শেষ হল শেষ দফার প্রচার। এক দিকে প্রধানমন্ত্রী, অন্য দিকে মুখ্যমন্ত্রী। একই দিনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, রাজ্যের বিরোধী দলনেতা থেকে শাসকদলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতার কর্মসূচি শেষ হল সোমবার সন্ধ্যায়। তবে প্রথম দফার মতো ‘শান্তিপূর্ণ’ রইল না দ্বিতীয় দফার ভোটপ্রচার। উত্তর ২৪ পরগনা থেকে হুগলি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে পূর্ব বর্ধমান— বিক্ষিপ্ত অশান্তিতে তটস্থ রইল নির্বাচন কমিশন। যুযুধান দুই পক্ষের শীর্ষ নেতাই হুঁশিয়ারি দিলেন, বাকি হিসাব হবে ৪ মে, ভোটের ফলপ্রকাশের পর।
মোদীর গ্যারান্টি
দ্বিতীয় দফার ভোটের শেষ দিনের প্রচারে রাজ্যে একটিমাত্র সভা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। স্থান, উত্তর ২৪ পরগনার জগদ্দল। যেখানে রবিবার রাতেই তৃণমূল এবং বিজেপির সংঘর্ষে উত্তেজনা ছড়ায়। রাতে জগদ্দল থানায় অভিযোগ জানাতে গিয়ে আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ করেন সেখানকার বিজেপি প্রার্থী তথা প্রাক্তন আইপিএস রাজেশ কুমার। সেই জায়গায় সভা করে মোদী গ্যারান্টি দিলেন, তোষণের রাজনীতি থেকে পশ্চিমবঙ্গকে মুক্তি দেবেন। সুভাষচন্দ্র বসুর উক্তি মনে করিয়ে মোদী বলেন, ‘‘আপনারা ৭০ বছর কংগ্রেস, বাম, তৃণমূলকে দিয়েছেন। একটা সুযোগ বিজেপি-কে দিন, মোদীকে দিন। সকলে মিলে বাংলাকে সব বন্ধন থেকে মুক্তি দেব।’’ শেষ দিনের প্রচারে বেরিয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রত্যয়ী সুরে জানান, এ বার রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসছেই। সুতরাং ভোটের ফলপ্রকাশের দিন তাঁকে আবার পশ্চিমবঙ্গে আসতে হবে। তাঁর কথায়, ‘‘এই ভোটে আমার এটিই শেষ সভা। বাংলায় যেখানে যেখানে গিয়েছি, মানুষের মধ্যে যে উন্মাদনা দেখেছি, তাতে এই বিশ্বাস নিয়ে যাচ্ছি যে, আগামী ৪ মে-র পরে বিজেপির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে আসতেই হবে।’’
শেষ দফা ভোটের জন্য পশ্চিমবঙ্গে মোট ন’টি জনসভা করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
মমতার বদলা
এ বার নির্বাচনী স্লোগানে খানিক বদল এনেছেন তৃণমূলনেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২১ সালে বলেছিলেন, ‘খেলা হবে।’ সেটি আরও এক ধাপ বেড়ে হয়েছে, ‘দুরন্ত খেলা হবে।’ ২০১১ সালে মমতার স্লোগান ছিল ‘বদলা নয়, বদল চাই’। অর্থাৎ হিংসার পাল্টা হিংসা নয়, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবেন রাজ্যে। এ বার মমতা জানাচ্ছেন, বদল নয়, বদলা প্রয়োজন— বাংলাকে খাটো করার বদলা। বাংলাভাষীদের ভিন্রাজ্যে হেনস্থার বদলা। মমতার অভিযোগ, বিজেপির কথায় কাজ করছে নির্বাচন কমিশন। আবার তাদের কথা মতো রাজ্যের পুলিশের একাংশও শাসকদলের বিরুদ্ধে কাজ করছে। ভোটের ফলপ্রকাশের পর সেই পুলিশকর্তাদের ‘মনে রাখা হবে’ বলে ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে মমতা নিশ্চিত, এ বার আরও বড় ব্যবধানে জয়ী হয়ে চতুর্থ বার রাজ্যে ফুল ফোটাবে তৃণমূল। শেষ দফা ভোটের শেষ দিনের প্রচারে মমতা কোনও সভা করেননি। মোট তিনটি পদযাত্রা করেছেন তিনি— দক্ষিণ কলকাতার সুকান্ত সেতু থেকে ঢাকুরিয়া, গোলপার্ক থেকে গড়িয়াহাট এবং হাজরা থেকে গোপালনগর মোড়।
দ্বিতীয় দফা ভোটের আগে মমতা ৬০টি নির্বাচনী সভা করেছেন।
শাহি-সমাধান
প্রত্যেকটি জনসভা থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তৃণমূলের ‘গুন্ডা’দের একটিই ‘দাওয়াই’ দিয়েছেন— ৪ মে-র পর উল্টো করে সোজা করবেন। প্রতিটি প্রচারসভা থেকে তিনি হুঙ্কার দিয়েছেন, ২৯ এপ্রিল, শেষ দফার ভোটে তৃণমূলের কোনও নেতা যদি বিজেপির কর্মী তথা সাধারণ ভোটারদের ভয় দেখাতে যান ৫ মে-এর পরে তাদের উল্টো করে ‘সিধা’ করা হবে। সোমবার প্রচারের শেষ দিনে শাহের কর্মসূচি শুরু হয়েছিল দক্ষিণ ২৪ পরগনার বেহালা পশ্চিম কেন্দ্র থেকে। বিজেপি প্রার্থী ইন্দ্রনীল খাঁয়ের সমর্থনে ‘রোড শো’ করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ওই কেন্দ্রে ইন্দ্রনীলের প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূলের রত্না চট্টোপাধ্যায় এবং সিপিএমের নীহার ভক্ত। তার পর শাহ চলে যান হুগলির চন্দননগরে। তার আগে কপিল মুনির মন্দিরে পুজো দেন শাহ। তাঁর গঙ্গাসাগর সফরে উপস্থিত ছিলেন সাগর বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী সুমন্ত মণ্ডল। বিজেপি প্রার্থী দীপাঞ্জন গুহের সমর্থনে শেষ দফার শেষ প্রচারে বাগবাজার থেকে লক্ষ্মীগঞ্জ বাজার পর্যন্ত ‘রোড শো’ করেন। সংক্ষিপ্ত ভাষণে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে তৃণমূলকে আক্রমণ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘ভোট শেষে সাত দিন বাংলায় সিআরপিএফ। সংবাদমাধ্যম থেকে জানতে পারছি, হিংসা হতে পারে। তবে আপনারা চিন্তা করবেন না। এ বার কোনও হিংসার ঘটনা ঘটবে না।’’
দ্বিতীয় দফায় শাহ মোট ১০টি সভা করেছেন পশ্চিমবঙ্গে।
কপিলমুনির আশ্রমে অমিত শাহ। —নিজস্ব চিত্র।
অভিষেক-ডিজে
‘দিদি’ বলেছেন, বদলা হবে। তাঁর দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা, মমতার ভ্রাতুষ্পুত্র অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, এ বার ভোটশেষে রবীন্দ্র সঙ্গীতের সঙ্গে ডিজে-ও বাজবে। প্রথম দফার মতো দ্বিতীয় দফার ভোটপ্রচারেও অভিষেকের মুখে বার বার শোনা গিয়েছে অমিত শাহের উদ্দেশে চ্যালেঞ্জ। যেমন শাহ-ও ‘ভাইপো’কে নিশানা করেছেন প্রতিটি সভায়। তবে প্রচারের শেষ দিনে গোঘাটে আরামবাগের তৃণমূল সাংসদ মিতালি বাগের উপর হামলায় ক্রুদ্ধ অভিষেক বলেছেন, ‘‘আমি জানি হামলার সঙ্গে কারা যুক্ত। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বেছে বেছে বার করব। আরামবাগে তৃণমূল হারুক বা জিতুক, ৪ তারিখের পর সব হিসাব হবে।” তিনি আরও বলেন, “আমার নজর সবার উপরে আছে। যাঁরা ভাবছেন, মিতালির উপর কারা হামলা করেছে, আমরা জানি না, তাঁরা ভুল ভাবছেন। সোমাশ্রী, সোমাশ্রীর স্বামী, সৌমেন পাল, দোলন— এই চার জন প্রাথমিক ভাবে যুক্ত, আরও যাঁরা যুক্ত তাঁদের সিসি ক্যামেরা দেখে বেছে বেছে বার করব।” বস্তুত, সভাস্থলে পৌঁছোনোর আগেই আক্রান্ত সাংসদকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিষেক বলেন, ‘‘হাসপাতালে মিতালির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, জিজ্ঞাসা করেছি। কিন্তু ওঁর অবস্থা এতটাই খারাপ, কিছু বলতে পারছে না।’’ সোমবার অভিষেকের চারটি নির্বাচনী কর্মসূচি ছিল। বাটা মোড় থেকে টয়োটা শোরুম পর্যন্ত রোড শো, আরামবাগের পল্লিশ্রী মোড়ে সমাবেশ, ধনিয়াখালি এবং হরিণঘাটা দলীয় প্রার্থীদের সমর্থনে জনসভা করেন।
শেষ দফায় মোট ৪১টি সভা করলেন তিনি।
বুলডোজ়ার যোগী
