Advertisement

নবান্ন অভিযান

পরিচিত ছক ভেঙে ভোটের দিন সকাল থেকেই রাস্তায় মমতা! বুথে বুথে ঘোরার পর কালীঘাটে পুজো, ভিন্ন রণকৌশল নেত্রীর

মমতাকে ভোটের সকাল থেকে যে ভাবে দেখা গেল, সে ভাবে গত দেড় দশকে দেখা যায়নি। ভোটগ্রহণ শুরুর এক ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই পৌঁছে গেলেন চেতলায়। বুথে বুথে ঘুরলেন। দিনের শেষে কালীঘাটে গেলেন পুজো দেওয়ার জন্যও।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ২০:১৭
বুধবার দ্বিতীয় দফার ভোটের দিন নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

বুধবার দ্বিতীয় দফার ভোটের দিন নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: পিটিআই।

শেষ কবে তাঁকে ভোটের দিন এত সকালে রাস্তায় দেখা গিয়েছিল? কেউ মনে করতে পারছেন না। ভোট-প্রবীণেরা বলছেন, ১৯৮৯ সালে। যখন তিনি যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রে দ্বিতীয়বার লড়েছিলেন। তারও আগে ১৯৮৪ সালে। যখন ভোট ময়দানে আনকোরা এক মেয়ে প্রথমবার লড়তে নেমেছিলেন লব্ধপ্রতিষ্ঠ রাজনীতিক সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে।

সোমনাথকে হারিয়েই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৯৮৪ সালের সেই ভোটের দিন তিনি সাতসকালে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিলেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দলের (কংগ্রেস) দেওয়া একটি জিপে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বেড়িয়েছিলেন তিনি। স্বল্পদূরত্বে গিয়েছিলেন কংগ্রেসকর্মীদের স্কুটারে চেপে। তখন মোবাইল ফোনের জমানা নয়। ফলে দ্রুত খবর পেয়ে অকুস্থলে পৌঁছে যাওয়ার সুযোগও ছিল না। কিন্তু মমতা ভোটের আগে পরিকল্পনা করে সময় ধরে এলাকাবিন্যাস করে নিয়েছিলেন। ভোটের দিন সকাল থেকে বিকেল সেইমতোই ছুটে বেড়িয়েছিলেন।

যেমন বেরিয়েছিলেন তার পাঁচবছর পরেও। যখন তিনি মালিনী ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে লড়ছেন। সেই ভোটে অবশ্য তাঁকে যাদবপুরে হারতে হয়েছিল। তার পরের লোকসভা ভোট থেকে মমতার কেন্দ্র হয়ে যায় দক্ষিণ কলকাতা। তখন থেকে এই বিধানসভা ভোট পর্যন্ত মমতার রুটিন ছিল, ভোটের দিন বিকাল পর্যন্ত বাড়িতেই থাকবেন এবং সারাদিন ভোটের তদারকি করবেন। বুধবার তার ব্যতিক্রম ঘটল!

সকাল ৮টা নাগাদ মমতার সাদা এসইউভি যখন চেতলায় ঢুকে পড়ল, তখন চারদিকে বিস্ময়! প্রাথমিক ঘোরটুকু কাটতেই কলরব শুরু হল, ‘‘দিদি এসেছে! দিদি এসেছে!’’ মমতা গিয়েছিলেন ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে দেখা করতে। কারণ, তিনি শুনেছিলেন আগের রাতে ফিরহাদের চেতলার বাড়িতে গিয়েছিল কেন্দ্রীয় বাহিনী। মন্ত্রিসভার সদস্য ফিরহাদের সঙ্গে কথা বলে মমতা চলে যান চক্রবেড়িয়ায়। যেখানে বিজেপির সঙ্গে মাইক-সংঘাতে তিনি মঞ্চ ছেড়ে চলে এসেছিলেন। সেখানে গিয়ে বুথের বাইরে একটি চেয়ার পেতে বসে পড়েন রাজ্যের পরপর তিনটি মেয়াদের মুখ্যমন্ত্রী তথা ভবানীপুরের তৃণমূলপ্রার্থী। চক্রবেড়িয়া পৌঁছনোর আগে পদ্মপুকুর রোড ধরে এগিয়ে যেতে যেতে মমতা দাঁড়িয়ে পড়েন একটি বুথের সামনে। গাড়ি থেকে নেমে সেটি পরিদর্শন করেন। ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর অসীম বসুকে বাড়ি থেকে বেরোতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। ঘটনাচক্রে, অসীমের ওয়ার্ডেই চক্রবেড়িয়া। দলীয় কাউন্সিলরকে বাড়িতে ‘আটকে রাখা’র অভিযোগ পেয়েই সেখানে গিয়েছিলেন মমতা। বুথের বাইরে বেশ কিছু ক্ষণ বসে থাকার পর তিনি কথা বলেন দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে। তার পরে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমি চাই, আমাদের দলও চায়, ভোটটা শান্তিতে হোক। মানুষের অধিকার প্রয়োগ করতে দেওয়া হোক। কিন্তু বিভিন্ন জায়গা থেকে কতগুলো অবজার্ভার (পর্যবেক্ষক) নিয়ে আসা হয়েছে। অনেক পুলিশ অফিসার নিয়ে আসা হয়েছে। যারা বাংলাকে বোঝে না।’’ মমতা বলেন, ‘‘গতরাতে অত্যাচার করেছে সারা বাংলা জুড়ে। পর্যবেক্ষকেরা থানায় গিয়ে গিয়ে চাপ সৃষ্টি করছেন। শুধু আমাদের দলকে নিশানা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, সব তৃণমূলের এজেন্টকে গ্রেফতার করো! আমার দলের যুব সভাপতিকে সকালেই গ্রেফতার করেছিল। পরে ববি (ফিরহাদ) গিয়ে ছাড়িয়ে আনে।’’

