Advertisement
E-Paper

শিক্ষার খোলনলচে বদলে দেবে নতুন সরকার! বিকাশ ভবনের বৈঠকে আলোচনা হল কোন কোন বিষয়ে?

গত সোমবার বিকাশ ভবনে শিক্ষার সার্বিক অবস্থা নিয়ে স্বপন দাশগুপ্ত, শঙ্কর ঘোষ সহ প্রায় ১৭ জন বিজেপি বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্কুলশিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা দফতরের কর্তারা। শঙ্কর ঘোষ জানিয়েছিলেন যে আলোচনার বিষয়বস্তু মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে জানানো হবে। তার পর শিক্ষার নীতি নির্ধারিত হবে।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২০ মে ২০২৬ ১৫:৩৬

গ্রাফিক : আনন্দবাজার ডট কম

বিজেপি শাসিত রাজ্যে কি শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হতে চলেছে? গত সোমবার বিকাশ ভবনে নির্বাচিত বিধায়কদের সঙ্গে শিক্ষা দফতরের আধিকারিকদের বৈঠকের পর উস্কে উঠেছে জল্পনা। কী নিয়ে আলোচনা হল, কোন পথে এগোবে শিক্ষার আগামী দিন?

গত কয়েক বছরে একের পর এক অভিযোগ উঠেছে শিক্ষা দফতরের নানা ক্ষেত্র থেকে। সব থেকে বড় ঘটনা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির দায়ে ২৬০০০ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি খোয়ানো। ফলে দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন, সার্বিক পরিকাঠামো উন্নয়ন, পড়ুয়ার অভাব থেকে শিক্ষকদের বদলি— নানা বিষয়ে তৈরি হয়েছে প্রত্যাশা।

গত সোমবার বিকাশ ভবনে শিক্ষার সার্বিক অবস্থা নিয়ে স্বপন দাশগুপ্ত, শঙ্কর ঘোষ সব প্রায় ১৭ জন বিজেপি বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্কুলশিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা দফতরের কর্তারা। শঙ্কর ঘোষ জানিয়েছিলেন যে আলোচনার বিষয়বস্তু মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে জানানো হবে। তার পর শিক্ষার নীতি নির্ধারিত হবে।

সূত্রের খবর, সে দিনের এক ঘণ্টারও বেশি বৈঠক চল। সেখানে যে বিধায়কেরা উপস্থিত ছিলেন তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই তাঁদের পর্যবেক্ষণ আলোচনায় তুলে ধরেন। যে ইস্যুগুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে সেগুলি হল,

স্কুল স্তরের দুর্নীতি

সূত্রের খবর, ওই আলোচনায় এক বিধায়ক স্কুল ও কলেজের পরিচালন সমিতিগুলির দুর্নীতি প্রসঙ্গও তুলে আনেন। তাঁর দাবি, শুধু ২০১৬ শিক্ষক নিয়োগ নয়, দুর্নীতি রয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে।

দাবি, ওই সব পরিচালন সমিতিতে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের বসিয়ে আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করেছে তৎকালীন শাসকদল। কোথাও কোথাও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে অভিযোগও হয়েছে। সে সব স্কুল-কলেজে গিয়ে তদন্ত করে দেখুক সরকার, উঠেছে দাবি। বিশেষ দল গঠন করে সশরীরে স্কুল পরিদর্শন করে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা এবং উপযুক্ত শাস্তির জন্য সুপারিশ করার প্রস্তাবও হয়েছে।

মিড-ডে মিল থেকে শুরু করে পরিকাঠামো উন্নয়নের অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন আরও এক বিধায়ক।

পড়ুয়া শিক্ষক অনুপাত

অভিযোগ ওঠে, অধিকাংশ সরকারি বা সরকার পোষিত স্কুলে পড়ুয়া-শিক্ষকের অনুপাত ঠিক নেই। গ্রামের দিকে পড়ুয়ার সংখ্যা বেশি। তুলনায় শিক্ষক নেই। আবার এমন অনেক স্কুল রয়েছে যেখানে পড়ুয়ার তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা কম। এ জন্য স্কুলশিক্ষা দফতরের রিপোর্ট নিয়ে নির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরির পক্ষে মত দিয়েছেন বৈঠকে উপস্থিত বিধায়কদের একাংশ।

শিক্ষকদের বদলি

অনুপাতের আলোচনার সময়েই উঠে আসে শিক্ষকদের বদলির প্রসঙ্গ। সূত্রের খবর, এক সদস্য জানান উৎসশ্রী পোর্টালের মাধ্যমে গ্রামের দিকের বহু স্কুলের শিক্ষক বা শিক্ষিকা শহরের দিকের স্কুলে বদলি নিয়ে এসেছেন। এর ফলে গ্রাম বা শহরতলি যেখানে এই সব স্কুলের চাহিদা বেশি সেখানে সমস্যা হচ্ছে। তাই এ সব ক্ষেত্রে বিকল্প কী ব্যবস্থা করা যায় সেটা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন বুঝে কিছু শিক্ষককে ফের পুরনো স্কুলে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান এক সদস্য।

এক আধিকারিকের প্রস্তাব, চিকিৎসকের মতো চাকরি জীবনের মধ্যে কিছু বছর অন্তত গ্রামে শিক্ষকতা বাধ্যতামূলক করা উচিত।