পশ্চিমবঙ্গে তিনি যতগুলি নির্বাচনী প্রচার করেছেন, প্রায় প্রতিটিতেই দেখা গিয়েছে একটি সুসজ্জিত বুলডোজ়ার। আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে এটিই সুশাসনের প্রতীক। সেই ‘যোগী’ও ছিলেন দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে শেষ প্রচারে। সোমবার তারকেশ্বর বিধানসভার বিজেপি প্রার্থী সন্তু পানকে সঙ্গে নিয়ে তারকনাথ মন্দিরে পুজো দেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। সেখান থেকে চলে যান ধনেখালিতে। ওই বিধানসভার বিজেপি প্রার্থী বর্ণালী দাসের সমর্থনে মঞ্চ সভায় আদিত্যনাথের বার্তা, ‘‘তৃণমূলের গুন্ডাদের শায়েস্তা করার সময় এসে গিয়েছে। যারা বিজেপিকে মারধর করেছে, ব্যবসায়ীদের থেকে তোলা নিয়েছে, এ বার তারা বুঝতে পারবে ফল! সবাই একজোট হোন। সোনার বাংলা তৈরি করতে হবে।’’ তিনি জানান, পশ্চিমবঙ্গে ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’ প্রতিষ্ঠা হলে তারকেশ্বরের মন্দিরেও থাকবে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের মতো প্রবেশদ্বার। উন্নতি হবে সর্বস্তরে।
শেষ দফা ভোটের দু’দিন থেকে বিক্ষিপ্ত অশান্তির ঘটনা ঘটেছে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায়। উত্তর ২৪ পরগনার জগদ্দল, হুগলির গোঘাট, পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলি, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়— প্রত্যেক জায়গায় দুই দলের বেশ কয়েক জন কর্মী জখম হয়েছেন। ঘটনাগুলির দিকে নজর রেখেছে কমিশন। ইতিমধ্যে বেশ কয়েক জন গ্রেফতারও হয়েছেন। প্রথম দফার ভোট বেশ নির্বিঘ্নেই মিটেছে। দ্বিতীয় দফার ভোট অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ ভাবে শেষ করাই এখন লক্ষ কমিশনের।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার প্রতিযুক্তিও ছিল। তৃণমূলের তরফে গত লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটের উদাহরণ দিয়ে দাবি করা হচ্ছিল, অনেক ভোট পড়লেও এ রাজ্যে তা শাসকের পক্ষেই গিয়েছে বরাবর। বিজেপির পাল্টা যুক্তিতে আবার ছিল ২০১১ সালের ‘পরিবর্তনের ভোট’। সে বারও প্রচুর ভোট পড়েছিল এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার গড়েছিলেন মমতা। এ বারের ভোটে এসআইআর সুবিধা করে দিল বিজেপির।
- ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) যে হয়রানিকে প্রচারে হাতিয়ার করেছিল তৃণমূল, তা কাজে এল না। পশ্চিমবঙ্গবাসী ভোট দিলেন বিজেপির পক্ষেই। ফলে এ রাজ্যেও ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার তৈরি হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ জয় করেছে বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনেও যে দল সে ভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি, দু’বছরের ব্যবধানে তারাই ২০০-র গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে। জেলায় জেলায় পদ্মের ঝড়ে উড়ে গিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থীরা।
-
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভেঙে দিলেন রাজ্যপাল আরএন রবি, ইস্তফা না-দিলেও মমতা এখন ‘প্রাক্তন’ মুখ্যমন্ত্রী! রাজ্য কার?
-
বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী মোদী! রাজ্যে প্রচারে এসে দিয়ে গিয়েছিলেন কথা
-
ভোট-পরবর্তী গোলমালে রুজু ২০০ এফআইআর! কেউ কেউ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অশান্তি পাকাতে চাইছেন: ডিজি সিদ্ধনাথ
-
‘কমিশন ১০টি গণনাকেন্দ্রের ছয় ঘণ্টার ফুটেজ দিক, দেখাক কিছু হয়নি, আমি মেনে নেব এটাই জনাদেশ’! চ্যালেঞ্জ অভিষেকের
-
৪৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে রাজ্যে ২০৭টি আসনে জয় পেল বিজেপি! ৮০টি আসনে জয়ী তৃণমূল, তাদের ভোটের হার কত