Advertisement
E-Paper

মুড়ি খেল ভোটাররা, ভোট দিয়ে গেল ভূতে

ভোট শেষ হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সাড়ে তিন শতাংশ বেড়ে গেল ভোটদানের হার। কী করে এটা সম্ভব হল তা নিয়ে তদন্তের দাবি করে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছে বিরোধী দলগুলি। ব্যাপক হারে ভোট বেড়ে যাওয়ায় ভুতুড়ে ভোটারের ‘হাত’ দেখছে প্রায় সবাই। আমরা কিন্তু আগেই ভুতুড়ে ভোটারের অস্তিত্ব নিয়ে আশঙ্কা করেছিলাম। ভোটের দিন জঙ্গলমহলের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে আমাদের প্রতিনিধিরা দিয়েছিল এমনই তথ্য। তারই একটা প্রতিবেদন আমরা তুলে ধরলাম।

কিংশুক গুপ্ত ও দেবমাল্য বাগচী

শেষ আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০১৬ ০১:২২

ভোট শেষ হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সাড়ে তিন শতাংশ বেড়ে গেল ভোটদানের হার। কী করে এটা সম্ভব হল তা নিয়ে তদন্তের দাবি করে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছে বিরোধী দলগুলি। ব্যাপক হারে ভোট বেড়ে যাওয়ায় ভুতুড়ে ভোটারের ‘হাত’ দেখছে প্রায় সবাই। আমরা কিন্তু আগেই ভুতুড়ে ভোটারের অস্তিত্ব নিয়ে আশঙ্কা করেছিলাম। ভোটের দিন জঙ্গলমহলের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে আমাদের প্রতিনিধিরা দিয়েছিল এমনই তথ্য। তারই একটা প্রতিবেদন আমরা তুলে ধরলাম।

পলিব্যাগের ভিতর ঠাসা রয়েছে জুঁইফুলের মতো সাদা মুড়ি। সঙ্গে ছোলা সেদ্ধ, আধ ফালি পেঁয়াজ আর কাঁচা লঙ্কা। কোথাও আবার এ সবের সঙ্গে উপরি পাওনা গোটা কয়েক ফুলুরি। সঙ্গে শিশু থাকলে তার জন্য বরাদ্দ একটা লাড্ডু। সোমবার বিনপুর বিধানসভার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ফিরে দেখা গেল, ভোটারদের জন্য এমনই আয়োজন তৃণমূল কর্মীদের।

বেলপাহাড়ির বুড়িঝোর প্রাথমিক বিদ্যালয় বুথের কাছেই বিষ্ণুপদ সিংহের মাটির বাড়ি। খাটিয়া পেতে ভোটারদের আপ্যায়ণে ব্যস্ত ছিলেন কয়েকজন মহিলা। আপনারা কি তৃণমূল করেন? প্যাকেট বিলোনোর ফাঁকে শুশনিজবি গ্রামের দামিনী সিংহ বলেন, “হ্যাঁ, ওই আর কি। সব ভোটারকে নাস্তা বিলি করছি।” বুড়িঝোর স্কুলের এই বুথের মোট ভোটার ৯৯৪। সকাল ৯ টার মধ্যেই সাড়ে তিনশো ভোটারের ভোট দেওয়া হয়ে গিয়েছে। দামিনীদেবী বললেন, বিকেল চারটে পর্যন্ত যতজন ভোট দেবেন, সবাইকেই সেবা দেওয়া হবে।

গোপীবল্লভপুরের খারবাঁধি গ্রাম পঞ্চায়েতের নিশ্চিন্তা গ্রামেও দেখা গেল একই ছবি। বুথের ৫০ মিটারের মধ্যে তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্য নাড়ুগোপাল মাণ্ডির উপস্থিতিতে ভোটারদের মুড়ি-চানাচুর দেওয়া হচ্ছে। ভোটারদের মুড়ি বিলি প্রসঙ্গে নাড়ুগোপালবাবু বলছেন, “আমরা সকলকে খুশি করতেই মুড়ি বিলি করছি।” নাড়ুগোপালবাবুর পাশেই বসেছিলেন স্থানীয় তৃণমূল নেতা অশ্বিনী মাহাতো। একসময় মাওবাদী স্কোয়াডে নাম লিখিয়েছিলেন তিনি। পরে অবশ্য স্বাভাবিক জীবনে ফেরেন।

