বাংলা অ্যালবামের ‘লিসনিং পার্টি’। আয়োজনের কথা দিকে দিকে ছড়াতেই ঘুরতে শুরু করল প্রশ্ন, বিষয়টি কী! কেউ বললেন, এর আগে এমন পার্টির কথা শোনেননি। কেউ আবার বললেন, এর আগে কলকাতা শহরে এমন কিছু হয়নি। কিন্তু কী এই পার্টি?
উপলক্ষ, বাংলা ব্যান্ড ‘ফসিল্স’-এর নতুন অ্যালবামের মুক্তি। অনলাইনে সেই অ্যালবামটি শোনা যাবে ১৩ তারিখ থেকে। তার আগেই হচ্ছে ‘লিসনিং পার্টি’। সেই পার্টি ঘিরেই এত প্রশ্ন।
বিদেশে বিষয়টি নতুন নয়। তবে বাংলায় এমন আয়োজন আগে হয়নি বলে দাবি উদ্যোক্তাদের। অ্যালবামমুক্তির আগেই নির্দিষ্ট একটি স্থানে সকলে মিলে গান শোনার ব্যবস্থা হয়েছে। মোবাইলে বা ল্যাপটপে বন্ধ ঘরে বসে গান শোনা নয়। সকলে এক ছাদের তলায় অ্যালবামটি শোনা এবং উপভোগ করা— একেই বলে ‘লিসনিং পার্টি’। উপস্থিত থাকেন গানের স্রষ্টা ও শিল্পীরা। তবে তাঁরা ‘লাইভ’ গান না। বড় স্পিকারে গানগুলি চলতে থাকে তাঁদের উপস্থিতিতে। ‘ফসিল্স ৭’-এর ক্ষেত্রেও এ বার তেমনটাই হবে।
‘ফসিল্স ৭’-এর জন্য কলকাতা শহরে আয়োজিত ‘লিসনিং পার্টি’।
কিছু দিন আগেই মুক্তি পেয়েছে আমেরিকান পপ গায়ক নিক জোনাসের অ্যালবাম ‘সানডে বেস্ট’। মুক্তির আগে আমেরিকার ৯টি শহরে ‘লিসনিং পার্টি’র আয়োজন করেছিলেন তিনি। ২০২৪ সালে ‘হিট মি হার্ড অ্যান্ড সফ্ট’ অ্যালবাম মুক্তির আগে আমেরিকান গায়িকা বিলি এলিশের ‘লিসনিং পার্টি’ হয়েছিল ব্রুকলিন শহরে। আমেরিকান পপ তারকা টেলর সুইফ্ট প্রায়ই ‘লিসনিং পার্টি’র আয়োজন করে থাকেন। ‘সিক্রেট সেশন’ নামে পরিচিত তাঁর এই পার্টি। নির্বাচিত ভক্তদের এই ‘সিক্রেট সেশন’-এ আমন্ত্রণ জানান টেলর। ২০১৯-এ তাঁর অ্যালবাম ‘লাভার’-এর আগে আয়োজিত ‘সিক্রেট সেশন’ খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল।
বিদেশে ‘লিসনিং পার্টি’ চলছে ৬০-এর দশক থেকে। আমেরিকান শিল্পী জিমি হেন্ডরিক্স ও বব ডিলানও নিজেদের নির্দিষ্ট শ্রোতাদের জন্য ‘লিসনিং পার্টি’র আয়োজন করতেন। তখন অবশ্য এমন আয়োজনের নির্দিষ্ট কোনও নাম ছিল না।
২০১০-এর পরে আমেরিকান তারকা কেনিয়ে ওয়েস্ট, ট্রাভিস স্কটের মতো শিল্পীরাও এমন আয়োজন করেছেন। ব্যান্ডের মধ্যে ‘লিংকিং পার্ক’, ‘মেটালিকা’-ও অনুরাগীদের জন্য গান শোনার ব্যবস্থা করেছেন। সেই পথেই হাঁটছে কি এ বার বাংলা? ফসিল্স-এর ম্যানেজার রূপসা দাশগুপ্ত বলেন, “বিদেশে এমন ‘লিসনিং পার্টি’ হয়েই থাকে। বাংলায় এই প্রথম।”
টেলর সুইফ্টের ‘লিসনিং পার্টি’র নাম ‘সিক্রেট সেশন’। ছবি- সংগৃহীত
দেশে অবশ্য প্রথম নয়। ‘সিধা মৌত’ নামে একটি ব্যান্ড ২০২৪-২৫ সালে বেশ কয়েকটি ‘লিসনিং পার্টি’র আয়োজন করেছে। আনুষ্ঠানিক ভাবে মুক্তির আগে তারা অনুরাগীদের ডেকে গানগুলি শুনে তাঁদের প্রতিক্রিয়া দেখেন। এ ছাড়াও গত কয়েক বছরে ‘হনুমানকাইন্ড’, ‘দ্য ইয়েলো ডায়রি’, ‘কয়ান’ নামে বেশ কিছু ব্যান্ড এই আয়োজন করেছিল। কলকাতায় ‘ফসিল্স’-এর ‘লিসনিং পার্টি’র নেপথ্যেও রয়েছে বিশেষ কারণ। এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত পরিচালক কিউ। তাঁর বক্তব্য, “মন দিয়ে গান শোনার অভ্যাস ক্রমশ চলে যাচ্ছে। ‘লিসনিং পার্টি’র উদ্দেশ্য হল, সবাই একসঙ্গে মন দিয়ে গানটাই শুনবেন। ফোন না ঘেঁটে, অন্য দিকে মন না দিয়ে। স্বাধীন গানবাজনাকে আরও জোর দেয় এই ধরনের আয়োজন।” অর্থাৎ, বদলে যাওয়ার সময়ে গান শোনার জন্য একটি নতুন পরিবেশ ও পরিস্থিতি তৈরি করতেই এই উদ্যোগ।
কারা থাকবেন সেই পার্টিতে?
‘ফসিল্স’ ব্যান্ডের ভক্তদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা হয়েছিল। সেই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বেছে নেওয়া হয়েছে কয়েক জনকে। তাঁদের জন্যই এই ‘লিসনিং পার্টি’র আয়োজন। ব্যান্ডের অন্যতম সদস্য গায়ক ও সঙ্গীতকার রূপম ইসলাম বলেন, “ছবিমুক্তির আগে যেমন ‘প্রিমিয়ার’ হয়, এটাও তেমন। নির্দিষ্ট কয়েক জন অনুরাগী এই দিন অ্যালবামের সব ক’টি গান শুনতে পারবেন। উপস্থিত থাকবেন ‘ফসিল্স’ ব্যান্ডের সদস্যেরা। বিদেশে এই চল রয়েছে। তবে বাংলায় এর আগে এমন হয়নি। আমরাই প্রথম করছি।”
বব ডিলানও এমন আয়োজন করেছিলেন, তখন ‘লিসনিং পার্টি’ এই নাম তৈরি হয়নি।
রূপসা জানান, সাধারণত গ্যারাজ বা একটু অন্য রকম কোনও জায়গায় এই ‘লিসনিং পার্টি’র আয়োজন করা হয়ে থাকে। অন্ধকার পরিবেশ। দৃশ্যায়ন নয়, গান শোনার দিকেই মন থাকে সকলের। এ বারও কি তা-ই হচ্ছে? কিউ জানান, প্রথমে একটি গ্যারাজের কথাই ভাবা হয়েছিল। কিন্তু লোকসংখ্যার কথা মাথায় রেখে ‘রুফটপ’-এ আয়োজন করা হয়েছে। পার্টি যেহেতু, তাই থাকছে খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা। পরিচালকের কথায়, “বাংলার পরিচিত ফুচকা, আলুর দম, রোল, চাউমিন থাকবে। এক ঘণ্টার এই পার্টিতে নির্দিষ্ট আবহও তৈরি করা হবে।”
ব্যান্ডের আর এক সদস্য পম চক্রবর্তীর কথায়, “আমরাও পার্টিটা নিয়ে খুব উত্তেজিত। এ বার শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া সরাসরি দেখতে পাব, তার অপেক্ষায় আছি।”