Advertisement
E-Paper

পূরবী রাগটিকে তো রবীন্দ্রনাথ বাঁচিয়ে দিয়েছেন! একান্ত সাক্ষাৎকারে বললেন শতায়ু অমিয়রঞ্জন

বিষ্ণুপুর ঘরানায় তাঁর সঙ্গীতে দীক্ষা থেকে শ্রোতাদের বদলে যাওয়া চরিত্র, গান-বাজনায় বদল, নিজেকে ভেঙে গড়া, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা থেকে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু— সবই উঠে এল।

ঋতপ্রভ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৯
শতবর্ষে সঙ্গীত পরিবেশন করছেন অমিয়রঞ্জন। গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনে।

শতবর্ষে সঙ্গীত পরিবেশন করছেন অমিয়রঞ্জন। গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনে। ছবি: সংগৃহীত।

তাঁর জন্মদিন ২১ ফেব্রুয়ারি। ভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে পরবর্তী কালে এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালন করা হয়। ১০০ বছর পার করে সে দিন অনুষ্ঠান করলেন গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনে। পরিবেশন করলেন রাগ বেহাগ। প্রায় ৪০ মিনিট থাকলেন স্টেজে। অনুষ্ঠানশেষে অজয় চক্রবর্তী বললেন, ‘‘১০০ বছর বয়সে এত সুচিন্তিত বেহাগ রাগ শোনালেন— এমনটা আগে বাংলায় কখনও কোনও শিল্পী করতে পেরেছেন কি না, তা আমার জানা নেই। ওঁর সুস্থ জীবন কামনা করি।’’ অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘ কাল সল্টলেকে বাস করলেও বর্তমানে তাঁর পুত্রের কাছে রয়েছেন দক্ষিণ কলকাতার বিবেকানন্দ পার্কের সন্নিকটে একটি আবাসনে। বিষ্ণুপুর ঘরানায় তাঁর সঙ্গীতে দীক্ষা থেকে শ্রোতাদের বদলে যাওয়া চরিত্র, গান-বাজনায় বদল, নিজেকে ভেঙে গড়া, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা থেকে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু— সবই উঠে এল। তাঁর বিখ্যাত তানের মতো মস্তিষ্ক এখনও সচল। তারই কিছু আভাস একান্ত আলাপচারিতায়।

প্রশ্ন: ১০০ বছর বয়সে স্টেজে ঘণ্টাখানেকের উপর বেহাগ গাইলেন। কেমন অভিজ্ঞতা?

অমিয়রঞ্জন: গান যে আমি সে দিন খুব ভাল গেয়েছি, তা বলতে পারি না। মোটামুটি গেয়েছি। লোকে দুর্নাম করেনি, এটা আমার পিতৃপুরুষের ভাগ্য। কারণ, তাদের নিন্দে করাই খুব স্বাভাবিক ছিল। তা হয়নি, এটা আমার ভাগ্য। প্রচুর ভিড় হয়েছিল। তবে ভিড় দেখে গান কতটা রসোত্তীর্ণ হল, এ বলা বড় শক্ত। এমনও হয়, প্রচুর ভিড়, হাততালিও পড়ছে, কিন্তু সত্যিকারের যে আনন্দ-অনুভব তা হয়তো হল না। গানের সম্পর্কে বলা বড় শক্ত। ভাল গান, খুব সুন্দর গানও শ্রোতারা তেমন ভাবে নিতে পারেননি— এমন হয় না, তা নয়। যিনি শ্রোতা, তাঁর শুধু রসবোধ থাকলে হবে না, তাঁর মধ্যে রস উপভোগের ক্ষমতাও থাকা দরকার। সে দিন আমার ভালই লাগল।

প্রশ্ন: জন্ম টেগর ক্যাসল স্ট্রিটে, বৃন্দাবন বসাক স্ট্রিটে থাকা, স্কুল ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, আহিরীটোলা, শ্যামবাজার, গোয়াবাগানের পর সল্টলেক, অধুনা দক্ষিণ কলকাতার বিবেকানন্দ পার্কের কাছের আবাসন— কলকাতার শ্রোতার বদল আপনার চোখে কী রকম ধরা পড়ে?

অমিয়রঞ্জন: তখনকার দিনে শ্রোতা দেখেছি। গুনেছি কত হতে পারে। কিন্তু এখন যেমন উন্মাদনা শ্রোতার মধ্যে, সেই উন্মাদনা, সেই সাড়া তখন পাইনি। কিন্তু তখন গভীরে যাওয়ার একটা ব্যাপার লক্ষ করেছি। একটা উদাহরণ দিই। তখন অ্যালবার্ট হলে গান হত (এখন যেটা কফি হাউস)। আমি একাধিক বার গেয়েছি। যে অনুষ্ঠানের কথা বলছি, সেখানে সরস্বতী রাণে গাইবেন অ্যালবার্ট হলে। হলভর্তি লোক। আমি ছিলাম। উনি শঙ্করা ধরলেন— ‘আলিরি আ’। যত বার উনি ‘আলিরি আ’ বলে সমে ফিরছেন, সব শ্রোতা একসঙ্গে ‘আ’ বলে উঠছেন। আমার সামনে বসেছিলেন সুনীল বসু। তিনিও ওই ‘আ’-তে গেয়ে উঠলেন। গান শেষ হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডায়াসে উঠে বললেন, ‘‘একটা খবর আছে। খবরটা কিন্তু খুব ভাল নয়— ব্রিটেন ডিক্লেয়ার্স ওয়ার এগেন্সট জার্মানি’’। এই খবর শুনে কেমন সবাই চুপসে গেল। গান শুনে যে আনন্দের ভাব— সেটা রইল না। তার পর তো জাপানি বোমা পড়ল। তখন গান-বাজনা শিকেয়। প্রাণ নিয়ে টানাটানি।

প্রশ্ন: আপনি বাংলা ভাষার ছাত্র ছিলেন। সঙ্গীতের নন্দনতত্ত্ব নিয়ে পিএইচডি করেছেন। ঘটনাচক্রে, আপনার জন্মদিনটিও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে। বাংলা ভাষাতেও আপনি গান করেছেন, সুর দিয়েছেন। বাংলাভাষা নিয়ে এখন নানা কথা শোনা যায়। আপনি কি মনে করেন আগামী দিনে বাংলা ভাষার কোনও বিপদ রয়েছে?

অমিয়রঞ্জন: আপাতত, সে রকম বিপদ চোখে পড়ছে না। তার এত শক্ত ভিত। রবীন্দ্রনাথের মতো লেখক যে ভাষায় আছেন, সে ভাষা এত সহজে বিপদে পড়বে না।

“বাবার কাছে শেখার সময় হাতুড়ির বাড়ি খেয়েছি”, বললেন অমিয়রঞ্জন।

“বাবার কাছে শেখার সময় হাতুড়ির বাড়ি খেয়েছি”, বললেন অমিয়রঞ্জন। ছবি: সংগৃহীত।

প্রশ্ন: আপনি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছাত্র। তাঁদের স্মৃতি যদি একটু বলেন।

অমিয়রঞ্জন: শ্রীকুমারবাবুর ভাষাপ্রয়োগ এবং শব্দকৌশল খুব ভাল লাগত। সুনীতিবাবুর ভাষায় সেই জৌলুস পাইনি, যেমন পেয়েছি শ্রীকুমারবাবুর কাছে। সুনীতিবাবুর বিরুদ্ধে বলার কিচ্ছু নেই। খুব ভাল লেকচার দিতেন। কিন্তু আমার কাছে যতটা আকর্ষণ ছিল শ্রীকুমারবাবুর ভাষার, তা আমি ওঁর মধ্যে পাইনি। শরৎচন্দ্রের জন্মদিন উপলক্ষে একটা সভা হয়েছিল। শ্রীকুমারবাবু বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তখন বয়স হয়ে গিয়েছে। তা সত্ত্বেও ভাষার যে জৌলুস, অসাধারণ। আমরা স্তব্ধ হয়ে শুনতাম। এটা যারা পেল না, তারা বুঝতে পারবে না যে কী হারাল! ওই রকম দ্বিতীয় কাউকে পাওয়া যাবে না।

প্রশ্ন: বিষ্ণুপুর ঘরানার অনেক রাগে রূপ পৃথক। যেমন রামকেলিতে কড়ি মধ্যম লাগে না...। কেন?

অমিয়রঞ্জন: যুগ পাল্টে গেল। যুগ নিয়ে নিল দুই মধ্যমকে। এখন রামকেলিতে আমি যদি দুই মধ্যমকে না নিই, তা হলে লোকে আমাকে নেবে না। চেষ্টা করতাম নতুন বন্দিশগুলি শিখে নিতে। কারণ, ওই বন্দিশ না শিখলে তো রাগের মধ্যে যাওয়া যাবে না। এই যে পরিবর্তন, তাকে যদি আমি গ্রহণ না করি, তা হলে আমাকেও কেউ নেবে না— এই আমার ধারণা ছিল। যে কারণে আমি আমার ঘর থেকে সরে এসেছি।

প্রশ্ন: রবীন্দ্রনাথের উপর বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রগাঢ় প্রভাব ছিল। আপনি বলেছেন, ‘‘পূরবী রাগটিকে রবীন্দ্রনাথ বাঁচিয়ে দিয়েছেন।’’ একটু ব্যাখ্যা করে বলবেন?

অমিয়রঞ্জন: রবীন্দ্রনাথ না থাকলে পূরবী রাগের যেটা বিষ্ণুপুরি রূপ, তা এখনকার শ্রোতারা নিতেন কি না, বা কী ভাবে নিতেন, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। পূরবীর যে প্রচলিত আবেদন, তা অন্য ভাবে ফুটিয়ে তোলা যায় না। রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন এর মধ্যে যে মাধুর্য রয়েছে, তা নিতে হবে। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলতেন, তুমি বিষ্ণুপুর ঘরানার একাধিক রাগের বন্দিশ আমাকে শোনাও। সুরেন্দ্রনাথ শ্রুতিধর ছিলেন। পর পর রাগ শোনাতেন। রবীন্দ্রনাথ কোনও গান শুনে বললেন, এটার স্বরলিপি আমাকে দাও। এর পর রবীন্দ্রনাথ নিজে বাণী রচনা করে ওই রাগ মনে রেখে সুর দিতেন। রবীন্দ্রনাথের রচনা এবং কম্পোজ়িশনের ঠিক ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। রবীন্দ্রনাথের গান যাঁরা শুনবেন, তাঁরা ওঁর কথা, শব্দবিন্যাস, তার সঙ্গে সুরসৃষ্টিতে এতটাই আবিষ্ট হয়ে পড়েন যে, তার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা চলে না। আসলে প্রচলিত পূরবী রাগে শুদ্ধ ধৈবতের ব্যবহার নেই। কিন্তু বিষ্ণুপুর ঘরে তা রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ পূরবী রাগের উপর আধারিত তাঁর গানে শুদ্ধ ধৈবতের ব্যবহার করেছেন (উদাহরণ: ‘তুমি তো সেই যাবেই চ’লে, কিছু তো না রবে বাকি—।’) এই সব গান তৈরি করে রবীন্দ্রনাথ পূরবী রাগটিকে বাঁচিয়ে দিলেন।

“কৃত্রিম মেধা যদি সৃষ্টির মতো সৃষ্টি করতে পারে, তা হলে তা মানুষ গ্রহণ করবে”, বললেন অমিয়রঞ্জন।

“কৃত্রিম মেধা যদি সৃষ্টির মতো সৃষ্টি করতে পারে, তা হলে তা মানুষ গ্রহণ করবে”, বললেন অমিয়রঞ্জন। ছবি: সংগৃহীত।

প্রশ্ন: রবীন্দ্রনাথকে দেখেছেন?

অমিয়রঞ্জন: জীবিত অবস্থায় দেখিনি। মৃত্যু হওয়ার পর দেখেছি। স্কুলে একদিন শুনলাম, রবীন্দ্রনাথ প্রয়াত হয়েছেন। আমরা সব ছুটলাম জোড়াসাঁকোর বাড়িতে। তা-ও ভাল করে দেখতে পাইনি। অনেক মানুষ এসেছিলেন। তাঁর মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হল খুব দ্রুত। একেবারে ছুটতে ছুটতে। দেখলাম চিৎপুর রোডে উঠে বাঁ দিকে নিয়ে গেল। বুঝলাম আদি ব্রাহ্মসমাজে নিয়ে যাওয়া হল। তখন ভাবলাম, এখনই সেখান থেকে বেরিয়ে এসে বিবেকানন্দ রোড ধরবে। আমরা অপেক্ষা করলাম। ওখানে ভিড় হলেও যে রকম ভিড় আশা করেছিলাম, তেমনটা হয়নি। ভিড় হয়েছিল মৃতদেহ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসার পর।

প্রশ্ন: নতুন প্রজন্ম ভারতীয় শাস্ত্রীয়সঙ্গীত শোনে? ১০০ বছর পার করে আপনার অভিজ্ঞতা কী বলছে?

অমিয়রঞ্জন: সেই রকম মনঃসংযোগ দিয়ে শাস্ত্রীয়সঙ্গীত যে শোনে, তা মনে হয় না। তবে যুগের সঙ্গে সঙ্গে একটা শিক্ষাও তো হয়ে যায়। ফলে তারা কিছুটা বুঝতে পারে, সবটা নয়।

প্রশ্ন: গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ষষ্ঠ বা সপ্তম বার বিবাহ করলেন, সেই খবর আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হল এবং তার পর আপনি স্কুলে গেলেন...

অমিয়রঞ্জন: ক্লাসে যাওয়ার পর মাস্টারমশাই হেসে হেসে বললেন, ‘‘কী রে! তোর দাদু এ কী করল! শেষে ৬০ বছর বয়সে আবার বিয়ে করল!’’ গোটা ক্লাসের সামনে আমাকে বলা হল। আমি কী উত্তর দেব। কিছুই বলার নেই।

প্রশ্ন: গান-বাজনার চর্চায় প্রচার খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রচার, খ্যাতি এবং জনপ্রিয়তা কি শিল্পীর শিল্পের মূল্য নির্ধারণ করে? বর্তমানে কৃত্রিম মেধার যুগে যে ভাবে প্রচারে জোয়ার এসেছে, তাকে আপনি কী ভাবে দেখেন?

অমিয়রঞ্জন: শ্রোতাকে আমি অস্বীকার করি না। ‘পাবলিক’ বলতে যা বোঝায়, তারা কিন্তু সমঝদার শ্রোতা। এখন যাঁদের এত নাম, এত খ্যাতি ছড়াচ্ছে, তা কি এমনি এমনি? শিল্পীর মধ্যে কিছু না থাকলে এত খ্যাতি কী করে হবে?

প্রশ্ন: এখন গান-বাজনায় সুর করে দিচ্ছে কৃত্রিম মেধা। আপনার কি মনে হয় আস্তে আস্তে গান-বাজনার মতো সৃজনশীল শিল্পে কৃত্রিম মেধা দাঁত ফোটাবে এবং সাফল্য পাবে? আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে?

অমিয়রঞ্জন: প্রযুক্তি যদি সৃষ্টির মতো সৃষ্টি করতে পারে, তা হলে প্রযুক্তি বেঁচে থাকবে। সৃজনশীলতার মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকবে। থাকবেই। ভাল জিনিস কখনও লোপ পেয়ে যায় না। তবে সে রকম হৃদয়গ্রাহী না হলে প্রযুক্তির সৃষ্টি কিছু দিন থাকবে, তার পর তা আর তেমন ভাল লাগবে না।

প্রশ্ন: গ্রামোফোন রেকর্ড প্লেয়ার বাড়িতে আসার পর আপনার সঙ্গীত শ্রবণ অভিজ্ঞতায় কী রকম পরিবর্তন এল? এই প্রযুক্তি কি আপনাকে ঋদ্ধ করেছে?

অমিয়রঞ্জন: আমাদের বাড়িতে বাবা গ্রামোফোন কিনেছিলেন। আর আমার কাকা তা চালাতেন। আমি চালাতে পারতাম না। ফৈয়াজ় খাঁ-র একটা রেকর্ড চালিয়েছেন। উপরে সা থেকে ধানিসারেগা যে ভাবে বললেন, সা-কে আন্দোলিত করে কোমল রে ছুঁয়ে যে ভাবে রাগ টোড়ির রূপ ফুটিয়ে তুললেন, তাতে দেখলাম কাকা কেঁপে উঠলেন। আমি বুঝলাম, এই হচ্ছে ভাল গান। ভাল গাইলে এই রকম মানসিক প্রভাব পড়ে। সেটা শিখলাম। কাকে ভাল বলে, কাকে মন্দ বলে, তা শিখলাম গ্রামোফোন আসার পর। ফৈয়াজ় খাঁ, আব্দুল করিম খাঁ, এনায়েৎ খাঁ-র সেতার, ইমদাদ খাঁ-র সুরবাহার...। গাইয়ে বাড়ির ছেলের পক্ষে আসল সঙ্গীতশিক্ষা সম্ভব। অন্য কেউ এত ভিতরে ঢুকতে পারে না।

প্রশ্ন: শিখতে গিয়ে মার খেয়েছেন?

