মিমি চক্রবর্তীর জন্মদিন। কোনও মাধ্যমের মারফত নুসরত জাহানকে শুভেচ্ছা জানাতে হবে?
বিশ্বাস করুন, আমাদের বন্ধুত্ব এতটাও ‘শীতল’ নয়। হ্যাঁ, মাথাগরম হলে মিমি মুখের উপরে হয়তো বলবে, নুসরতকে নিয়ে কিচ্ছু বলব না। ওর সঙ্গে আমার ঝগড়া। তার পরেও দিনের শেষে দেখা হয়ে গেলে হাসি চাপতে চাপতে জড়িয়ে ধরবে।
এই ভাব এই আড়ি! ছবি: সংগৃহীত।
এই যেমন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে ঘটল। পদ্মশ্রী পাওয়ার আনন্দে বুম্বাদার বাড়িতে আমরা সবাই। মিমি এসেই আমায় দেখে এগিয়ে এল। উপস্থিত ছবিশিকারিরা কিন্তু আমাদের আলিঙ্গনে উষ্ণতা খুঁজে পেয়েছেন।
পুরুষেরা কতই না প্রেমপত্র লেখেন। বন্ধুর জন্মদিনে আনন্দবাজার ডট কম-এর পাতায় আমি না হয় বন্ধুত্বের খোলা চিঠি লিখলাম।
আমাদের কত স্মৃতি। বন্ধুত্বের গোড়ার কথা আবছা। সম্ভবত ‘যোদ্ধা’ ছবির শুটিং। আমরা তখন এসভিএফ প্রযোজনা সংস্থায় কাজ করি। ছবিতে আমার একটি ‘আইটেম’ নাচ ছিল। প্রথম দেখা প্রযোজনা সংস্থার অফিসে। ছবিতে আমরা বন্ধু। আমরা একসঙ্গে নাচের মহড়া দিতাম। মহড়ার পর আমি মিমির ঘরে, নয়তো মিমি আমার। বন্ধুত্বের সেই শুরু। তখন আমাদের কম করে দিন পনেরোর আউটডোর শুটিং থাকত। ওই ১৫ দিন আমরা পরস্পরের ছায়া।
ওই সময় থেকেবন্ধুত্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছোল যে, পরস্পরের গোপনকথা, গোপনব্যথাও আর অজানা রইল না!
গসিপে ব্যস্ত দুই বন্ধু? ছবি: সংগৃহীত।
শুধু আড্ডা? খাওয়াদাওয়া, ঘুরতে যাওয়া, সিনেমা দেখা, কেনাকাটি— সবেতেই আমরা দু’জন।
ও যে কী মিষ্টি, আপনাদের ধারণাই নেই! ঘুমোতে যাওয়ার আগে মিমির নির্দেশ, রোজ ক্যামোমিল টি খেতে হবে। কোথা থেকে জানি সেই চা আনিয়েছিল। নিজে হাতে চা বানাত। আমাকেও নিয়ম করে খাওয়াত। গরম জলে ক্যামোমিল দিলেই ফুটে উঠত ফুল। আমাদের বন্ধুত্বও যেন ও ভাবেই পাপড়ি মেলেছিল। সকালের জলখাবার থেকে রাতের খাওয়া— এক মেনু আমাদের। আরও শুনবেন? ব্যাঙ্ককে শুটিং করতে গিয়েছি আমরা। সারা দিন রোদের নীচে শুটিং। ত্বক পুড়ে ঝামা। কাজ ফুরোলে দুই বান্ধবী মিলে এত্ত টম্যাটো কিনে এনেছি! হোটেলে ফিরে সে গুলো চাকা চাকা করে কেটে একে অন্যের গায়ে টম্যাটো ঘষছি।
আর গসিপিং? ওর মাত্রাই আলাদা। কারও নামে কিচ্ছু বলতাম না কিন্তু। আমরা তো নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। একদিন মিমির গয়নার বাক্স থেকে দুল হারিয়ে গিয়েছে। ব্যস, ওর মুখ ভার। আমরা বেরিয়ে দোকানে গেলাম। দুল পছন্দ করে দিলাম। ও সেটা কিনল। সেটে এসে পরে শুটিং করল। তবে ওর মুখে হাসি।
প্রিয় বান্ধবী নুসরতের মেহেন্দিতে মিমি। ছবি: সংগৃহীত।