ভোটারদের মুড়ি বিলি করছেন কেন? অশ্বিনীবাবু বলছেন, “গ্রামের সবাই আগে মাওবাদীদের সমর্থন করত। আমিও ঝাড়গ্রামে মাওবাদীদের হয়ে কাজ করেছি। পরিবর্তনের পর আমরা তৃণমূল করছি। কিন্তু এখনও যাঁরা অন্য দল করছে তাঁদের চিনে নিতেই এই মুড়ি বিলি।’’ কী ভাবে? তিনি বলেন, ‘‘আসলে এই ক্যাম্পে এসে যাঁরা মুড়ি না নিয়ে ফিরে যাচ্ছে তাঁরাই বিরোধী। তাঁদের চিনে রাখছি। পরে ওঁদের বুঝিয়ে দেব।”

এই মুড়ি দিয়েই কি সন্ত্রাসের চোরা স্রোত বইছে জঙ্গলমহলে?

তা না হলে কেনই বা ফাঁকা লাইন, বুথে দেখা নেই ভোটারদের, অথচ দুপুর সাড়ে ১২টার মধ্যে ৪৭৬টির মধ্যে পড়ে গেল ৩৬০টি ভোট?

পশ্চিম মেদিনীপুরের বিনপুরে ভীমার্জুন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওই বুথে মোট ভোটারের সংখ্যা ৪৭৬। পাটি গণিতের হিসেব কষলে দেখা যাবে দুপুর গড়ানোর আগেই ৭৫ শতাংশ ভোট হয়ে গিয়েছে! ভোটের এই হারে চোখ কপালে উঠেছে বিরোধীদের!

শতাংশের হিসেবে ভোটের এই পরিসংখ্যান খুব একটা স্বস্তিতে রাখছে না বিরোধীদের। ফাঁকা বুথে ভোটকর্মীদের সামনে তবে কি ভোট দিয়ে গেল ভূতে? ভোটের দিনেও সরব হয়ে উঠল প্রশ্নটা।

নির্বাচন কমিশনের হিসেব, বেলা ৩টে পর্যন্ত গড়ে তিন জেলায় ৭৫.২৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। এর মধ্যে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৮০.৪৪ শতাংশ। অথচ এই জেলার জঙ্গলমহলে বেশির ভাগ বুথেই বিরোধীদের দেখা যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়নি ভোটারদেরও। তবে তাতে ভোট দানের শতাংশের হিসেবে যদিও কোনও প্রভাব পড়েনি। পাশাপাশি, পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে যথাক্রমে ৭৯.৪৮ ও ৭৮.৮৩ শতাংশ।

বিনপুরের এড়গোদা অঞ্চলের কয়েকটি গ্রামে তৃণমূলকে ভোটদানের বিনিময়ে মাংস বিলি হয়েছে বলেও জানা গিয়েছে। জামবনি ব্লকের গ্রামে ভোটের এক দিন আগে মাংস-ভাতের দেদার আসর বসেছিল। বেলপাহাড়ির ধবাকাচা, কাঁকড়াঝোর, ওড়লির মতো গ্রামের তৃণমূল কর্মীরা রাখ ঢাক না করেই জানিয়েছেন, এলাকার শান্তি ধরে রাখার জন্য সব ভোট তৃণমূলের হওয়াটা জরুরি।

অথচ এ সব দেখার প্রাথমিক দায়িত্ব যাদের, সেই কেন্দ্রীয় বাহিনী যদিও কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথের ভূমিকায় ছিল। বুথের ভেতর-বাইরের দায়িত্ব তাদের হাতে থাকলেও, এ দিন বুথের কয়েক পা দূরের বিষয়ে তারা নাক পর্যন্ত গলায়নি। বুথে তারা এমন ভাবেই সক্রিয় ছিল যে, নির্বাচন কমিশনের অনুমতিপত্র থাকা সত্ত্বেও সংবাদ মাধ্যমের কর্মীদের অনেক জায়গায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আমলাশোলের মতো জায়গাতেও ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার ছবি তুলতে বাধা দেওয়া হয়েছে। পরে জেলার পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপে কমিশনের সচিত্র পরিচয়পত্র দেখে ছবি তুলতে দেওয়া হয়।

সোমবার ভোট দেওয়ার পরে মুড়ির প্যাকেট নিয়ে হনহন করে পাহাড়ি রাস্তা উজিয়ে ফিরছিলেন বৃদ্ধা রসনি সিংহ ও গঙ্গামণি সিংহ। তাঁরা বলেন, “কাল রাতে মাংস-ভাত-হাঁড়িয়ার আসরে আমাদের যাওয়া হয়নি। দিদি-র দলের লোকেরা আমাদের একশো টাকা করে দিয়েছেন। বাড়তি আরও এক প্যাকেট করে মুড়ি পেয়েছি।”

মুড়ি খেয়ে আঁচিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে ঠাকুরদাস সিংহ, কুনারাম মাণ্ডিরা বললেন, “গত রাতে মাংস-ভাত খেয়ে সকলেই খুশি। সকালে আবার ভোট দেওয়ার আগে এমন যত্নআত্তি আগে কেউ কখনও করেনি।” কেন, সিপিএমের জমানাতেও তো ভোটারদের মাংস-ভাত খাওয়ানোর অভিযোগ উঠত। কুনারামদের কথায়, “ওরা তো কেবল নিজেদের দলের লোকেদেরই খাওয়াতো। আর তৃণমূল কোনও বাছ বিচার করছে না।” এ দিন ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার পথে বেশ কিছু ভোটারের হাতে টাকা গুঁজে দিতে দেখা যায় তৃণমূল কর্মীদের।। কেন্দ্রীয় বাহিনী নির্বাক দর্শক।

শিমুলপালের এক তৃণমূল নেতা বলেন, “বিরোধীরা শক্তিশালী হলেই ফের মাওবাদীরা এলাকায় জমি তৈরির সুযোগ পাবে। তাই ভোটারদের কাছে পাওয়ার জন্য ভালবাসা- সেবা দিচ্ছি। কোনও হুমকি-চাপ দিচ্ছি না।”

তৃণমূলের বেলপাহাড়ি ব্লক সভাপতি বংশীবদন মাহাতো অবশ্য এতে দোষের কিছু দেখছেন না। তিনি বলেন, “দূর দূরান্তের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ভোট দিতে এসে মানুষজন লাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করেন। খিদে পাওয়াটা স্বাভাবিক। তাঁদের জন্য একটু মুড়ি-ছোলার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এটা তো অনেক দিনের রীতি। সিপিএমও তো এমন করে থাকে। তবে কাউকেই প্রভাবিত করা হয়নি। কাউকে টাকাও দেওয়া হয়নি। এ সবই বিরোধীদের মিথ্য অপপ্রচার।”

বিরোধীদের অভিযোগ, পাহাড়, জঙ্গলে ঘেরা ঝাড়খণ্ড রাজ্যের সীমানাবর্তী বেলপাহাড়ির এই প্রত্যন্ত জনপদগুলিতে খেটে খাওয়া গরিব আদিবাসী মানুষজনের বাস। মানুষগুলিকে টাকা দিয়ে, মদ-মাংস খাইয়ে ভোট কিনেছে তৃণমূল। এও এক ধরণের ভোট লুঠ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিরোধী নেতা বললেন, ‘‘একে বলে, মুড়ি দিয়ে যায় চেনা।’’

আরও পড়ুন
প্রথম দফার ভোট বাড়ল সাড়ে তিন শতাংশ, ভূতের উপদ্রব?

assembly election 2016 rigging Massive rigging polling booth Midnapore
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy