রাত তখন প্রায় সাড়ে ১১টা। গান্ধী কলোনির রাস্তা দিয়ে যেখানে গাড়ি থামল, সেখানেই ছোট গলিটা। নির্জন রাস্তা। সেখানে পৌঁছে ফোন করতেই তিনি বললেন, ‘‘আমার বাড়ির কাছে কিন্তু গাড়ি আসে না। তুমি গলির ভিতর দিয়ে হেঁটে একটু কষ্ট করে আসতে পারবে তো? ফোনেই থাকো তা হলে।’ অবশেষে পাড়ারই এক জনের সাহায্য নিয়ে পৌঁছনো গেল তাঁর বাড়ি।
আগন্তুক সাংবাদিকের অপেক্ষায় তত ক্ষণে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছেন তিনি, যাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হয়েছে টলিউডের ফেডারেশনের পূর্বতন ‘মাথা’ স্বরূপ বিশ্বাসকে। পরনে লাল রাতপোশাক, চাদরের মতো করে নেওয়া ওড়না। চোখে চশমা, আর কপালে ছোট্ট লাল টিপ। ঠিক যেমন করে রাত হলে সদর দরজার বাইরে সন্তানের জন্য অপেক্ষা করেন এক মা।
বাড়ির নীচতলায় এক কামরার ঘর। বাইরে একচিলতে ড্রইং রুম। সেখানে বসে প্রথমেই শুরু করলেন, ‘‘আমি প্রায় খেয়ে শুয়েই পড়েছিলাম। আগামিকাল আমার ভোরে ওঠা। প্রায় ৯ বছর পর শান্তিতে শুটিংয়ে যাব।’’ বলতে বলতেই চোখে যেন আনন্দের তরঙ্গ বয়ে গেল।
‘আমি সংসার চালাতে পারছিলাম না’ ছবি: সংগৃহীত
:
একাই থাকেন তিনি। চার বছর আগে স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। বড় মেয়ে ডান্সার। দু’বছরের নাতনি আছে তাঁর। ছোট মেয়ে মডেলিং করেন। তাঁরাই মায়ের দেখভাল করেন এখন। ‘‘বড় মেয়ে কিছুদিন আগেই স্বামীকে হারিয়েছে। আমি মেয়েদের ভরসায় আর কতদিন থাকব? ওঁকেও তো সাহায্য করতে পারিনি আমি। আমি সংসার চালাতে পারছিলাম না।’ বলতে বলতেই চোখে জল ভরে এল তাঁর। তারই মাঝে জানালেন, বাড়ির মালিক তাঁকে বিপদের সময় অনেক সহায়তা করেছেন।
এর পরেই বলতে শুরু করলেন টালিগঞ্জে তাঁর এতদিনের অভিজ্ঞতার কথা। জানালেন, টালিগঞ্জের ‘সর্বেসর্বা’ স্বরূপ বিশ্বাসের অঙ্গুলিহেলনেই চলত শুটিংয়ের সব কাজ। স্বরূপের গ্রেফতারি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইতেই অভিযোগকারিণী বলেন ওঠেন, ‘‘রাক্ষসটাকে জেলে পৌঁছে দিতে পেরেছি! খুব আনন্দ হচ্ছে! শুধু আমার জন্য নয়, সবার জন্য। ওঁকে দেখলে মন থেকে ঘেন্না লাগত। একটা মানুষ টাকাপয়সার ভোগী, নারীলিপ্সু। মেয়েদের নিয়ে অবৈধ কারবার ছিল। তবে এ বার ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন সূর্য উঠবে। আশা রাখছি, ভাল হবে।’’
ঘরের মেঝেয় একটা গদি পাতা। ছড়ানো দু’টি বালিশ। পাশে রাখা একটি বোতল থেকে এক ঢোক জল খেয়ে ফের শুরু করেন নিজের কাহিনি। বললেন, ‘‘জানেন, আমি ট্রমায় চলে গিয়েছিলাম! ওদের কাছে হাত জোড় করে, পায়ে ধরেও অনুরোধ করেছিলাম একটু কাজ দেওয়ার জন্য। আমি যে অত্যাচার সয়েছি, তা যেন আর কাউকে না সইতে হয়। তার জন্যই এই পদক্ষেপ করা। আমার এক একটা রাত যে কী ভাবে কেটেছে, আমার রাধামাধব (গৃহদেবতা) জানেন। কত রাত ঘুমোইনি।’’ চোখের দু’কোণ চিকিচিক করে ওঠে তাঁর। বলতে থাকেন, ‘‘একটা সাধারণ মা আমি। সংসারে আমার মূল্যই নেই। দিনের পর দিন ভিক্ষা করে খেতে হয়েছে। কেউ চাল দিয়েছেন, কেউ সব্জি দিয়ে গিয়েছেন। ধার করেছি। পাঁচশো টাকা ধার করে চালিয়েছে, কাউকে পাশে পাইনি। আত্মহত্যাও করতে গিয়েছিলাম। করতে পারিনি।’’ হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি। কাঁদতে কাঁদতেই বলতে থাকেন, ‘‘আমার মেয়ের জন্মের সময় আমি সবচেয়ে খুশি হয়েছিলাম। তার চেয়েও বেশি খুশি হয়েছি আজ স্বরূপ বিশ্বাসকে জেলে যেতে দেখে।’’
পরের দিন ‘দেশু৭’-এর শুটিংয়ে ভোরবেলায় কলটাইম। জামাকাপড় গুছিয়ে রাখতে রাখতেই বললেন ‘দেবদা আমার ভিডিয়ো দেখেছিলেন। সেখান থেকেই তাঁর অফিস থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর ছবিতে আমায় কাজ দেবেন বলেন। আগামিকাল সেইদিন। আমি কাজে যাব। দেবদা আমার কাছে ভগবানের মতো। ওইসময় আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।’’
বললেন, ‘‘একা থাকি তো! যতই সাহসী হই, মাঝেমধ্যে বেশ ভয়ও করে। দাঁড়াও, দরজাটা দিয়ে আসি।’’ বলেই ভিতর থেকে দরজায় তালা দিয়ে দিলেন তিনি। চায়ে না করতেই কিছু খাওয়ার প্রস্তাব দিলেন। তাতেও না করাতে একটু চুপ করে রইলেন। ফের শুরু করেন, ‘‘আসলে প্রাণের হুমকিও তো পেয়েছি। এখন সয়ে গিয়েছে। আমাকে বলা হত ওঁদের প্রিয়পাত্রী হয়ে উঠতে। কী ভাবে তা হওয়া যায় আমি জানতাম না। আমাকে কাজ না দেওয়ায় স্বরূপ বিশ্বাসের কাছে আমি চিঠি দিয়েছিলাম। মেকআপ আর্টিস্ট গিল্ডের প্রধান বাপি মালাকার যে আমাকে কাজ দেন না, সবটা লেখা ছিল। এর পর আমাকে এক জন স্টিল ক্যামেরাপার্সন ফোন করে বলেন, আমার বাড়িতে নাকি আসবেন কথা বলতে, যেটা ফোনে বলা যাবে না।’’
এক নিঃশ্বাসে অভিযোগকারিণী বলে চলেন, ‘‘তিনি এসে আমাকে নানা কথা বলতে শুরু করলেন। তার পর তিনি আমাকে অভিযোগ-চিঠি তুলে নিতে বলেন। এ-ও বললেন, ‘ওদের সঙ্গে তুমি পারবে না। তোমাকে খুন করে রেখে দেবে। এমন ভাবে করবে যে সকলে ভাববে আত্মহত্যা করেছ। তুমি বরং মিটিয়ে নাও।’ এ-ও বললেন, ‘তুমি বরং ওদের মহিলা সরবরাহ করো। ওদের প্রতি সপ্তাহে নতুন নারীসঙ্গের দরকার হয়। এক দিন দু’দিন স্বরূপ বিশ্বাস ও বাপি মালাকারের শয্যাসঙ্গী হয়ে যাও।’ আমি হতবাক হয়ে বসেছিলাম তখন। পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছিল।’’ বসতে বলতে চোখ বেয়ে জল নামছে তাঁর।
কথায় কথায় মাঝরাত পার। রাত তখন পৌনে ১টা। এখানে একা একা ভয় করে না? প্রশ্ন শুনে অভিযোগকারিণীর মুখে স্মিত হাসি। বললেন, ‘‘মরে তো এক দিন যাবই। মরলে বীরের মতো মরি না! নিজের রক্ষা নিজেকেই করতে হয়। আর রাধামাধব তো আছেনই। শুধু দোষীদের শাস্তি হোক। আর আমার মতো না খেয়ে, চোখের জল ফেলে কাউকে যেন কাটাতে না হয়।’’
অনেকদিন পর মন খুলে কথা বললেন। তারই আলো যেন তাঁর চোখেমুখে। ঘণ্টাতিনেক পরেই উঠবেন তিনি। ভোর ৫টায় কলটাইম। অনেকদিন পর আবার কাজে ফিরবেন যে! তাঁর মুখের আলোয় সেই আনন্দের আভাও যেন স্পষ্ট!