×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৭ মে ২০২১ ই-পেপার

এ বারেও ফিরতে পারল না বাম দল, ভীষণ খারাপ লাগছে আমার

বাদশা মৈত্র
০২ মে ২০২১ ১৭:০২

শাসকদল ফিরছে। জয় ঘোষণা সময়ের অপেক্ষা। এ বারেও ফিরতে পারল না বাম দল। ভীষণ খারাপ লাগছে। যে ভাবে ২০২১-এর নির্বাচনে প্রার্থীরা ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলা জুড়ে তাতে এতটা খারাপ ফলাফল তাঁদের প্রাপ্য ছিল না। তার মধ্যেও বলব, বাম শিবির নির্বাচনী প্রচারে বার বার ঘোষণা করেছিল, বিজেপি যেন কোনও ভাবেই বাংলা দখল করতে না পারে। রাজ্যবাসী সেই অনুরোধ অক্ষরে অক্ষরে মেনেছেন। একই সঙ্গে জিতে গেলেন প্রশান্ত কিশোর আর তাঁর স্ট্র্যাটেজি। তাঁর মুকুটে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জয় নিঃসন্দেহে দামি পালক।
এর পরেই প্রশ্ন উঠবে বাম সমর্থক হিসেবে আমি কি আবারও রিগিং, ইভিএম মেশিনের কারচুপির কথা বলব? একেবারেই তা নয়। ২১-এর নির্বাচন সব দিক থেকেই জনতা জনার্দনের। জনগণ যেটা ভাল মনে করেছেন, যাঁকে যোগ্য মনে করেছেন, যে দলকে সঠিক ভেবেছেন তাঁকেই বেছেছেন। তার পরেও নিজের মত থেকে একচুল সরছি না। বাংলার উন্নয়নের জন্য প্রচারে যা যা বক্তব্য সেটা এখনও আমার কাছে ধ্রব সত্য। এখন প্রশ্ন, আমি যেটা বুঝেছি সেটা পশ্চিমবঙ্গ বুঝেছে কি?
রাজ্যবাসীকে আমরাই বা কতটা বোঝাতে পেরেছি? যদি আমাদের বার্তা সঠিক ভাবে সবার কাছে পৌঁছত, যদি রাজ্যবাসী আমাদের কথা বুঝতেন তা হলে নিশ্চয়ই অন্য ফল দেখা যেত। কিংবা এমনও হতে পারে, রাজ্যবাসীর এখন মনে হচ্ছে বেঁচে থাকাটাই যথেষ্ট। তাই যা ছিল বা যে ছিল তাকে নিয়ে চলার পক্ষে রায় দিয়েছে।
কেরলের সঙ্গেও ইতিমধ্যেই তুলনা টানা হচ্ছে। যাঁরা এটা করছেন তাঁদের বলব, কেরল আর বাংলার মানসিকতা কিন্তু এক নয়। উদাহরণ দিলে বিষয়টি সহজবোধ্য হবে। কেরলে ২ বছর বা ৫ বছর অন্তর ক্ষমতা বা সরকার বদলের একটা প্রবণতা রয়েছে। আমাদের রাজ্যে সেটা নেই। আমরা লম্বা সময় ধরে একটি শাসকদলকেই দেখতে চাই বা দেখে অভ্যস্ত। যেমন, বাম দল ৩৪ বছর শাসন করেছে। এর পরেই গত ১০ বছর ধরে বাংলায় শাসন কায়েম তৃণমূলের। ৩৪ বছরের কাছে ১০ বছর তো বেশি সময় নয়। আরও ১০ বছর জনগণ এদের চাইতেই পারে। দেখতে চায়, প্রচারে শাসকদল যা যা বলেছে সেগুলো বাস্তবায়িত হবে কি না। এই দেখে নিতে চাওয়া থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রত্যাবর্তন। এমনটাও তো হতে পারে!