অমিয়রঞ্জন: আমি বাবার কাছে শিখতাম। বাবা (সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়) আমাকে নিয়ে রোজ বসতেন। ভাল গান হলে বাবা বলতেন, দেখ, কী রকম শুদ্ধ সুর লাগিয়েছে। এইটা হচ্ছে গান। ভাল ভাল গান শুনেছি। মারধর খেয়েছি। পঞ্চমের মানকে ঠেলতে গিয়ে আমি খরজের মানকে ঠেলেছি। ওঁর হাতের কাছে হাতুড়ি ছিল। তা দিয়ে সোজা মাথায় আঘাত। বাপ রে বাপ! আমি এমন চিৎকার করেছি, যে মা ছুটে এসেছে। মা আসতে বাবা বললেন, ‘‘দাঁড়িয়ে দেখছ কী, বরফ আনাও।’’ এক দিন বাবা রাতে ফিরে জানতে চাইলেন, ‘অমিয় গান সেধেছে’? মা বললেন, ‘না’। তখন কান ধরে তুলে গানে বসালেন। তখন এমন শাসন ছিল...। শ্যাম গঙ্গোপাধ্যায় আমাকে কপালে দাগ দেখিয়ে বললেন, এই যে দাগটা দেখছ, এটা আলাউদ্দিনের লাঠিতে হয়েছে।

প্রশ্ন: আপনার বাবা সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় দুর্দান্ত সেতার বাজাতেনরবিশঙ্কর আপনাকে সেতার বাজানোর কথা বলেছিলেন। আপনি সেতার বাজালেন না কেন?

অমিয়রঞ্জন: আমি বুঝতে পেরেছিলাম, বাবার মতো কখনও হতে পারব না। বছর পাঁচেক সেতারের তালিম নিয়ে আর চালিয়ে যাইনি। একদিন জ্ঞানবাবুর বাড়ির কাছে গল্প করছি। রবিশঙ্কর এসেছেন। জ্ঞানবাবু ওঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে বললেন, এ হচ্ছে সত্যকিঙ্করবাবুর ছেলে। ভাল গান করে। রবিশঙ্কর বললেন, ‘‘আপনি সত্যকিঙ্করবাবুর ছেলে, সেতার বাজালেন না!’’ এখান থেকে বোঝা যায় উনি কী চোখে দেখতেন বাবার সেতার।

প্রশ্ন: আপনার তানকর্তব খুব বিখ্যাত। অজয় চক্রবর্তীও আপনার কাছে বিশেষ তালিম নিয়েছেন। একটু বলবেন?

অমিয়রঞ্জন: আমার তানের প্রভাব পড়তেই পারে উদীয়মান শিল্পীর গানে। সবাই পারে না। দুরন্ত বেগে সবাই পারে না তান করতে। অজয় নিয়েছিল। প্রতিভা ছিল। কোনও সন্দেহ নেই। আমি ছেলেবেলায় নারায়ণরাও ব্যাসের তান অনুসরণ করতাম। বম্বেতে একজায়গায় গান ছিল। গান হচ্ছে। বড় বড় উস্তাদ এসেছেন। গান করতে করতে হঠাৎ দেখি, নারায়ণরাও ব্যাস এসেছেন শুনতে। নারায়ণরাওয়ের সামনে আমি গান করছি! নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম। এটা একটা উপলব্ধি। গান শোনা নিয়ে একটা গল্প বলি, হীরাবাঈ বরদেকরের গান ছিল। বডোদরার মিউজ়িক কলেজে। সেখানে নানাজি বলে এক ভদ্রলোক খুব মাথা নাড়ছেন। যত বার উনি সুর লাগাচ্ছেন, তত বার নানাজি মাথা নাড়িয়ে এমন ভাব করছেন, যে মাথা খুলে যাবে বলে মনে হচ্ছে। গান হয়ে গেল, নানাজি বললেন, ‘‘অভি আপ মেহেরবানি করকে জয়জয়ন্তী শুনাইয়ে।’’ হীরাবাঈ বললেন, ‘‘তো ম্যায়নে ক্যায়া শুনাইয়া!’’ কত রকম শ্রোতা যে দেখতে পাওয়া যায়! আমি শ্রোতাদের স্টাডি করতাম খুব। কেমন মাথা নাড়ে, কোন জায়গায় মাথা নাড়ে— এ সব লক্ষ করতাম।

১০০ বছর বয়সেও সকালে রিয়াজ় করেন অমিয়রঞ্জন।

১০০ বছর বয়সেও সকালে রিয়াজ় করেন অমিয়রঞ্জন। ছবি: সংগৃহীত।

প্রশ্ন: এখন শ্রাব্যের সঙ্গে অবধারিত ভাবে এসে পড়ে দৃশ্য। যার স্থায়িত্ব কয়েক সেকেন্ড কি কয়েক মিনিট। এই যুগে ঘণ্টাখানেক ধরে খেয়াল গান লোকে শুনবে? না কি ধ্রুপদ থেকে খেয়ালের মতো আবার খেয়াল থেকে ছোট খেয়াল, অতি ছোট খেয়ালে পরিণত হবে?

অমিয়রঞ্জন: না। সস্তায় খেয়াল হবে না। খেয়ালের যে বিগ্রহ, তা অটুট থাকবে ভবিষ্যতে। এটা আমার নিজের বিশ্বাস। খেয়ালকে সরানো যাবে না। তা না হলে এখনও আমির খান প্রাসঙ্গিক থাকতেন? আমির খানকে কম সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছে? জ্ঞানবাবুর বাড়িতে আমির খান এসেছেন। হাতেগোনা গুণী শ্রোতাদের ডাকা হয়েছে। সেখানে পাহাড়ী সান্যালের মতো লোক গান শুনে বললেন, ‘‘শ্যামবাজার থেকে ঘুরে এসেও দেখব, আমির খান পঞ্চমে দাঁড়িয়ে আছেন।’’ শুরুর দিকে ওঁর গান লোকে নেয়নি। অনেক পরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে।

প্রশ্ন: গুলাম আলি খাঁ সাহিবকে নিয়ে কিছু বলবেন, যা আপনি দেখেছেন?

অমিয়রঞ্জন: একটা গল্প বলি। একটা অনুষ্ঠানে এসে উনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘লালাবাবু কাঁহা হ্যায়? উনকে সাথ ভেট করনে চাহিয়ে।’’ সংস্থার এক ব্যক্তি জানালেন, লালাবাবু ভিতরে রয়েছেন। উনি ভিতরে গিয়ে লালাবাবুর সামনে দাঁড়াতে লালাবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘আপ কৌন হ্যায়?’’ গুলাম আলি বললেন, ‘‘গুলাম আলি খাঁ। লাহৌর সে আয়ে হুয়ে হ্যায়। ম্যায়নে আপকো চিঠি দিয়া। ইয়াদ নেহি?’’ লালাবাবু বললেন, ‘‘ইস বরসমে প্রোগ্রাম নেহি হোগা। নেক্সট ইয়ার হোগা।’’ গুলাম আলি বললেন, ‘‘দেখিয়ে ইতনা দূর সে আয়ে হুয়ে হ্যায়...।’’ নাম করতে গেলে গুলাম আলি খাঁর মতো হতে হবে। না হলে হবে না। যা-ই হোক, প্রোগ্রাম পেলেন। হাফিজ় আলি খাঁ-র সরোদ শেষ হল। এর পর গুলাম আলি খাঁ-র গান হবে। হাফিজ় আলি উঠে গেলেন। পর্দা পড়ল। গুলাম আলি আসার পর পর্দা সরতে দেখলেন গোটা হল ফাঁকা। একটা লোকও নেই। উনি ভীমপলশ্রী ধরলেন। সে কী সুর! এক আবর্তন হওয়ার পর চোখ খুলে দেখলেন হল ভর্তি। যদি অহঙ্কার থাকত, তা হলে এ জিনিস হত না। সে জন্য নিরহঙ্কার হতে হবে।

প্রশ্ন: আপনার গানে কার কার প্রভাব পড়েছে?

অমিয়রঞ্জন: তারাপদ চক্রবর্তী এবং আমির খান। আমির খানের গান শুনে আমি হতবাক হয়ে যাই। এত ডিটেলে যাওয়া, কেউ দেখাতে পারেনি। কী আশ্চর্য গান। রসোত্তীর্ণ ভাল গান খুব কম শোনা যায়।

প্রশ্ন: এখনও চর্চা করেন?

অমিয়রঞ্জন: আমি সকালে উঠে এখনও আধ ঘণ্টা থেকে চল্লিশ মিনিট রিয়াজ় করি। তবলা নিয়ে বসি। দু’চার জন আসেন শুনতে। ওঁদের সঙ্গে রিয়াজ় হয়ে যায়। নিজেকে কাটাছেঁড়া করি। নিজের পুরনো গান শুনি। তবে সব যে খুব ভাল লাগে, তা নয়। অনেক ভুল ধরা পড়ে। মোটের উপর গানটাকে আমি ধ্যানের মতো নিয়েছি। আমার মধ্যে কোনও গোঁড়ামি নেই। ভাল জিনিসটা আমি সব জায়গা থেকে নিয়েছি।

Amiya Ranjan Bandyopadhyay
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy