আপ্যায়নে এক রাজা। অপর রাজা অতিথি। দু’জনেই ভারতীয়। আর দু’জনই সেকালের সংস্কৃতিবান রাজা বলে খ্যাত। কিন্তু খাবার টেবিলে এক জন আর এক জনকে কী সাজিয়ে দিলেন? পোলাও, বিরিয়ানি, মুর্গ মসল্লম, কবাব, মন্ডা-মিঠাই নয়। ১৩০ বছর আগের সেই রাজভোজে পরিবেশন করা হয় এমন সব খাবার, যা আজও চমকিত করে।
সেই ভোজের একটি মেনু কার্ড সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়েছে সমাজমাধ্যমে। ১৮৯৭ সালে মেনু কার্ডটি ছাপানো হয়েছিল বরোদার লক্ষ্মী বিলাস প্যালেসে আয়োজিত এক নৈশভোজের জন্য। গ্বালিয়রের মহারাজা মাধো রাও সিন্ধিয়াকে সেই নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বরোদার মহারাজা তৃতীয় সওয়াজিরাও গায়কোয়াড়।
দু’জনেই সে কালের দূরদর্শী রাজা বলে খ্যাত ছিলেন। ভাবনা-চিন্তাতেও ছিলেন অন্য রাজাদের থেকে আলাদা। সওয়াজিরাও ছিলেন স্বদেশপ্রেমী। নিজের রাজ্যের সংস্কৃতি এবং শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁর মতো উৎসাহী মানুষ কমই দেখা যায়। তাঁর আমলেই রাজা রবি বর্মার মতো শিল্পীর উত্থান। হারিয়ে যাওয়া বহু সংস্কৃতিকেই নতুন করে ফিরিয়ে এনেছিলেন তিনি। গোটা দুনিয়ায় কোথায় কী চলছে, সে দিকেও ছিল তাঁর সজাগ নজর। নিজের রাজ্যকে শিক্ষায় এবং আধুনিকতায় অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছিলেন সওয়াজিরাও।
অন্য দিকে, মাধোরাওকে বলা হত কিং অফ কমোনার্স। রাজারা যুগে যুগে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতেই অভ্যস্ত ছিলেন। কিন্তু তিনি তা ছিলেন না। প্রজারা তাঁর কাছে পৌঁছোতে পারত সহজেই। কখনও সখনও সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে রাস্তাঘাটে ঘুরেও বেড়াতেন তিনি। বুঝতেন রাজ্যের কোথায় কী দরকার। ইনিও আধুনিকমনস্ক রাজা ছিলেন বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন এদেশের ব্রিটিশ শাসকেরা। এই দুই রাজা যখন নৈশভোজের টেবিলে মুখোমুখি হলেন, তখন কী খেলেন? খাঁটি বিদেশি কেতার সব খাবার-দাবার।
এক ইতিহাস গবেষক নেহা ভারমানি সম্প্রতি সেই মেনু প্রকাশ্যে এনেছেন। তিনি লিখছেন সে দিন মেনুতে যা যা ছিল, তা মোটেই সেই যুগের প্রচলিত খানাপিনার মতো নয়। কী কী ছিল মেনুতে?
১. লোতেজ দি’আমান্দেজ— কাঠবাদামের কাস্টার্ড।
২. পয়সন ব্রেজ় সস মেয়োনিজ়— মাছকে সামান্য ভেজে তার পরে ঢিমে আঁচে রান্না করা। তার উপরে মেয়োনিজ়ের সস ছড়ানো।
৩. ক্রিম দে ভোলেল ট্রাফস— মখমলের মতো মসৃণ মুরগির মাংসের স্যুপ, তার সঙ্গে মেশানো ট্রাফল। যা এক ধরনের ছত্রাক।
৪. কটলেটস দে মটন আ লা ইটালিয়েন— ইটালীয় রন্ধনশৈলীতে তৈরি ভেড়ার মাংসের কাটলেট, যা সে দেশের বিভিন্ন ধরনের হার্বস ব্যবহার করে তৈরি।
৫. সেলে দে পার্দ্রোঁ রোতি অঁ পেতিত পয়েজ়— ঝলসানো তিতিরের মাংসের সঙ্গে কড়াইশুঁটি দিয়ে তৈরি পদ।
৬. ফন্দস দ্য আর্টিশটস আ লা দেমি গ্লেস— ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে পাওয়া ফুলের মতো দেখতে এক সব্জি আর্টিচোক। তা দিয়ে তৈরি ফরাসি রান্না। প্রথমে ভাপিয়ে নিয়ে তার পরে ওই ফুলের মতো সব্জি পরিবেশন করা হয় বাদামি রঙের এক বিশেষ ধরনের ফ্রেঞ্চ সস দিয়ে।
৭. কারি দে ম্যাসিডোয়েন দে লেগিউমে এ রিজ— সব্জি, ভাত এবং ডাল দিয়ে তৈরি এক ধরনের কারি জাতীয় রান্না।
৮. পোমে আ লা ক্রিম— আপেলকে পোচ অথবা বেক করে তৈরি নরম ক্রিমের মতো একটি মিষ্টি পদ।
৯. গ্লেস দে পিস্তাচিও— পেস্তাবাদাম দিয়ে তৈরি জেলাতোর মতো কোনও একটি আইসক্রিম জাতীয় খাবার।
এ যুগে যখন ভারত আন্তর্জাতিকতা ছেড়ে স্বদেশমুখী হচ্ছে। পুরাতনী সংস্কৃতিতে ফেরাই নতুন ভাবে উদযাপিত হচ্ছে। সেখানে সে কালের ওই দুই দূরদর্শী রাজা নিজের গণ্ডীর বাইরে ভাবনাচিন্তা শুরু করেছিলেন। ভাইরাল হওয়া মেনু কার্ডে সেই বিষয়টিই লক্ষ্য করেছেন এ যুগের মানুষও। এক নেটাগরিক লিখেছেন, ‘‘সেকালের ভারতীয় অভিজাত সমাজের চলনবলনের সঙ্গে বিদেশি অভিজাতদের খুব একটা তফাত ছিল না। আন্তর্জাতিক সংস্কৃতিকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন তাঁরা।’’ আর এক জন লিখেছেন, ‘‘এখন হলে রাষ্ট্রপতি ভবনে মিলেটের স্যুপ খেতে হত।’’ এ যুগের পুরাতনে ফেরার সংস্কৃতিকে ইঙ্গিত করে এক নেটাগরিকের কটাক্ষ, ‘‘খুবই স্বদেশী বলতে হবে।’’