দুই বন্ধু মিলে কত বেড়াতে গিয়েছি! লাস ভেগাস কিংবা লস অ্যাঞ্জেলেস। প্রচুর ভাল স্মৃতি। কত দুষ্টুমিও করেছি। মিমি বরাবরের ‘ডেয়ার ডেভিল’। ‘বনগাঁকাণ্ড’ তো হালের। ওর চোখে কোনও কিছু অন্যায় মানেই তার প্রতিবাদ করবে। এখনকার মিমি তো অনেক পরিণত। আমি ‘বাচ্চা’ মিমিকেও দেখেছি। সেই ছেলেমানুষ মিমির রাগ হলেই ঝগ়়ড়া করে নেয়। আমাদের মধ্যে কম ঝগড়া হয়েছে? টিমের সামনে প্রচণ্ড ঝগড়া করেছি। রাতে ফাটাফাটি রাগ। পরের দিন সকালে মিমির ভাল ছবি কেউ তুলে দিতে পারছে না। আমি গিয়ে তুলে দিতেই ভাব।
আমি নিশ্চিত, আজও মিমি যখনই প্যানকেক খায়, আমায় মনে করে। এর পিছনেও তো স্মৃতি আছে। আমি আর ও রোজ রাতে চুপিচুপি বেরিয়ে প্যানকেক খেতাম। তাইল্যান্ডের রাস্তা শুনশান। ওখানকার ভাষায় প্যানকেকের নাম ‘ক্রেপস’। ফুটপাতে দু’জনে বসে পড়েছি। খাওয়া আর আড্ডা! ওখানে তো আমাদের কেউ চেনে না। এই পর্যন্ত পড়ে নিন্দকেরা প্রশ্ন তুলবে, এতই যদি বন্ধুত্ব তা হলে মাঝে দূরত্ব তৈরি হল কেন? অনেকে এ রকমও বলেন, দু’জন মেয়ে আজীবন ‘ভাল বন্ধু’ থাকতেই পারে না! আমি বলি, পারে। অবশ্যই পারে। যদি সেই বন্ধুত্ব গভীর হয়। আমরা এখন নিজেদের মতো করে ব্যস্ত। আমার সন্তান আছে। তাকে সামলাতে গিয়ে দিনের বড় অংশ চলে যায়। মিমিও ওর মতো করে সংসারী। এখন কি আর আমরা আগের মতো ‘রইল ঝোলা চলল ভোলা’ বলে যা খুশি করতে পারি? আমরা তো বড় হয়েছি!
এই বিশ্বাস থেকেই বলছি, আমার আর মিমির বন্ধুত্ব কোনও দিন নষ্ট হওয়ার নয়। হ্যাঁ, মাঝে হয়তো দূরত্ব বেড়েছিল। অভিমানও কি ছায়া ফেলেছিল? কিন্তু বন্ধুত্বের ‘মৃত্যু’ ঘটেনি।
সংসদ ভবনে মিমি চক্রবর্তী, নুসরত জাহান। ছবি: সংগৃহীত।
কাকতালীয় ভাবে আমরা দু’জনেই তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ নির্বাচিত হয়েছি। ওর নাম আগে বেরিয়েছিল। ফোন করে জানিয়েছিল মিমি। একসঙ্গে পার্লামেন্টে গিয়েছি। কোনও রকমের দুষ্টুমি সেখানে করিনি। আসলে মিমির ভিতর আর বাইরেটা এক নয়। আমি যে ভাবে ওকে চিনি, আপনারা চেনেন না। যে ভাবে জানি, আপনারা জানেন না। সেই জায়গা থেকে বলতে পারি, মিমিকে জানতে হবে। বুঝতে হবে। সময় দিতে হবে। যা আজকের দিনে কেউ কাউকে দেয় না! তবেই মিমির সঠিক মূল্যায়ণ হবে।
মিমির অনেক জন্মদিনের সাক্ষী আমি। আমরা একসঙ্গে পার্টি করেছি। আর হুল্লোড়শেষে ঈশ্বরকে বলেছি, মিমি যেন একটুও না বদলায়। এক ইঞ্চি বদল চাই না ওর। যেমন আছে তেমনই থাকুক। সুখে থাকুক, শান্তিতে থাকুক। পরস্পরের অনেক ভাল, খারাপ সময়ের সাক্ষী আমরা। মিমিকে তাই আগলে রাখার দায়িত্ব আমার। টলিউড আমাদের ‘বোনুয়া’ নাম দিয়েছে। তুই নিশ্চিন্তে থাক। আজীবন তোর পাশে থাকবে তোর ‘বোনুয়া’।