প্রশ্ন: অনেক দিন পরে বনি সেনগুপ্ত অভিনীত ছবি নিয়ে এত মাতামাতি, প্রচার। মাঝের সময়টা কী হল?
বনি: মাঝে অনেকেই জিজ্ঞাসা করেছেন, আমাকে কেন সেইরকম বাণিজ্যিক ঘরানার ছবিতে দেখা যাচ্ছে না। যে ছবিগুলো করছিলাম সেগুলো একটু কম বাজেটের কাজ ছিল। তাই তথাকথিত ‘বড়’ ভাবে ভাবা যাচ্ছিল না কিছু। কিন্তু ‘ভানুপ্রিয়া ভূতের হোটেল’-এর প্রযোজনা সংস্থার সেই ক্ষমতা রয়েছে বড় করে অভিনেতাদের উপস্থাপনা করার। এখন থেকে তাই চেষ্টা করছি অন্য ধরনের কাজ করার।
প্রশ্ন: রাজ চক্রবর্তী পরিচালনায়, প্রথম সারির প্রযোজনা সংস্থার প্রযোজিত ছবি দিয়ে আপনার টলিউডে হাতেখড়ি। সেখানে গত কয়েক বছরে এমন কিছু ছবি বাছলেন কেন, যা নিয়ে সে ভাবে আলোচনাই হল না?
বনি: অভিনেতাদের দুটো পথ থাকে। একটা হতে পারে, খুব বেছে কাজ করব। এতটাই বাছবিচার করব যে শেষে হারিয়ে যাব। আবার আর একটা পথ থাকে, যেখানে ছোট-বড়, ভাল –মন্দ যা-ই হোক না কেন, অভিনেতা তাঁর কাজ চালিয়ে যাবে। আমি হারিয়ে যেতে চাইনি। দুটো খারাপ ছবি করলেও কাউকে খুঁজতে হয়নি বনি কোথায় গেল রে? সেটা আমি করতে দিইনি। আর আমাদের এখানে সুযোগ খুব কম দেওয়া হয়।
প্রভাবশালী পরিবারের ছেলে হয়েও কম সুযোগ পেয়েছেন বনি? ছবি: সংগৃহীত।
প্রশ্ন: আপনার মা পিয়া সেনগুপ্ত টলিউডে উচ্চপদে রয়েছেন। বাবা অনুপ সেনগুপ্ত জনপ্রিয় পরিচালক। অভিনেতা সুখেন দাস ছিলেন আপনার দাদু। তার পরেও আপনি সুযোগ কম পেলেন?
বনি: এটা সত্যি। টলিউডে যে ভাবে আমার অভিনয়জীবন শুরু হয়েছিল, তার পর আমি খুব একটা সুযোগ পাইনি। আমার কাছে বড় পরিচালকদের সঙ্গে কাজের সুযোগ আসেনি। প্রথম সারির প্রযোজনা সংস্থায় যখন কাজ করেছি তখন বড় পরিচালকদের ছবিতে কাজ পেয়েছি। কিন্তু নামী প্রযোজনার সঙ্গে চুক্তি শেষ হওয়ার পরে প্রথম সারির কোনও পরিচালকের তরফে কোনও সুযোগ আসেনি আমার কাছে। এ বার আমাকে তো সংসার চালাতে হবে। বনি নামটা তো পরিচিত হয়ে গিয়েছে। নিজেকে তো চালাতে হবে। জীবনধারার মান তো নামিয়ে আনতে পারব না। আর সেটা আমি চাইওনি। নিজেকে চালানোর জন্য, অর্থ রোজগারের জন্য ওই কাজগুলো করেছিলাম। অবসাদের মধ্যে যেতে চাইনি। কাজ করে গিয়েছি, তা যেমনই হোক না কেন।
প্রশ্ন: প্রথম সারির প্রযোজনা সংস্থার চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা কি ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে হয় আপনার?
বনি: তারা আমাকে একটা জায়গা তৈরি করে দিয়েছে। আমি তাদের বলতে পারি না আমাকে নিয়ে কাজ করতেই হবে। আমাকে যতটা ব্যবহার করা যায়, ততটা করে ফেলেছে। তাদের মনে হতেই পারে নতুন শিল্পীদের নিয়ে কাজ করার কথা। মাঝে অন্য ধারার ছবি তৈরিতেই মন দিয়েছিল কিছু কিছু সংস্থা। এখন আবার সেই বাণিজ্যিক ঘরানার দিকে ফিরছে তারা। আর একটা অদ্ভুত ভাবনা কাজ করে এখানে। দেখেছি, বনি, অঙ্কুশ বা যশ মানে আমরা প্রধানত যাঁরা মূলধারার ছবিতে কাজ করি, তাঁরা আবীরদা (চট্টোপাধ্যায়), অনির্বাণদের (ভট্টাচার্য) ঘরানার ছবিতে অভিনয় করতে পারব না। এই পার্থক্যটা রয়েই গিয়েছে। সেই ধারা ভাঙছে কিন্তু শিবুদারা (মুখোপাধ্যায়)। সেটার উদাহরণ কিন্তু কৌশানী মুখোপাধ্যায়।
প্রেমিকা কৌশানী মুখোপাধ্যায়ের জন্যই কি পেয়েছেন বড় সুযোগ? ছবি: সংগৃহীত।
প্রশ্ন: অনেকে তো বলছেন, কৌশানীর জন্যই ‘ভানুপ্রিয়া ভূতের হোটেল’ ছবিতে কাজের সুযোগ গিয়েছে আপনার কাছে?
বনি: আসলে অনেকের হাতে প্রচুর সময় রয়েছে। ভাল সহ্য করতে পারেন না। সব ভালর মাঝে খারাপ কিছু খুঁজতেই হবে। নন্দিতাদি (রায়) এবং শিবুদার সঙ্গে মিশলে বুঝতে পারবেন, যতক্ষণ না সেই চরিত্রটা শিল্পীর সঙ্গে যাচ্ছে, ততক্ষণ বাছাই করবেন না।
প্রশ্ন: একই কর্মজগৎ হলে প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে অনেক সময়ই দূরত্ব তৈরি হয়। আপনাদের মধ্যে কখনও সমস্যা হয়েছে?
উত্তর: একটা সময় ছিল কৌশানী তখন নিজের কেরিয়ার নিয়ে খুব চিন্তায়। কী ভাবে এগোবে, কী কাজ হবে, না হবে। তখন আমার কাছে বড় সংস্থার অনেক কাজ। এমন সময়ও গিয়েছে আমার নামে সিনেমা বিক্রি হয়েছে। আবার গত কয়েক বছরে তার উল্টোটা হয়েছে। যেখানে আমি ছোট বাজেটের ছবিতে অভিনয় করেছি। সেখানে কৌশানীর কাছে বড় পরিচালকদের কাজ। আসলে প্রতিটা পরিস্থিতিতেই আমরা পরস্পরের পাশে ছিলাম, আছি।
প্রশ্ন: আপনি কখনও নিজের কাজের জন্য কাউকে বলেছেন?
বনি: না, আমি যে পরিবারে বড় হয়েছি সেটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কাজের জন্য ভিক্ষা চাইতে পারব না। মাকেও বলেছি যে আমার জন্য কাউকে কিছু বোলো না। অনেক আগে মা তাও দু-একজনকে বলেছিলেন। কিন্তু তাঁরা কখনও আমাকে ডাকেননি। আমি বরং শিবুদাকে বহু বছর আগে বলেছিলাম, দাদা যদি কোনও কাজ থাকে বোলো। এখন দাদার সঙ্গে কাজ করে বুঝলাম, যতক্ষণ না সঠিক চরিত্র পাওয়া যায় ততক্ষণ শিবুদারা বলেন না।
প্রশ্ন: আপনার কি মনে হয়, এই ছবি মুক্তি পাওয়ার পরে টলিউডের তথাকথিত নামী পরিচালকদের থেকে কাজের সুযোগ আসবে?
বনি: সেটা বলা খুব মুশকিল। কিন্তু আশা করতে তো ক্ষতি নেই। এটা ঠিক, ‘ভানুপ্রিয়া ভূতের হোটেল’-এর পর আমি বেছে কাজ করারই চেষ্টা করব। আবার বড় সংস্থায় কাজ করার পরে উপলব্ধি করেছি, নিজেকে চালানোর জন্য যে কাজগুলো করেছি মাঝখানে, সেই ধরনের কাজ আর করা উচিত নয়। আসলে ভাল কাজ করতে গেলে একটু অপেক্ষা করতে হয়। ধৈর্য ধরে থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তখন আমার অতটা টাকার জোর ছিল না যে অপেক্ষা করে থাকব। তাই কাজ করতে হয়েছে। সে সময়ে মা যাত্রাও করছিল না। এখন যেমন মা আবার যাত্রা করছে। এখন সেই পকেটের জোর আছে বলে অপেক্ষা করতে পারছি। ধৈর্য ধরে থাকার সাহস পাচ্ছি। এখন আমি শুধু ভাল কাজই করতে চাই। এই কাজটা করার পরে বেশি করে এটাই ভাবছি।
নিজেদের প্রযোজনা সংস্থা নিয়ে কী ভাবছেন বনি-কৌশানী? ছবি: সংগৃহীত
প্রশ্ন: আপনি এবং কৌশানী যৌথ ভাবে তো একটা প্রযোজনা সংস্থাও খুলেছিলেন, সেটার ভবিষ্যৎ কী?
বনি: আমি আর কৌশানী একদম মিথ্যে কথা বলতে পারি না। অনেক লগ্নিকারী এসেছেন। কিন্তু তাঁদের যদি বলতাম লগ্নি করলে প্রচুর লাভ করতে পারবেন তা হলে হয়তো অনেক কাজ করতাম। কিন্তু সেটা চাই না। যাঁরা ছবিকে ভালবেসে এগোতে পারবেন, তাঁরা যুক্ত হলেই ভাল। আমরাও চাই দর্শক বনি-কৌশানী জুটিকে অন্য ভাবে দেখুক।
প্রশ্ন: কেন বনি-কৌশানী জুটি? নতুন জুটি, নতুন শিল্পীদের নিয়ে কাজ করবেন না?
বনি: সবাই তো নিজেদের নিয়ে কাজ করছেন, আমরা করলেই বা ক্ষতি কী? না, না নতুনদের নিয়েও কাজ করব। তবে আপাতত পরিকল্পনা করছি যদি একটা ধারাবাহিক তৈরি করতে পারি। সেই ভাবে নিজেদের প্রযোজনা সংস্থাকে যদি শক্ত করা যায়।
মানসিক অবসাদ কখনও গ্রাস করেছিল নায়ককে? ছবি: সংগৃহীত।
প্রশ্ন: ‘হিট’ নায়ক থেকে আচমকাই কাজের গতি কমে যাওয়া, অবসাদ হয়েছিল কখনও?
বনি: করোনার পরের দিকে খুবই অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। দেখছিলাম টাকা চলে যাচ্ছে, আসছে না। এত খাওয়া-দাওয়া করেছিলাম। সেই সময়ে অহেতুক আমার আর কৌশানীর মধ্যে প্রচুর ঝগড়া, কথা কাটাকাটি হয়েছে। কিন্তু সেটা সময়টা পেরিয়ে আমরা ভাল আছি। ওর ভাল সময় যাচ্ছে। আশা করছি, আমারও ভাল সময় আসবে।
প্রশ্ন: আপনি তো রাজনীতিতেও যোগ দিয়েছিলেন। আবার কি রাজনীতির ময়দানে নামার ইচ্ছা আছে?
বনি: ব্যাপারটায় যোগ দিয়ে আমার ভাল লাগেনি। আসলে, নিজের ভিতরে ভালমানুষি থাকলে রাজনীতি করা যায় না। তাই ওই ক্ষেত্রটা আমার জন্য নয়।