বাংলা সিনেমায় তিনি পাওয়ার হাউজ়। সোনালি অতীত ছুঁয়ে এভারগ্রিন। এনার্জিতে ঠিক যেন রকস্টার। সিনেমা না দেখে আজও ঘুমোতে যান না। নতুন অভিনেতাদের দেখে শিখে নেন অভিনয়ের নতুন ভাষা। স্বপ্ন দেখেন বাংলা সিনেমার ছোট পাড়া থেকে আন্তর্জাতিক স্তরে উড়ান, কখনও থামবে না। বিশ্বাস করেন, ইন্ডাস্ট্রির স্বার্থ সবার উপরে, তাহার উপরে নাই। তিনি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। সম্প্রতি আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে ভিডিয়ো সাক্ষাৎকারে নানা বিষয়ে কথা বললেন অভিনেতা।
অভিনয়ের বাইরে আর কী করতে ভালবাসেন ব্যক্তি প্রসেনজিৎ? এ প্রসঙ্গে অভিনেতা বলেন, ‘‘একটা জিনিস আমি করতে খুব ভালবাসি, সেটা হল এক্সারসাইজ়। দিনে অন্তত দেড় থেকে দু’ঘণ্টা এক্সারসাইজ় করি। ওটা আমার মানসিক চাপ কমায়, যে ভাবনাগুলো সারাক্ষণ চলে সেটা তখন সরে যায়। আমার একটা রুটিন চলে। সপ্তাহে সাত দিনও এক্সারসাইজ় করি। রাত বারোটাতেও অনেক সময় আমি জিমে চলে যাই, কারণ সকালে বেরোনোর থাকে। আর জিমে যে গান চলে সেই গান শুনি না, পুরোনো দিনের গান শুনতে শুনতে জিম করি। মহম্মদ রফি শুনি, কিশোর কুমার শুনি। আবার হেমন্তজেঠুর (হেমন্ত মুখোপাধ্যায়) গান, শ্যামলজেঠুর (শ্যামল মিত্র) গানও আমার প্লে-লিস্টে থাকে। আর আমার ছেলে জিম করছে কি না, সেটা পাড়ার লোকেরাও জানতে পেরে যান।’’
কাগজের গন্ধ না পেলে চিত্রনাট্য মনে হয় না: প্রসেনজিৎ। ছবি: সংগৃহীত
বই পড়ারও নেশা রয়েছে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের। নায়ক যোগ করেন, ‘‘বই পড়তে খুব ভালবাসি। তবে বইয়ের থেকে বেশি চিত্রনাট্য পড়তে হয় আমায়। অবশ্যই সফ্ট কপিও থাকে, কিন্তু আইপ্যাড বা ল্যাপটপে আমি চিত্রনাট্য পড়তে পারি না। আসলে ওই কাগজের গন্ধ না পেলে চিত্রনাট্য পড়ছি মনে হয় না। আমি সিনেমা না দেখে ঘুমোতে পারি না। আমার চোখটা জুড়ে আসে ছবি দেখতে দেখতে। মিশুক যখন হয়নি, তখন টিভি চালাতে পারতাম না। অনিল কাপুরের কাছ থেকে একটা ছোট্ট জিনিস দেখেছিলাম, যেটায় সিডি দিয়ে সিনেমা দেখা যেত। তখন কম্বলের তলায় লুকিয়ে ওটার মধ্যে করে সিনেমা দেখতাম যাতে অর্পিতার বিরক্তি না হয়।’’
জীবনের কঠিন সময়ের কথা বলতে গিয়ে নস্টালজিক প্রসেনজিৎ। ব্যক্তিগত জীবনে একটা সময় নিজেকে একেবারে গুটিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। নায়ক মনে করান, ‘‘আসলে আমরা অভিনেতারা সময়ের সঙ্গে, বয়সের সঙ্গে পরিণত হই। তার মধ্যে নিজের জীবনের সফরগুলোও আছে। ভাঙা, ওঠা, নিজের জীবনবোধগুলোও আছে। যেমন আমিও দু’বছর নিজেকে বন্দি করে নিয়েছিলাম। আসলে অভিজ্ঞতাগুলো পরবর্তী কালে অভিনয়ের ক্ষেত্রেই কাজে লাগে।’’
কোন ধরনের সিনেমা পছন্দ করেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়? নায়ক বলেন, ‘‘সব ভাষার ছবিই দেখি, শুধু ভাল লাগার জন্য নয়। এখনকার বাংলা ছবি মুক্তি পেলেই চেষ্টা করি দেখতে। এই প্রজন্মের কাজ তো দেখতেই হবে। তবেই তো সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারব। এখনকার ছেলেমেয়েরা কী ভাবে অভিনয় করছে, পরিচালকদের গল্প বলার ভাষা আলাদা হয়েছে, তা দেখার জন্যও ছবি দেখি এবং শিখি। ছবি বিশ্বাস, উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়— তাঁরা এক একজন প্রতিষ্ঠানের সমান। কিন্তু আজকের দিনে ঋত্বিক চক্রবর্তী আমার কাছে একটা অধ্যায়। ওর কাজ দেখে শিখি। সোহিনী অসামান্য অভিনেত্রী। ওদের কাজ দেখে মনে হয়, এ বাবা আমার তো হচ্ছে না, এ তো অন্য ভাষায় কথা বলছে।’’
প্রসেনজিৎ পুজোর সময়ে আলাদা করে কিছু করেন না। সেই সময়ে বাড়িতে ছবি দেখেন। তিনি বলেন, ‘‘আমি সিরিজ় করে ছবি দেখি। টানা সাত দিন উত্তমকুমারের ছবি দেখলাম, আবার হয়তো তপন সিনহার তৈরি ছবি দেখলাম। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিভিন্ন কাজ আবার টানা দেখলাম। ধরন বুঝতেও সুবিধা হয়। কমল হাসনের কাজ দেখলে মনে হয়, কী করলাম জীবনে? ‘মেঘে ঢাকা তারা’ দেখলে একটা শক্তি পাই। মনে হয়, কত কাজ করা বাকি। কত শেখা বাকি, ইন্ডাস্ট্রিকে কত কিছু দেওয়া বাকি রয়ে গেল এখনও।
পুজোয় সারাদিন বাড়িতে বসে সিনেমা দেখি: প্রসেনজিৎ। ছবি: সংগৃহীত
অভিনেতা যোগ করেন, ‘‘গত দশ বছরে বাংলায় অনেক ভাল ছবি তৈরি হয়েছে। আমরা ‘বাহুবলী’ তৈরি করতে পারব না, কিন্তু একটা ‘চোখের বালি’ তৈরি করতে পারি। বাংলায় ভাল নাটক হলে, তা দু’ঘণ্টার মধ্যে হাউসফুল হয়ে যায়। সেটাও তো দর্শকই সম্ভব করেন। আমি অনেক রাউন্ড টেবিলে বসি, যেখানে ছবি নিয়ে আলোচনা হয়। ফলে আমি জানি, সমগ্র চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিই একটা কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আমার বিশ্বাস মূল ধারার ছবি আবার ফেরত আসবে।’
শিল্পে বা ছবিতে রাজনীতি ফিরে ফিরে এসেছে বারবার। নায়কের মতে, ‘‘সিনেমা, নাটক, চিত্র—সব ক্ষেত্রেই স্বাধীনতা থাকা প্রয়োজন। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমার সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের যখনই দেখা হয়েছে, অভিনয় নিয়েই কথা হয়েছে। আমি সমগ্র ইন্ডাস্ট্রি হিসাবে ভাবলে, তার উন্নতির জন্য রাজনৈতিক জায়গায় যাঁরা আছেন তাঁদের সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন হয়। কোনও রাজনৈতিক দল করা নয়, আমার ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচাতে গেলে এদের কাছে গিয়ে বলতে হবে। এটা তো কোনও অপরাধ নয়। আমি ব্যক্তিগত ভাবে মোহনবাগানকে সমর্থন করতে পারি বা ইস্টবেঙ্গলকে সমর্থন করতে পারি, কিন্তু আমার ছবি দেখতে তো সবাই আসেন।’’