তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে শনিবার ৩৫ পাতার ‘চার্জশিট’ প্রকাশ করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ঠিক তার কয়েক ঘণ্টা পরে বিজেপির বিরুদ্ধে পাল্টা ‘চার্জশিট’ পেশ করল পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল। সেই ‘চার্জশিটে’ ১৩টি বিষয় তুলে ধরেছে তারা। জবাব চেয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহের কাছে। একই সঙ্গে সুর চড়িয়েছে শাহের ‘চার্জশিট’ নিয়েও। তৃণমূলের বক্তব্য, ‘বাঙালিদের অপরাধীর তকমা দিয়েছেন শাহ। চার্জশিট দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মানুষের বিরুদ্ধে।’ তৃণমূল তাদের চার্জশিটে মণিপুর, পহেলগাঁওয়ের ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে। তুলেছে দেশের বেকারত্বের পরিসংখ্যানও।
তৃণমূলের তরফে রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু এবং দুই সাংসদ মহুয়া মৈত্র ও কীর্তি আজ়াদ সাংবাদিক বৈঠক করে ‘চার্জশিট’ পেশ করেন। একই সঙ্গে সাংবাদিক বৈঠকে শাহ যে যে প্রশ্ন তুলেছেন, তা খণ্ডন করেছেন। তৃণমূলের প্রশ্ন, ‘উনি বাংলায় এসে নারী নির্যাতনের কথা বলছেন। উন্নাও-হাথরস নিয়ে চুপ কেন? মণিপুরে নারী সুরক্ষা কোথায়?’ শাহ বার বার অনুপ্রবেশকারী প্রশ্নে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদলকে আক্রমণ করেছেন। পাল্টা জবাবে তৃণমূলের দাবি, ‘সীমান্তের দায়িত্ব কার? বিএসএফ কার দায়িত্বে?’ তৃণমূল জানতে চায়, ‘এসআইআর করে কত জন বাংলাদেশিকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তার হিসাব দেওয়া হোক।’ তার পরেই তৃণমূল বিজেপির বিরুদ্ধে ‘চার্জশিট’ পেশ করে।
দুর্নীতি
তৃণমূলের অভিযোগ, দুর্নীতিতে যুক্ত নেতাদের দলে নেয় বিজেপি। দেওয়া হয় ‘ক্লিনচিট’ও। ২৩টি দুর্নীতিতে অভিযুক্ত নেতারা বিজেপিতে গিয়েছেন। শুভেন্দু অধিকারী, হিমন্ত বিশ্বশর্মা, অজিত পওয়ার, ছগন ভুজবল, নবীন জিন্দলের মতো নেতাদের নাম নিয়ে অভিযোগ তোলে তৃণমূল।
মণিপুর-পহেলগাঁও-দিল্লি বিস্ফোরণ
মণিপুরে হিংসার ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অভিযোগ তৃণমূলের। একই সঙ্গে প্রশ্ন তারা তোলে, পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলায় ২৬ জনের মৃত্যুর দায় কে নেবে? প্রশ্ন তোলে রাজধানী দিল্লির সুরক্ষা নিয়েও। সেই প্রসঙ্গ বলতে গিয়ে গত বছরের দিল্লি-বিস্ফোরণের কথা বলেছে তৃণমূল।
অপরাধ
‘চার্জশিটে’ তৃণমূল দাবি করেছে, তফসিলি জাতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অপরাধ হয়েছে উত্তরপ্রদেশে। সর্বোচ্চ অপরাধের হার দিল্লিতে। নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রে শীর্ষে রাজস্থান। শিশু এবং তফসিলি জনজাতির বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রে শীর্ষে মধ্যপ্রদেশ। একই সঙ্গে তৃণমূল জানিয়েছে, ভারতের নিরাপদ শহর হিসাবে কলকাতা টানা চার বার দেশের মধ্যে শীর্ষে।
সিএএ, এনআরসি, এসআইআর
তৃণমূলের অভিযোগ, সিএএ-এনআরসি করে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার ছক কষেছে বিজেপি সরকার। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্যই এসআইআর করা হয়েছে, অভিযোগ তৃণমূলের।
বেকারত্ব
তৃণমূলের দাবি, ৪৫ বছরের মধ্যে বর্তমানে দেশে সর্বোচ্চ বেকারত্ব হয়েছে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১৭ লক্ষেরও বেশি মানুষ ভারতের নাগরিকত্ব ছেড়েছেন।
কৃষক-মৃত্যু
তৃণমূলের দাবি, ২০১৪ সাল থেকে ১০ লক্ষেরও বেশি কৃষক আত্মঘাতী হয়েছেন। শীর্ষে মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ। কৃষি আইনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেকের মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতাল পরিকাঠামো
তৃণমূলের অভিযোগ, হাসপাতালে অক্সিজেন নেই। কমিউনিটি হেল্থ সেন্টারগুলিতে ৬৮ শতাংশ বিশেষজ্ঞের পদ খালি। অভাব রয়েছে আধুনিক চিকিৎসার। অনেকেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা পাচ্ছেন না। অভাব রয়েছে চিকিৎসকেরও। পরিসংখ্যান তুলে তৃণমূলের দাবি, ১,২৬৩ জনের আধুনিক চিকিৎসা দেওয়ার জন্য এক জন মাত্র চিকিৎসক রয়েছেন!