প্রতিটি স্কুলের ভিন্ন পোশাক

সব স্কুলের একই নীল-সাদা পোশাকের পরিবর্তে স্কুলের কর্তৃপক্ষের পোশাক বাছার ভার দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন অধিকাংশ বিধায়কেরা। প্রতিটি স্কুলের পোশাকের সঙ্গে যে স্কুলের গরিমা যুক্ত সেটা ফের ফিরিয়ে দেওয়া হোক বলেই জানিয়েছেন তাঁরা।

শিক্ষাবর্ষের পরিবর্তন

বর্তমানে স্কুলে জানুয়ারি-ডিসেম্বর শিক্ষাবর্ষ মান্য। কিম্তু সোমবারের আলোচনায় এপ্রিল-মার্চ শিক্ষাবর্ষের পক্ষে মত প্রকাশ করেন অনেকেই। তাঁরা যুক্তি দেখিয়েছেন, বর্তমান নিয়মে জানুয়রি-ডিসেম্বর শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার সঙ্গে অন্য ক্লাসের পরীক্ষা নিতে সমস্যা হয়। পাশাপাশি নানা রকমের ছুটির কারণে ক্লাসের সংখ্যা কমছে। বর্তমানে সিবিএসই বোর্ডের শিক্ষাবর্ষও এপ্রিল-মার্চ। তাই শিক্ষাবর্ষ পরিবর্তনের দিকটি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

পড়ুয়াদের মধ্যে সংবাদপত্র পড়ার অভ্যাস তৈরি

প্রতিটি স্কুলে পড়ুয়াদের মধ্যে সংবাদপত্র পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে উদ্যোগী হতে চাইছেন নব নির্বাচিত বিধায়কেরা। তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় এসে পাঠাগারে নির্দিষ্ট কিছু সংবাদপত্র না রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। সোমবারের বৈঠকে অবশ্য কোন সংবাদপত্র রাখা হবে বা কোন সংবাদপত্র রাখা হবে না, তা নিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি। তবে সংবাদপাঠের উপকারিতে সম্পর্কে বিশদ আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। স্কুলে একাধিক সংবাদপত্র রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

মিড-ডে মিল খাবারের মানোন্নয়ন

মিডে-ডে মিলে খাবারের পদ ও মানে কী ভাবে পরিবর্তন আনা সম্ভব তা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। বর্তমানে বরাদ্দ অর্থেই কী ভাবে খাবারের মান আরও ভাল করা যায় তা নিয়ে বিধায়কেরা নানা মত দেন। বরাদ্দ অর্থ বৃদ্ধি করার কোনও উপায় রয়েছে কি না— তা নিয়েও আলোচনা হয়।

পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন

দিল্লির সর্বভারতীয় পরীক্ষায় এ রাজ্যের পিছিয়ে পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে বার বার উঠে এসেছে পাঠ্যক্রমের প্রসঙ্গ। বিশেষ করে বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস ও সাহিত্যে বড় রকমের পরিবর্তনের পক্ষে সওয়াল করেছেন নব নির্বাচিত বিধায়কেরা। যুগোপযোগী পাঠ্যক্রমের তৈরির প্রস্তাব হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

তবে দাবি উঠেছিল পৃথক ‘সিলেবাস কমিটি’-র বদলে মধ্যশিক্ষা পর্ষদের মাধ্যমেই পাঠ্যক্রম নির্ধারণ করা হোক। সেই বিষয়ে অবশ্য কোনও আলোচনা হয়নি বলেই খবর।

শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ

সরকারি ও সরকারি পোষিত স্কুলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে ওই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। রাজ্যে এসসিইআরটি-র মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় কি না— সেটাও ভেবে দেখা হচ্ছে বলে খবর।

কলেজের সার্বিক অবস্থা

কলেজের বিষয়ে আলোচনার শুরুতেই জানানো হয় যে ডিগ্রি কোর্সের কলেজের পড়ুয়াদের সংখ্যা কমছে। যে সব জায়গায় পড়ুয়ার সংখ্যা একেবারে কম সেগুলি অন্য কোনও কলেজের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া যায় কিনা— তা খতিয়ে দেখার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি কলেজ শিক্ষকদের শূন্যপদে নিয়োগ করে পরিকাঠামোর উন্নয়নে মাধ্যমে উচ্চশিক্ষাকেও উন্নত করার জন্য বিস্তারিত ভাবে আলোচনা হয়েছে বলে খবর।

এই প্রসঙ্গেই উস্কে উঠেছে শিক্ষায় গৈরিকীকরণের প্রসঙ্গ। শিক্ষকদের একাংশ সিঁদুরে মেঘ দেখছেন। বিশেষত পাঠ্যক্রম বদলের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, ‘‘বিগত সরকার শিক্ষাকে বহু বছর পিছিয়ে দিয়েছে। বর্তমান সরকার যদি বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে শিক্ষার উন্নতি করতে চায় তা হলে সব ক্ষেত্রেই মঙ্গল। কিন্তু শিক্ষায় কোনও রকম গৈরিকীকরণের বিপক্ষে আমরা।”

WB Education
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy