প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির দায়ে চাকরি হারিয়েছেন এ রাজ্যের প্রায় ২৬ হাজার মানুষ। তাঁরা কেউ শিক্ষক, কেউ শিক্ষাকর্মী। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায়েই কারও কারও সবেতন চাকরি বহাল রয়েছে আগামী অগস্ট পর্যন্ত। কারও ঘরে বেতন আসেন গত ৯ মাস। এরই প্রতিবাদে এবং অবিলম্বে পুনর্বহাল অথবা, বিকল্প ব্যবস্থার দাবি তুলে বিকাশ ভবন অভিযান করলেন রাজ্যের গ্রুপ-সি ও গ্রুপ-ডি চাকরিহারা শিক্ষাকর্মীরা।
সোমবার, সপ্তাহের প্রথম কাজের দিনে তাঁরা চাকরিতে পুনর্বহাল ও বেতন চালুর দাবিতে করুণাময়ী থেকে মিছিল শুরু করেন। খানিক দূরেই আটকে দেওয়া হয় মিছিল। শিক্ষামন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের দাবি আন্দোলন শুরু করেন ‘যোগ্য’ চাকরিহারা শিক্ষাকর্মীরা। ময়ূখ ভবনের উল্টো দিকে পুলিশ তাঁদের বাধা দিলে তাঁরা সেখানেই বসে পড়েন। দাবি তোলেন সকলকে বিকাশ ভবনে যেতে দিতে হবে। দুপুর পর্যন্ত চলে বিক্ষোভ।
আরও পড়ুন:
উল্লেখ্য, গত ৩ এপ্রিল প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে ২০১৬ সালের শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী নিয়োগের সম্পূর্ণ প্যানেল বাতিল করে সুপ্রিম কোর্ট। তাতে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর চাকরি যায়। ‘যোগ্য’ শিক্ষকদের সবেতন চাকরি থাকলেও, গ্রুপ-সি ও গ্রুপ-ডি কর্মীদের জন্য তেমন কোনও নির্দেশ দেয়নি সর্বোচ্চ আদালত। গত ৯ মাস তাঁরা বেতনহীন। এ দিকে কত দিনে ফের এসএসসি পরীক্ষা হবে, তা-ও অনিশ্চিত
গত ১৫ ডিসেম্বর শেষ হয়েছে গ্রুপ-সি ও গ্রুপ-ডি কর্মী নিয়োগের জন্য আবেদন গ্রহণ প্রক্রিয়া। প্রায় ১৬ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে বলে খবর। কিন্তু ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত স্কুল সার্ভিস কমিশন (এসএসসি) পরিষ্কার করেনি যে কবে শিক্ষাকর্মী নিয়োগের পরীক্ষা হবে।
এ দিকে ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোট। চাকরিহারা শিক্ষাকর্মীদের আশঙ্কা যত সময় গড়াবে ততই তাঁদের চাকরিতে ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ হবে। এ প্রসঙ্গে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন গ্রুপ-সি চাকরিহারা অমিত মণ্ডল। তিনি বলেন, “শিক্ষকদের জন্য সরকার ভাবছে। কিন্তু শিক্ষাকর্মীদের জন্য এখনও কিছুই করেনি। আমরা কোনও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত নই, তবু গত ৯ মাস বেতনহীন। হয় অবিলম্বে আমাদের চাকরিতে পুনর্বহাল করুন, না হলে বিকল্প ব্যবস্থা করুন।”
গ্রুপ-সি চাকরিহারা সোমা রায় বলেন, “পরিবারে একমাত্র রোজগেরে ছিলাম আমি। প্রতি মাসে প্রায় ১২ হাজার টাকা কিস্তিতে ঋণ শোধ করতে হয়। গত সাড়ে ৪ বছর চাকরি করে যেটুকু সঞ্চয় করেছিলাম, তা নিঃশেষিত প্রায়। সরকার আমাদের বঞ্চনা করছে।” বীরভূম থেকে এসেছিলেন গ্রুপ-সি চাকরিহারা ঝিনুক হাজরা। তিনি বলেন, “২০২৩ সালে ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে স্বামী মারা গিয়েছেন। আমার এক মেয়ে রয়েছে। দুবরাজপুর আমার স্কুল। আমার এখন সংসার কী করে চলবে? মেয়েকে মানুষ করব কী করে?”
আন্দোলনরত গ্রুপ-সি ও গ্রুপ-ডি কর্মীদের দাবি, সরকার যখন ৩৫১২জনের তালিকা প্রকাশ করে ‘অযোগ্য’-বলে দাবি করেছে তখন বাকিদের নিয়োগ নিয়ে এত গড়িমসি কেন? অবিলম্বে সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হোক।
হিসাব বলছে, ২০১৬ সালে নিয়োগে গ্রুপ-সি ও গ্রুপ-ডি মিলিয়ে স্কুলে স্কুলে নিয়োগের জন্য প্রায় ১৮ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছিল। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগে সে বারের গোটা প্যানেলই বাতিল করে সুপ্রিম কোর্ট। এসএসসি সূত্রে খবর, গ্রুপ-সি বিভাগে ২৯৮৯টি এবং গ্রুপ-ডি বিভাগে ৫৪৮৮ টি শূন্যপদ রয়েছে।
শিক্ষাকর্মীদের এই বিরাট শূন্যতা নিয়ে বিপাকে স্কুলগুলিও। ফুল মালঞ্চ ঋতু ভগৎ হাইস্কুলে প্রধানশিক্ষক অম্বরিশকুমার দত্ত বলেন, “আমাদের স্কুলে এই মুহূর্তে পড়ুয়ার সংখ্যা প্রায় ৩০০০। কিন্তু শিক্ষাকর্মী রয়েছেন মাত্র একজন। স্কুলের কাজ চলবে কী করে?”