শিক্ষা
তৃণমূলের দাবি, দেশের জি়ডিপির মাত্র ০.৪৪ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ করেছে বিজেপি। বিভিন্ন কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনেক পদ ফাঁকা রয়েছে বলেও অভিযোগ।
আরও পড়ুন:
মনীষীদের অপমানের অভিযোগ
বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রাজা রামমোহন রায়ের মতো মনীষীদের ‘অপমান’ করেছে বিজেপি— ‘চার্জশিটে’ দাবি তৃণমূলের। বিভিন্ন উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে।
চা-শ্রমিক
তৃণমূলের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ চা-শ্রমিকদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। উত্তরবঙ্গের চা-বাগানগুলিতে চা-শ্রমিকদের বকেয়া পিএফ দেয়নি কেন্দ্র।
বকেয়া টাকা
তৃণমূলের অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গ থেকে কর বাবদ সাড়ে ছয় লক্ষ কোটি টাকা নিয়ে গিয়েছে বিজেপি সরকার। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গকে পাওনা টাকা দেয়নি।
কয়লা কেলেঙ্কারি
তৃণমূল তাদের ‘চার্জশিটে’ শাহের সঙ্গে জয়দেব খান নামে এক ব্যবসায়ীর ছবি প্রকাশ করেছে। তৃণমূলের অভিযোগ ওই ব্যবসায়ী কয়লা কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত। তাঁকে বিজেপিতে যোগদান করানো হয়েছে।
নিশানায় মোদীর বিদেশ যাত্রা
তৃণমূল তাদের ‘চার্জশিটে’ প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর নিয়ে কটাক্ষ করেছে। লিঙ্গ বৈষম্য, অনাহার, সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধের মতো ক্ষেত্রে বিশ্বের মধ্যে ভারত কোথায় দাঁড়িয়ে তার পরিসংখ্যানও দিয়েছে তৃণমূল।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার প্রতিযুক্তিও ছিল। তৃণমূলের তরফে গত লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটের উদাহরণ দিয়ে দাবি করা হচ্ছিল, অনেক ভোট পড়লেও এ রাজ্যে তা শাসকের পক্ষেই গিয়েছে বরাবর। বিজেপির পাল্টা যুক্তিতে আবার ছিল ২০১১ সালের ‘পরিবর্তনের ভোট’। সে বারও প্রচুর ভোট পড়েছিল এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার গড়েছিলেন মমতা। এ বারের ভোটে এসআইআর সুবিধা করে দিল বিজেপির।
- ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) যে হয়রানিকে প্রচারে হাতিয়ার করেছিল তৃণমূল, তা কাজে এল না। পশ্চিমবঙ্গবাসী ভোট দিলেন বিজেপির পক্ষেই। ফলে এ রাজ্যেও ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার তৈরি হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ জয় করেছে বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনেও যে দল সে ভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি, দু’বছরের ব্যবধানে তারাই ২০০-র গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে। জেলায় জেলায় পদ্মের ঝড়ে উড়ে গিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থীরা।
-
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভেঙে দিলেন রাজ্যপাল আরএন রবি, ইস্তফা না-দিলেও মমতা এখন ‘প্রাক্তন’ মুখ্যমন্ত্রী! রাজ্য কার?
-
বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী মোদী! রাজ্যে প্রচারে এসে দিয়ে গিয়েছিলেন কথা
-
ভোট-পরবর্তী গোলমালে রুজু ২০০ এফআইআর! কেউ কেউ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অশান্তি পাকাতে চাইছেন: ডিজি সিদ্ধনাথ
-
‘কমিশন ১০টি গণনাকেন্দ্রের ছয় ঘণ্টার ফুটেজ দিক, দেখাক কিছু হয়নি, আমি মেনে নেব এটাই জনাদেশ’! চ্যালেঞ্জ অভিষেকের
-
৪৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে রাজ্যে ২০৭টি আসনে জয় পেল বিজেপি! ৮০টি আসনে জয়ী তৃণমূল, তাদের ভোটের হার কত