বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল আগেই।কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব(কেআইএফএফ) কমিটির নতুন চেয়ারম্যান পদে পরিচালক রাজ চক্রবর্তীনিযুক্ত হওয়ার পরেই টলি মহলে গুঞ্জন উঠেছিল। এর আগে এই পদে ছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ প্রসঙ্গে প্রসেনজিৎ বলেছিলেন, ‘‘আমাকে যে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা অফিশিয়ালি জানানো পর্যন্ত হয়নি।আমি জেনেছি মিডিয়ার কাছ থেকে।’’ কেআইএফএফ-এর ২৫তম বর্ষের নতুন সংযোজন পরামর্শদাতা কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হয়। জানা যায়, ওই কমিটির তালিকায় উল্লেখযোগ্য সংযোজন অভিনেতা-পরিচালক অপর্ণা সেন।

রবিবার এই প্রসঙ্গে অপর্ণা বলেন, ‘‘আমাকে যদি অ্যাডভাইসরি কমিটির সদস্য হওয়ার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয় তাহলে তা আমাকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। প্রথমত, আমাকে না জিজ্ঞাসা করে কোনও কমিটিতে নাম জুড়ে দেওয়াটা সত্যি বিস্ময়কর। দ্বিতীয়ত, আমার যা যোগ্যতা তাতে আমাকেই চেয়ারপার্সন করা হবে, সেটাই প্রত্যাশিত। তবে যোগ্যতা এবং দক্ষতার নিরিখে কেউ যদি আমার চেয়েও উঁচু মানের হন, সে ক্ষেত্রে আমার কিছু বলার থাকে না। তৃতীয়ত, নতুন ছবির কাজ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত আমি। হাতে সময় নেই।’’ অপর্ণার ওই বক্তব্যের পরেই কথা উঠেছিল, তবে কি নাম না করে রাজ চক্রবর্তীর যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুললেন তিনি?

সোমবার আনন্দবাজার ডিজিটালের পক্ষ থেকে রাজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘‘অপর্ণা সেন আমার থেকে বয়সে বড়। আমরা ওঁকে দেখে বড় হয়েছি। ওঁর সিনেমাও আমার খুবই পছন্দের। অভিনেত্রী হিসেবে যতটা পছন্দের, পরিচালক হিসেবেও ওঁকে শ্রদ্ধা করি আমি। ওঁর প্রতিটি কথার মূল্য রয়েছে আমার কাছে। তবে উনি কী ভাবছেন বা কী বলছেন সেটা ভাবার থেকেও আমার কাছে এখন অনেক বেশি মূল্যবান, আমায় যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তা ঠিকঠাক পালন করা। একজন চেয়ারম্যান হিসেবে কী কী করা উচিত সে সবই বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছি।’’

 

ফিরে দেখা কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

কিন্তু অপর্ণা তো ‘সিনিয়রিটি লেভেল’ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন! রাজের জবাব:‘‘ওঁর ভাবনাকে কোনও ভাবেই কনফ্লিক্ট করতে চাইনা আমি। এটা ওঁর ভাবনা, উনি বলেছেন। কিন্তু আমার মনে হয়, প্রথমেই জুনিয়র অথবা সিনিয়রের মাপকাঠি বিচার না করে কাজটা শুরু হওয়ার পরেই তাঁকে বিচার করা উচিত।’’ পাশাপাশি রাজের সংযোজন:‘‘যে কোনও ক্ষেত্রেযখনই নতুন কেউ এসেছেন তখনই খুব সহজে তাঁকে গ্রহণ করা হয়নি। কাজ দিয়েই প্রমাণ করতে হবে কতটা কী পারি।’’

নাম নেওয়া হয়নি ঠিকই,কিন্তু রাজের যোগ্যতা নিয়েই কি পরোক্ষে প্রশ্ন তোলা হয়নি? রাজ বলেন, ‘‘আমার যোগ্যতা অথবা দক্ষতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতেই পারেন। কারণ তিনি তো আমাকে ব্যক্তিগত ভাবে চেনেন না। আমায় কতটুকু জানেন তিনি? ব্যক্তি হিসেবে আমি কেমন? আমার কী ভাবনাচিন্তা? অথবা আমি কী পড়াশোনা করি, কী সিনেমা দেখি, সেটা তো আমি প্রকাশ করে বেড়াই না! যাঁরা আমাকে ভরসা করে দায়িত্ব দিয়েছেন তাঁরা বুঝেশুনেই দিয়েছেন বলে আমার মনে হয়। আমার এখন একটাই কাজ, তা হল চুপচাপ নিজের কাজ করে যাওয়া। কাজটা করতে গেলে যেটা সবথেকে বেশি দরকার তা হল সবার সহযোগিতা। এটা ফিল্ম ফেস্টিভাল। যুদ্ধের বা রাজনীতির ময়দান নয়। সিনেমা নিয়ে ঝগড়া হলেও চেয়ার নিয়ে ঝগড়া করা যায় নাকি! আর চলচ্চিত্র উৎসবে যে সিনেমাগুলি দেখানো হবে তার নির্বাচন বিজ্ঞ মানুষরা মিলেমিশেই করবেন।’’

আরও পড়ুন: ‘ইন্ডাস্ট্রিতে পজিশন দিয়ে আমার শিল্পের বিচার হয় না’

 

মেনস্ট্রিম সিনেমার পরিচালক কী করে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের চেয়ারম্যান হতে পারেন? এই প্রশ্নও উঠেছে টলিউডের অন্দরে। উত্তরে রাজ বললেন, ‘‘আমার কোনও সিনেমা কিন্তু ওখানে দেখানো হবে না। আর শুধু কমার্শিয়াল ছবি কেন! নানা ধরনের ছবি বানাই আমি। আর লোকে আমায় দেখতে আসবে না, সিনেমা দেখতে আসবে।’’

 

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এবং রাজ চক্রবর্তী

এই যে এত বিতর্ক উঠছে, কী মনে হয় সহযোগিতা পাবেন আপনি? ‘‘হ্যাঁ, সবাই কোঅপারেট করবেন। আর তা ছাড়া অপর্ণাদিও বলেছেন যে ওঁকে চেয়ারপার্সন করা হলে উনি সময় দিতে পারতেন না। ওঁকে প্রস্তাব দেওয়া হলে হয়তো উনি তা গ্রহণ করতেন না। তার থেকে চলচ্চিত্র উৎসব যাতে ভালভাবে হয় সে দিকে  সবাই মিলে নজর দেওয়া উচিত। এ বছর পঁচিশে পা দেবে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব। তা যাতে আন্তর্জাতিক মানের হতে পারে সেটাই একমাত্র লক্ষ্য এখন। যাঁরা সিনেমা ভালবাসেন, যাঁরা সিনেমার জন্য সবকিছু করতে রাজি তাঁদের নিয়েই সফল হবে এই ফিল্ম ফেস্টিভাল। সেখানে আমি বা অন্য কোনও ব্যক্তি মুখ্য নন। আমি না থাকলেও কিছু যায় আসে না। বা অন্য কেউ না থাকলেও কিচ্ছু ফারাক পড়ে না। প্রচুর ভাল ভাল মানুষ কমিটিতে রয়েছেন। আমিও এই দায়িত্ব পাওয়ার পর অনেক নতুন কিছু শিখব।’’

আরও পড়ুন: কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব কমিটির নতুন চেয়ারম্যান রাজ চক্রবর্তী

এত বড় একটা দায়িত্ব। আত্মবিশ্বাস কতটা? রাজের মন্তব্য:‘‘আমি কনফিডেন্ট বয়। যাঁরা কনফিডেন্ট নন তাঁরা এত কিছু বলছেন! আর যাঁরা কনফিডেন্ট তাঁরা আমার সঙ্গে রয়েছেন।’’বললেন,‘‘আন্তর্জাতিক মানের সিনেমা দেখানো হবে। বিশিষ্ট জনের ভিড় লেগে যাবে। সিনেমা নিয়ে আড্ডা হবে। রাগ-অভিমান ভুলে গিয়ে টলিউড মিলেমিশে এক হয়ে যাবে আবার। যাঁরা সময় দিতে পারছেন না বলছেন, তাঁরাও থাকবেন,দেখে নেবেন। দরকার হলে তাঁদের সঙ্গে আমি নিজে গিয়ে কথা বলব। সব থেকে ভাল ফিল্ম ফেস্টিভাল হতে চলেছে আগামী কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব।’’