Advertisement
E-Paper

গ্রামে বলত ‘পোয়েনজিৎ’-এর সিনেমা এসেছে, প্রযোজক বুম্বাদাকে প্রথম বার কিছু বলতেই পারিনি: বিমল

সদ্য মুক্তি পেয়েছে সৌরভ পালোধী পরিচালিত নতুন ছবি ‘অনেকদিন পর’। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিমল গিরি। গ্রাম থেকে শহরে আসা, নিজের অভিনয়যাত্রার কাহিনি বললেন অভিনেতা।

উৎসা হাজরা

শেষ আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬ ১০:৪৫
গ্রামের ছেলে বিমলের টলিউডযাত্রার কাহিনি।

গ্রামের ছেলে বিমলের টলিউডযাত্রার কাহিনি। ছবি: সংগৃহীত।

মেদিনীপুরের কুমারদা গ্রামে তাঁর বড় হয়ে ওঠা। গ্রামেই শখে যাত্রা করতেন তাঁর বাবা। সেখান থেকে অভিনয়ের প্রতি অল্প অল্প ভালবাসার সৃষ্টি। গ্রামের ছেলে বিমল গিরি কী ভাবে পৌঁছোলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের ঠিকানায়?

প্রশ্ন: ছোটবেলা তো কেটেছে গ্রামে। কবে, কখন শহরে চলে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন?

বিমল: পশ্চিম মেদিনীপুরের কুমারদা গ্রামের ছেলে আমি। ওখানেই বড় হয়েছি। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পাশ করার পরে কলকাতায় আসি। তবে অভিনয় করব বলে শহরে আসছি, বিষয়টা এমন ছিল না কিন্তু।

প্রশ্ন: অভিনেতা হবেন, এই সিদ্ধান্ত ঠিক কখন নিয়েছিলেন?

বিমল: বাবা গ্রামে অল্পবিস্তর যাত্রা করতেন। সেটা দেখেছি। আমিও স্কুলে ছোটখাটো নাটক করেছি। কলকাতায় আসার পরে হঠাৎই ‘স্বপ্নসন্ধানী’ দলের সঙ্গে যুক্ত হই। নাটক করার ইচ্ছেটা হঠাৎই এক দিন মনে এসেছিল। তার পরে বাবানদা মানে কৌশিক সেনের দলে যুক্ত হওয়ার সুযোগও পেয়ে যাই।

প্রশ্ন: সেই সুযোগ কী ভাবে এসেছিল?

বিমল: আমি তখন ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। সেই সময়েই অনেকগুলো দলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলাম। আমার এক বন্ধু বাবানদার (কৌশিক সেন) ফোন নম্বর দিয়েছিল। নম্বর পাওয়ার পরে বেশি কিছু ভাবিনি। ফোন করে ফেলেছিলাম। তখন তিনি আমাকে দেখা করার জন্য ডেকেছিলেন। তার পর এক দিন গিয়ে কথাবার্তা বলি। সেই সময় ‘আন্তিগোনে’র প্রস্তুতিপর্ব চলছে। তখনই যোগ দিই ‘স্বপ্নসন্ধানী’ দলে। সেখান থেকে আমার অভিনয়ের যাত্রা শুরু।

প্রশ্ন: নাটকের দলে যোগ দেওয়ার পরেই কি ঠিক করলেন অভিনয়কে পেশা হিসাবে বেছে নেবেন?

বিমল: আসলে ‘স্বপ্নসন্ধানী’-তে যোগ দেওয়ার আগে কোনও ধারণাই ছিল না আমার এই বিষয়ে। ওখানে অনেকগুলো প্রোডাকশনে কাজ করেছি। তার পরে মনে হয়েছিল অভিনয়কে পেশা হিসাবে বাছব। দল থেকে অনেক সুযোগও পেয়েছিলাম। প্রায় ১২ বছর হয়েও গেল এই পেশায়।

প্রশ্ন: বাবা যদিও অল্পবিস্তর অভিনয় করতেন গ্রামে। কিন্তু রোজগারের উৎস তো অভিনয় ছিল না, সে ক্ষেত্রে পরিবারকে কী ভাবে বুঝিয়েছিলেন যে আপনি অভিনেতা হতে চান?

বিমল: আমাকে না আলাদা করে মা-বাবাকে কখনও কিছু বোঝাতে হয়নি। আমার দিদিও আছে। এক দিন বলেছিলাম যে, আমি কী করতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে ওঁরা মেনেও নিয়েছিলেন। কোনও কিছু বোঝাতেই হয়নি আমাকে।

এই নতুন ছবির সুযোগ এল কী ভাবে?

এই নতুন ছবির সুযোগ এল কী ভাবে? ছবি: সংগৃহীত।

প্রশ্ন: অনেকেই বলেন যে, অভিনয় অনিশ্চিত পেশা। তথাকথিত চাকরি করবেন না শুনে কোনও প্রতিক্রিয়া পাননি পরিবারের থেকে?

বিমল: এ ক্ষেত্রে সত্যিই আমি ভাগ্যবান। মা-বাবার একমাত্র ছেলে আমি। সংসার চালাতে হবে, বাড়িতে টাকা পাঠাতে হবে। এ সব বলে আমাকে কোনও দিন চাপ দেননি ওঁরা। এখনও সেই চাপ আমার নেই। কিন্তু এখন কিছু কিছু দায়িত্ব আমি নিই। আসলে চাপ ছিল না বলেই খুব শান্ত মনে এগিয়ে যেতে পেরেছি।

প্রশ্ন: নাটকের মঞ্চ, তার পর স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি, ওয়েব সিরিজ়। সৌরভ পালোধীর ‘অনেকদিন পর’ ছবির প্রস্তাব এল কী ভাবে?

বিমল: আমি এই কাজ পেয়েছি ‘অডিশন’ দিয়েই। এর আগে সৌরভদার সঙ্গে আমার আলাপ ছিল না। ওঁর নাটক দেখেছি। আগের ছবি ‘অঙ্ক কি কঠিন’ দেখেছিলাম। কিন্তু আগে কখনও কথা হয়নি। সৌরভদার মেসেজটাও আমার ফোনে ঢুকেছিল হঠাৎ করে। বলেছিল, ‘অডিশন’ দিতে হবে। আমি ভিডিয়ো করে পাঠিয়েছিলাম। তার পরে বেশ কিছু পরিবর্তনও করতে দিয়েছিল। সেগুলো করে পাঠিয়েছিলাম। তার পর আমি আর কোনও মেসেজ পাইনি। ভেবেছিলাম কাজটা হবে না।

প্রশ্ন: তার পর কী হল?

বিমল: এক দিন ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার এক বন্ধু একটা ‘স্ক্রিনশট’ পাঠিয়েছে। ছবি-ঘোষণার খবর ছিল। সেখানে আমার নাম লেখা ছিল। আমি তো পুরো অবাক হয়ে যাই। তার পরেই সৌরভদার টিমের তরফে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সেই শুরু হল নতুন যাত্রা।

বিমলের প্রথম প্রসেনজিতকে দেখার মুহূর্ত কেমন ছিল?

বিমলের প্রথম প্রসেনজিতকে দেখার মুহূর্ত কেমন ছিল? ছবি: সংগৃহীত।

প্রশ্ন: ইদানীং তো সমাজমাধ্যমে ফলোয়ার্স, রিল ভিডিয়োয় লাইক ছাড়া নাকি নতুন কাজই পাওয়া যায় না। কিন্তু আপনি তো খুব একটা সক্রিয় নন সমাজমাধ্যমে।

বিমল: হ্যাঁ। ফলোয়ার্স, ভিউ, লাইক— অনেক কথাই তো শুনি। বিশেষত নতুন যাঁরা এই পেশায় কাজ শুরু করছেন, তাঁদের থেকে বেশি শুনি। আমারও প্রথমে ধারণা ছিল যে, অভিনয় মানেই এমন চাকচিক্য, গ্ল্যামার আর অনেক টাকা। নাটকের দলে যোগ দেওয়ার পরে বাস্তবটা বুঝতে পেরেছি। আমি তো বলব, এখানে ভাল কাজ করলে তার নিরিখেই কাজ পাওয়া যায়। সবসময় সমাজমাধ্যমের ‘ট্রিক’ কাজ করে না। আর ধৈর্য একটা বড় বিষয়। ওটা আমার আছে। তাই হয়তো ‘অনেকদিন পর’ ছবির সুযোগও এসেছিল আমার কাছে আচমকাই। এখানে অবশ্য সৌরভদাও খুব সৎ ভাবে শিল্পীদের বেছেছেন। যেখানে কোনও পক্ষপাতের জায়গা ছিল না।

প্রশ্ন: এই কাজটা করে নতুন কী পেলেন?