ততক্ষণে চারদিকে বিস্ময়ের ঢেউ উঠেছে। কেন মমতা সাতসকালে বুথে-বুথে ঘুরতে শুরু করলেন, তা নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্বও ঘোরাফেরা করতে শুরু করেছে। অনেকে বলছেন, এটাই মমতার ‘মাস্টারস্ট্রোক’। তিনি স্বয়ং ময়দানে থেকে প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছেন। পাশাপাশি, দলের কর্মী-সমর্থকদেরও উজ্জীবিত করতে পেরেছেন। আবার অনেকে বলছেন, মমতা ‘চাপে’ পড়েছেন বলেই সকাল সকাল তাঁকে রাস্তায় বেরোতে হয়েছে। সেই অংশের মধ্যে পড়েন বিরোধী দলনেতা তথা ভবানীপুরে মমতার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী শুভেন্দু অধিকারীও। তাঁর কথায়, ‘‘ঠেলায় না-পড়লে বিড়াল গাছে ওঠে না।’’

গত প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে ভোটের (বিধানসভা হোক বা লোকসভা) দিন মমতার রুটিন বদলায়নি। তিনি সারাদিন বাড়িতেই থাকবেন। দলীয় স্তরে ফোন করে খওঁজ নেবেন কোথায় কেমন ভোট হচ্ছে। বিকালের দিকে যাবেন মিত্র ইনস্টিটিউশনের বুথে ভোট দিতে। সেখান থেকে হয় তিনি বাড়ি ফিরে আসবেন অথবা কোথাও গোলমাল হচ্ছে খবর পেলে সেখানে যাবেন।

যেমন ১৯৯৮ সালে তৃণমূল তৈরি হওয়ার পরের বছর, ১৯৯৯ সালে দক্ষিণ কলকাতা লোকসভার প্রার্থী মমতা ভবানীপুরে একটি বস্তি এলাকা থেকে খবর পেয়েছিলেন, সিপিএমের লোকজন গোলমাল করছে। সেখানে পৌঁছে রাস্তায় বেঞ্চ পেতে বসে পড়েছিলেন তিনি। ২০০১ সালের বিধানসভা ভোটের দিন মেদিনীপুর জেলায় ভোট তদারকি করতে মেদিনীপুর শহরে ছিলেন মমতা। সে কারণে নিজের ভোট দিতে পারেননি তিনি। ২০০৪ সালের নির্বাচনে সিপিএম বুথ জ্যাম করছে অভিযোগ শুনে কসবায় চলে গিয়েছিলেন মমতা। সেখানেও বহুক্ষণ ঠায় বসেছিলেন রাস্তায় বেঞ্চ পেতে। কিন্তু তার পর থেকে মমতাকে ভোটের দিন ভোট দেওয়া ছাড়া রাস্তায় বেরিয়ে বুথে বুথে ঘুরতে দেখা যায়নি।

দিনের শেষে আত্মবিশ্বাসী মমতা জানিয়ে দিয়েছেন, দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেই তৃণমূল। তিনি যে এখনও ‘চেয়ারে’ আছেন, স্মরণ করিয়ে দেন তা-ও। দিনের শেষে ‘ভিক্ট্রি’ চিহ্নও দেখালেন। অনেকের মতে, সকাল সকাল বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়া তাঁর নির্বাচনী কৌশলেরই অংশ। এর মধ্য দিয়ে দলের নীচুতলার কর্মীদের ভোটের সকাল থেকে চাঙ্গা করে দিলেন নেত্রী।