নন্দীগ্রামে মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায় আশার জন্ম দিয়েছেন, কথাটা কানে এসেছে। শুরুতেই বলি, আমরা যাঁরা প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত তাঁরা কিন্তু এরকম কোনও আশা করিনি। আমরা জানতাম, নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে মিনাক্ষীর জেতা অসম্ভব। তবে হ্যাঁ, নন্দীগ্রামে একটা সময় মিটিং, মিছিল হতে পারছিল না। মিনাক্ষী সেটা ভেঙেছেন। মানুষ বেরিয়ে এসে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন। এ বারের নির্বাচন থেকে বাম দলের এটাই পাওনা। এটাই আমাদের আন্দোলন বা পরিবর্তন। আশা করছি, এটাই আগামী দিনে আরও বড় হয়ে ধরা দেবে। শুধু একা মিনাক্ষী নন, ঐশী, অভিরূপ-সহ সমস্ত তরুণ ব্রিগেড এই জায়গাটা তৈরি করে দিয়েছেন। এঁদের সবার প্রতি আমার, আমাদের যথেষ্ট আশা আছে।
এ বার বলব বিজেপির ব্যর্থতার কারণ। বিজেপির প্রচারের ভঙ্গি, ভাষা কোনওটাই ভাল লাগেনি বাংলার মানুষের। আমি নিজে জন সমাবেশে একাধিক বার শুভেন্দু অধিকারীর নিন্দা করেছি। তিনি যে ভাষায় যে ভাবে মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ করেছেন সেটা বাংলার রুচি, সংস্কৃতি নয়। বিরোধী দলের সমর্থক হয়ে আমার খারাপ লেগেছে। তা হলে ভাবুন, সমর্থকদের কতটা খারাপ লেগেছে? আক্রমণের ভাষা নিশ্চয়ই অন্য রকম হবে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণের ভাষা একই সঙ্গে সংযতও হবে। শুভেন্দু ভীষণ কুৎসিত ভাবে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন। তা ছাড়া, উঠতে বসতে গেরুয়া শিবিরের সাম্প্রদায়িক ইঙ্গিত তো ছিলই। ধর্মের মেরুকরণ বাংলায় যে চলবে না সেটাও রাজ্যবাসী খুব স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিল। আর ছিল ‘লাভ জিহাদ’। পশ্চিমবঙ্গ কোনও ভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ভালবাসায় ভাগ-বাঁটোয়ারা করতে দেবে না। নির্বাচনের ফলাফল তার প্রমাণ। সর্ব স্তরেই এই মানসিকতা ছড়িয়ে। তাই বেশ কিছু আসনে জিতলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে তারা যে আসন পায়নি তার জন্য সত্যিই ধন্যবাদ রাজ্যবাসীদের। আমি বলব, নির্বাচনের এটাই শুভ দিক। নইলে যে হারে বিজেপি নেতা-মন্ত্রীরা প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন, টাকার লোভ দেখিয়েছিলেন তাতে রাজ্যবাসী ধোঁকা খেলেও খেতে পারতেন। একই সঙ্গে তারকা, রাজনীতিদের দলবদলও সাধারণ মানুষ ভাল চোখে দেখেনি। তারও ছাপ পড়েছে ব্যালট বাক্সে।
দল বদলের হিড়িক দেখে খোদ মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে না বললেও কিছুটা থমকে গিয়েছিলেন। ভয় পাচ্ছিলেন, বাকি স্তম্ভরাও যদি চলে যান! যাঁরা তার মধ্যেও পাশে থেকে মনোবল বাড়িয়েছেন তাঁর, সেই সব প্রার্থী এবং তারকা প্রার্থীদের প্রশংসা করব। কঠিন পরিস্থিতিতেও পাশে থেকে শাসকদলের হাত শক্ত করেছেন। একই সঙ্গে তাঁরা সাধারণ মানুষকেও সেটা বোঝাতে পেরেছেন। তাই আমরা মৌলিক ভাবে ‘বিজেমূল’ অর্থাৎ বিজেপি-তৃণমূলের মধ্যে আঁতাত দেখতে পেলেও সাধারণ মানুষের চোখে সেটা ধরা পড়েনি। দুটো আলাদা দল হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছেন।
তাই জয় শাসকদলের। জয় জনগণের রায়ের।

Advertisement
Advertisement