ওদের কারও বয়স ১৮ পেরোয়নি। ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী নেই ভোটদানের অধিকার। এমনকি রাজনৈতিক মিছিল, সমাবেশেও ওদের দেখা যাওয়ার কথা নয়। তবু ওরাই সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয় বিশ্বের সব থেকে বড় গণতন্ত্রের নির্বাচন-যজ্ঞে, এমনই মনে করছে শিক্ষামহল। ওরা স্কুলপড়ুয়া।
শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের দাবি, ভোট আসে, ভোট যায়। রাজনৈতিক দলাদলি আর নির্বাচনী আচরণে দেশের শাসন ওলটপালট হয়ে যায়। আর সে জন্য দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকে স্কুল। দেশের প্রতিটি নির্বাচনে ভোট কর্মী হিসাবে সব থেকে বেশি দায়িত্ব পান প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং শিক্ষাকর্মীরা। চলতি বছর প্রায় সব নজির ভেঙে নির্বাচনী কাজে ব্যবহার করা হয়েছে স্কুল শিক্ষকদের।
স্কুল শিক্ষকদের একাংশের দাবি, এ রাজ্যে গত নভেম্বরে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনীর (এসআইআর) কাজে যুক্ত করা হয়েছিল বিভিন্ন স্তরের স্কুল শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের। মে মাসে ভোট পর্ব না মেটা পর্যন্ত থাকবে দায়িত্ব। এ দিকে, ভোটকর্মী হিসাবে আবার নতুন করে দায়িত্ব পড়েছে অন্য শিক্ষকদের। এ বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ যেমন রয়েছে, তেমনই চিন্তা রয়েছে বিভিন্ন স্কুলের প্রধানশিক্ষকদের। তবে তাঁদের একাংশের দাবি, এ নিয়ে মন্তব্য করার স্বাধীনতাটুকুও পাচ্ছেন না তাঁরা।
তার উপর, গত মার্চ থেকেই রাজ্যে ঢুকতে শুরু করেছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। জওয়ানদের থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করা হয় স্কুল-কলেজেই। ফলে পঠনপাঠন কার্যত শিকেয় উঠেছে বলে অভিযোগ। এমনকি, এপ্রিলের পর্যায়ক্রমিক পরীক্ষাও স্থগিত করে দিতে হয়েছে স্কুলগুলিকে।
তবে এ বার পরিবর্তন চাইছে শিক্ষামহল। ছোটদের পড়াশোনায় প্রভাব না ফেলে নির্বাচন করার পক্ষে সওয়াল করছেন শিক্ষক, শিক্ষাবিদ থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদেরাও। তাঁরা মনে করছেন, বার বার শিক্ষা ক্ষেত্রকেই নির্বাচনের কাজে ব্যবহার করায় সমাজের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদি। তাই বহু বছরের এই ব্যবস্থার পরিবর্তন করার দাবি জোরাল হচ্ছে।
বিশেষত এ বার, নভেম্বর ২০২৫ থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত শিক্ষকদের উপর নির্বাচনী দায়িত্ব থাকায় মারাত্মক প্রভাব পড়েছে সরকারি ও সরকার পোষিত স্কুলগুলির উপর। প্রবীণ শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার মনে করেন, নির্বাচনী কাজের দায়িত্ব থেকে শিক্ষকদের অব্যাহতি দেওয়া প্রয়োজন। বরং সে কাজের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে সমাজের শিক্ষিত, কর্মদক্ষ যুব সম্প্রদায়কে। যাঁরা কোনও চাকরি পাননি এখনও।
তিনি বলেন, ‘‘শিক্ষিত চাকরিহীন যুব সম্প্রদায়ের দক্ষতাকে নির্বাচন কমিশনের ব্যবহার করা উচিত। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভোটের কাজে না ব্যবহার করে যদি এই সব শিক্ষিত ও দক্ষ ছেলেমেয়েদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও পারিশ্রমিক দিয়ে নির্বাচনের যে কোনও কাজে ব্যবহার করা যায়।”
হিসাব বলছে, এক সময় শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়কে ব্যবহার করা হতো জনগণনার কাজে। এমনকি ষাট-সত্তরের দশকে বহু যুবক এ ভাবে কাজ করেছেন। পবিত্র সরকার বলেন, “এ জন্য নির্বাচন কমিশনকে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করতে হবে।’’
স্কুলগুলিতে কেন্দ্রীয় বাহিনী রাখার পক্ষে নন অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকার। বরং তিনি বিকল্প পথের সন্ধান দিয়ে বলেন, ‘‘স্কুলে কেন্দ্রীয় বাহিনীর থাকার ব্যবস্থা করার আগে সেই জায়গা এমন ভাবে নির্বাচন করতে হবে যেন তার পাশাপাশি কোনও বড় স্কুল থাকে। যেখানে বন্ধ হওয়া স্কুলের পড়ুয়ারা ক্লাস করতে পারে।’’ এতে অন্তত ক্লাস বন্ধ না রেখেও নির্বাচনের কাজ চলতে পারে বলে মত তাঁর। শিক্ষা ব্যবস্থায় আঘাত করলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয় বলে জানিয়েছেন এই অর্থনীতিবিদ।
শিক্ষক সংগঠনগুলিও প্রায় একই মত প্রকাশ করছে। এমনকি কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতিতেও উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষকদের শিক্ষা ব্যতীত অন্য কোনও কাজে ব্যবহার করা যাবে না, দাবি বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডলের। তিনি বলেন, ‘‘এমন অনেক শিক্ষিত ছেলেমেয়ে রয়েছেন যাঁদের নির্বাচনী কাজে যুক্ত করা হলে তাঁরা উপকৃত হবেন। শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের এ ভাবে স্কুল থেকে দূরে সরিয়ে রাখার ফলে শিক্ষার যে ভয়ঙ্কর ক্ষতি হচ্ছে সেটাও রোধ করা যাবে। কেন্দ্রকে অবশ্যই এই বিষয়ে ভাবনা চিন্তা করতে হবে।’’
অল ইন্ডিয়া ফেডারেশন অফ এডুকেশনাল অ্যাসোসিয়েশনস-এর সাধারণ সম্পাদক নবকুমার কর্মকার বলেন, ‘‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীয় বাহিনী রাখার বদলে যদি অন্যত্র কোনও ব্যবস্থা করা যায় তা হলে ওই প্রতিষ্ঠানগুলির কাজে বাধা পড়ে না। শিক্ষার্থীদেরও সুবিধা হবে।”