ভবানীপুরে এ বারের নির্বাচন গত নির্বাচনগুলির চেয়ে আলাদা। মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে ভোট ময়দানে নেমেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু। পাঁচ বছর আগে নন্দীগ্রামে যে দ্বৈরথ শুরু হয়েছিল, এ বার ভবানীপুর তার দ্বিতীয় পর্ব বলেও অনেকের বক্তব্য। ফলে ভবানীপুর নিয়ে রাজ্য তো বটেই, গোটা দেশেরও কৌতূহল রয়েছে। প্রসঙ্গত, এসআইআর পর্বে ভবানীপুরের ভোটার তালিকা থেকে ৫০ হাজারেরও বেশি নাম বাদ গিয়েছে। ওই কেন্দ্রের অন্তর্গত আটটি ওয়ার্ডের জনবিন্যাসেও বৈচিত্র্য রয়েছে। এই কেন্দ্রে সংখ্যালঘু ভোটারের পাশাপাশি রয়েছেন অবাঙালি ভোটাররাও। ভোটারদের মধ্যে আর্থসামাজিক বিভাজনও এখানে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।

বিকালে ভোট দিতে গিয়ে অবশ্য মমতা জানিয়ে দেন, তাঁরা দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরছেন। দু’আঙুল তুলে ‘ভি’ অর্থাৎ ‘ভিক্ট্রি’ চিহ্নও দেখান তিনি। তবে পাশাপাশিই তিনি বলেন, অবাধ ভোটের নামে দিনভর ‘অত্যাচার’ চলেছে। তাঁর কথায়, ‘‘এটা কি অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন? জীবনে এমন দেখিনি! তা সত্ত্বেও বলছি, তৃণমূলই জিতবে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জিতব।’’ কলকাতার একাধিক থানার ওসির বিরুদ্ধেও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেন মমতা। নিজের বুথের দিকে দেখিয়ে বলেন, ‘‘দেখুন, এখানে শুধু কেন্দ্রীয় বাহিনী। কোথাও রাজ্য পুলিশ নেই। বাহিনী দখল করে রেখেছে! ওদের উচিত সীমান্তে সুরক্ষা দেওয়া। দুঃখিত, আমি জীবনে এমন ভোট দেখিনি। আমার পাড়ায় ঢুকে মেয়েদের মেরেছে। অনেক জায়গায় এজেন্ট, প্রার্থীদের বার করে দেওয়া হচ্ছে।’’

ভোট দেওয়ার পরে কালীঘাট মন্দিরে পুজো দিতে গিয়েছিলেন মমতা। ঘটনাচক্রে, এই প্রথম বার! ভোটের দিন এর আগে তাঁকে কখনও কালীঘাটে পুজো দিতে দেখা যায়নি। যেমন গত সাড়ে তিন দশকে তাঁকে দেখা যায়নি সকালেই ভোটের ময়দানে বেরিয়ে পড়তে।

সংক্ষেপে
  • রবিবার মধ্যরাত থেকে শুরু হয়েছিল। রাজ্যের বেশ কয়েক জন আমলা এবং পুলিশ আধিকারিককে তাঁদের পদ থেকে অপসারণ করে নির্বাচন কমিশন। বুধবার রাত পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। সেই সব পদে নতুন আধিকারিকও নিয়োগ করে দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, কমিশন স্পষ্ট জানায়, যাঁদের অপসারণ করা হচ্ছে, তাঁদের এ রাজ্যে নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও কাজে আপাতত আর নিয়োগ করা যাবে না!
  • পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ক্ষেত্রে কমিশনের এই ‘সক্রিয়তা’ নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছে শাসকদল তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ ভাবে অপসারণের পদক্ষেপে অসন্তোষ প্রকাশ করে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠিও লেখেন। চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্য সরকারের সঙ্গে আগাম কোনও আলোচনা না-করে বা কোনও মতামত না-নিয়ে বদলি করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, অতীতে নির্বাচন চলাকালীন কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা আধিকারিককে সরানোর প্রয়োজন হলে কমিশনের পক্ষ থেকে সাধারণত রাজ্য সরকারের কাছে তিন জনের একটি প্যানেল চাওয়া হত। সেই তালিকা থেকে কমিশন নিজেই এক জনকে বেছে নিত। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, এ বার সেই প্রচলিত রীতির সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ঘটেছে। প্রার্থিতালিকা ঘোষণার আগেও কমিশনকে এ বিষয়ে তোপ দাগেন মমতা। নিশানা করেন কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকেও।
সর্বশেষ
১৭ মিনিট আগে
Mamata Banerjee TMC BJP West Bengal Politics Suvendu Adhikari Bhabani
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy