তিনি প্রার্থী নন। এ বার টিকিটই পাননি। তবু রায়দিঘি আসনে বিরোধী তো বটেই, শাসক দলের আলোচনার কেন্দ্রেও তিনি। বিরোধীদের প্রচার জুড়ে বার বার উঠে আসছে তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক, অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়ের কথা।
তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেটা ছিল বড়সড় ঝুঁকি। মাঠেঘাটে রাজনীতির পোড় খাওয়া নেতা সিপিএমের কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে রায়দিঘি কেন্দ্রে তিনি প্রার্থী করেছিলেন রাজনীতিতে নবাগত অভিনেত্রী দেবশ্রীকে। কান্তিবাবুর জনসংযোগের বলে ছিটকে যাবে দেবশ্রীর নড়বড় উইকেট— এমনই মনে করেছিল রাজনৈতিক মহল। কিন্তু চমকে দেন দেবশ্রী। সামান্য ভোটের ব্যবধানে হলেও প্রবীণ রাজনীতির খেলোয়াড়কে হারিয়ে দেন তারকা প্রার্থী দেবশ্রী।
২০১১ সালের পরে ২০১৬ সালেও দেবশ্রীর উপরেই ভরসা রেখেছিলেন মমতা। সে বার গ্রামে গ্রামে অটোয় করে প্রচারে গিয়ে নায়িকা বলেছিলেন, আর টিভির পর্দায় নয়। এ বার থেকে নিত্যই দেখা হবে সকলের সঙ্গে। বিপদে আপদে পাশে থাকবেন বলে ঢালাও প্রতিশ্রুতিও দেন। কিন্তু ‘নিত্য’ সে ফুলের দেখা মেলেনি ‘ফুলবনে’।
আগের বারের মতো এ বারও ভোটে জেতার পরে এলাকায় বিশেষ দেখা যায়নি দেবশ্রীকে। দলেরই লোকজন ক্ষোভ দেখাতে থাকেন তা নিয়ে। ২০১৬ থেকে পরের দু’বছর তবু মাঝে মধ্যে এসেছেন। তারপর থেকে একেবারেই যাতায়াত বন্ধ করে দেন।
এই পরিস্থিতিতে পরিষেবা নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ ভুরি ভুরি। মানুষও ক্ষুব্ধ। এ বার অবশ্য তৃণমূলের প্রার্থী বদল হয়েছে রায়দিঘিতে। লড়বেন কে?
রায়দিঘি বিধানসভার ১৭টি পঞ্চায়েতের মধ্যে মথুরাপুর ১ ব্লকের ৬টি ও মথুরাপুর ২ ব্লকের ১১টি পঞ্চায়েত। এর মধ্যে নদীনালা ঘেরা রায়দিঘি, নগেন্দ্রপুর, কঙ্কনদিঘি, কুমড়োপাড়া সহ কয়েকটি পঞ্চায়েত রয়েছে। বুলবুল ও আমপানে খুবই ক্ষতি হয়েছিল এলাকায়। ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণের, ত্রিপল, চাল বিলি নিয়ে শাসক দলের নেতারা দুর্নীতি করেছিলেন বলে অভিযোগ। বিরোধীদের বক্তব্য, আমপানে ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়েও শাসকদল স্বজনপোষণ করেছে।
শাসক দলের এক পঞ্চায়েত প্রধানকে জনরোষে সে সময়ে কান ধরে ওঠবোস পর্যন্ত করতে হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। বিরোধীদের অভিযোগ, বাম জমানায় শুরু হওয়া রায়দিঘি বাজারের পাশে বাসস্ট্যান্ড, মার্কেট কমপ্লেক্স, অডিটোরিয়ামের নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। দু’দুবার উদ্বোধন হয়ে পড়ে রয়েছে স্পোর্টস কমপ্লেক্স। সেখানে এখন দিনের বেলায় গরু-ছাগল চরে বেড়াচ্ছে। রাতে দুষ্কৃতীদের মদের আসর বসে।
নদীর উপরে ঢাকির সেতু, নলগোড়া সেতু এত বছরেও জোড়া লাগানো গেল না। রায়দিঘি বিধানসভা এলাকায় যাওয়ার মূল সড়ক দক্ষিণ বিষ্ণুপুর-রায়দিঘি রোড। ৩-৪ বছর ধরে প্রায় বেহাল হয়ে পড়ে ছিল। ভোটের আগে তাতে তাপ্পি দেওয়া হয়েছে। ভাঙাচোরা রাস্তায় এর আগে বহু দুর্ঘটনা ঘটেছে।
চাকরি দেওয়ার নাম করে লক্ষ লক্ষ টাকা তোলার অভিযোগে শাসক দলের নেতাদের নাম জড়িয়েছে। টোটো বিলির নাম করে একটি সংস্থা বেশ কিছু যুবক-যুবতীর থেকে কয়েক কোটি টাকা তুলেছিল।
কেউ টোটো পাননি। টাকাও ফেরত আসেনি। ওই ঘটনায় আবার দেবশ্রীরও নাম জড়ায়। তৃণমূলের একটি সূত্র জানাচ্ছে, বিষয়টি নিয়ে দলের উপরমহলও অসন্তুষ্ট তাঁর উপরে।
এই সব অভিযোগকে সামনে রেখে ক্রমশ ঘর গুছিয়েছে বিজেপি। বিজেপি, সিপিএম দু’দলই আমপানের ক্ষতিপূরণ দূর্নীতিকে সামনে রেখে এক সময়ে টানা আন্দোলন করেছে।
এলাকার বাসিন্দা তথা প্রাক্তন সুন্দরবন উন্নয়নমন্ত্রী কান্তি গঙ্গোপাধ্যায় এ বারও লড়ছেন রায়দিঘি কেন্দ্রে। তাঁর অভিযোগ, বিদায়ী বিধায়ক টোটোর টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ করলেও বিধায়কের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানালেন কান্তি। নিজে সারা বছর হাটে-মাঠে-ঘাটে থাকেন। আমপানের পরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নিয়মিত ত্রাণ, সাহায্য বিলি করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। এ দিকে, অধরা দেবশ্রী। গত তিন বছর ধরে বিধায়ক এলাকায় না আসায় ছাত্রছাত্রীরা শংসাপত্র পর্যন্ত পাচ্ছে না বলে কান্তির অভিযোগ। গত পাঁচ বছরে রায়দিঘিতে সরকারি কোনও প্রকল্প হল না বলেও অভিযোগ কান্তির।
রায়দিঘি থেকে জয়নগর পর্যন্ত রেল লাইনের কাজ শুরু হবে বলে শাসকদল শিলান্যাস করেছিল। তারপরে আর কাজ এগোয়নি বলে ক্ষোভ কান্তির। বরং এই আমপান, লকডাউন পর্বে তাঁরা ক্রমশ জনসংযোগ বাড়িয়ে অনেকটাই ঘর গুছিয়ে নিয়েছেন বলে দাবি করে তিনি বলেন, ‘‘আমরা মানুষের পাশে থেকে রাজনীতি করি। উড়ে এসে জুড়ে বসিনি।’’
রায়দিঘির বিজেপি নেতা বাবু চক্রবর্তীর অভিযোগ, বিধায়কের মদতে চাকরি দেওয়ার নাম করে বেকারদের কাছে থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা নেতারা তুলেছেন। আমপান, বুলবুলে ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়ার জন্য সরকারি শাড়ি কাপড়, রান্নার সরঞ্জাম এখনও গুদামে পড়ে রয়েছে।’’
দেবশ্রীর সঙ্গে তাঁর দলের নেতারাই যোগাযোগ করতে পারেন না বলে অভিযোগ উঠেছে বার বার। এ সব নিয়ে কথা বলার জন্য ফোন করা হলেও যথারীতি তাঁর ফোন বেজে গিয়েছে। মেসেজেরও উত্তর মেলেনি। তৃণমূল প্রার্থী অলক জলদাতা বলেন, ‘‘দেবশ্রী রায়ের অভাব এলাকার মানুষকে আমরা বুঝতে দিইনি। পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলা পরিষদের থেকে সমস্ত উন্নয়নের কাজ আমরা চালিয়ে গিয়েছি। শুধুমাত্র ছাত্রছাত্রীদের শংসাপত্র দেওয়া নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। পরে মন্দিরবাজার বিধায়কের সাহায্যে কাজ চালানো হয়েছে। এ ছাড়া, দুয়ারে সরকার প্রকল্পে সমস্ত সমস্যার সমাধান করা গিয়েছে।’’
তৃণমূল ছেড়ে সদ্য বিজেপিতে যাওয়া নেতা শান্তনু বাপুলি এ বার টিকিট পেয়েছেন এই কেন্দ্রে। তা নিয়ে দলের অন্দরে ক্ষোভ-বিক্ষোভ হয়েছে বিস্তর। শান্তনুর সঙ্গে ফোনে যোগাযাগ করা যায়নি। মেসেজেরও উত্তর মেলেনি। দলের নেতা বাবু বলেন, ‘‘শুরুতে সমস্যা থাকলেও তা মিটে গিয়েছে।