বিমল: এখানে তো আমার কাছে সবই নতুন। সহ-অভিনেত্রী চিত্রাঙ্গদা শতরূপা থেকে পুরো টিম— সবাই নতুন। প্রযোজনা সংস্থা ‘এন আইডিয়াজ়’ নতুন। আর প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়— তাঁকে এ ভাবে পাওয়া, সেটাও তো নতুনই আমার কাছে।

প্রশ্ন: নিশ্চয়ই ছোটবেলায় গ্রামে দেখেছিলেন প্রসেনজিতের অনুষ্ঠান?

বিমল: হ্যাঁ, অবশ্যই। মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে বুম্বাদার শো দেখতে যেতাম আমরা। আমাদের গ্রামে বাসন্তীপুজো হয় খুব বড় করে। তখন ওখানে প্রায় ১৪ দিনের মেলা বসে। সেখানে দু’দিন যাত্রা হয়। দু’দিন সিনেমার তারকা বা সিরিয়ালের অভিনেতারা আসেন শো করতে। বেশ জাঁকজমক করে উৎসব হয়। সেখানে অনেক শিল্পীকে দেখেছি। সেখানেই বুম্বাদাকে প্রথম দেখেছি।

প্রশ্ন: গ্রামের মঞ্চে দেখা ‘সুপারস্টার’ প্রসেনজিৎ থেকে প্রযোজক বুম্বাদাকে পাওয়া— অভিজ্ঞতা কেমন?

বিমল: ছোটবেলায় গ্রামে সবাই বলত আজ টিভিতে ‘পোয়েনজিৎ’-এর সিনেমা দিয়েছে। তখন ভাবমূর্তি একেবারেই অন্যরকম ছিল। সুপারস্টার, যাঁকে টিভিতে দেখা যায়, তিনি আমার সামনে। সত্যিই তারকা। সেই তারকা আমার প্রযোজক, এটা ভাবতেই বেশ কিছু ক্ষণ সময় লেগেছিল।

প্রশ্ন: এই ছবির মাধ্যমেই কি প্রসেনজিতের সঙ্গে আপনার প্রথম আলাপ?

বিমল: হ্যাঁ। বুম্বাদার বাড়িতেই চিত্রনাট্য পড়া হত। প্রথম দিন ওঁর বাড়িতে সৌরভদা, চিত্রাঙ্গদার সঙ্গে বসে আমরা চিত্রনাট্য পড়ছিলাম। কিছু ক্ষণ বাদে এক জন এসে বললেন বুম্বাদা আমাদের সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন। আমি তো বেশ নার্ভাসই হয়ে গিয়েছিলাম। এমনিও আমি একটু লাজুক প্রকৃতির। তার পর গেলাম বুম্বাদার ঘরে, মানে অফিসে। ওঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার পরে একটাই কথা বলেছিলাম, “থ্যাঙ্ক ইউ”। আর কোনও কথা বলিনি। তার পর চিত্রাঙ্গদা আর সৌরভদা কথা বলেছিল বাকি। আসলে এই প্রথম এত বড় চরিত্র পাওয়া। সবটাই নতুন। উত্তেজনা, চিন্তা অনেক অনুভূতি একসঙ্গে কাজ করছিল।

প্রশ্ন: কলকাতায় আপনার পরিবারে কে কে আছেন?

বিমল: আমি, আমার স্ত্রী। আর শ্বশুর-শাশুড়ি থাকেন। এখানে একটা কথা বলি, ওঁরাও কখনও আমার উপরে চাপ দেননি। মানে এমন কোনও চাপ ছিল না যে, রাতারাতি প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা না হলে মেয়ের বিয়ে দেবেন না আমার সঙ্গে। তাই হয়তো ধীরে ধীরে এগোতে পেরেছি।

ভবিষ্যৎ নিয়ে কি চিন্তা হয়?

ভবিষ্যৎ নিয়ে কি চিন্তা হয়? ছবি: সংগৃহীত।

প্রশ্ন: বাংলা ছবির ব্যবসা হচ্ছে না। শিল্পের সঙ্গে রাজনীতি মিশে যাওয়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা হয় না?

বিমল: না হয় না। কারণ, আমার বিলাসবহুল জীবনধারণের চাহিদা নেই। এখনও ভাবি, যদি এই শহরে টিকে থাকতে না পারি, তা হলে গ্রামে চলে যাব। সেখানে ঠিক কিছু একটা করে চালিয়ে নেব জীবন। এই ভাবনাতেই বাঁচি আমি।

Tollywood Prosenjit Chatterjee Actor

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy