‘‘১৯৭২ সালের নিয়ম অনুযায়ী পরিচালন সমিতির কাজ চলছে। যাঁরা নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন তাঁরা সকলেই দলের প্রভাবশালী নেতা, এই অভিযোগ একদম ঠিক নয়। আসলে অতীতে যাঁরা দলীয় রাজ কায়েম করে শিক্ষা ব্যবস্থাকে কলুষিত করেছিল তাঁরা এখন নির্বাচনের সময়ে ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে।’’