×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

৩০ জুলাই ২০২১ ই-পেপার

মেরিল স্ট্রিপকে অস্কার

গৌতম চক্রবর্তী
১৫ জানুয়ারি ২০১৮ ০০:৫০

মার্চ মাস কবে আসবে, তার জন্য অপেক্ষা করে লাভ নেই। মেরিল স্ট্রিপকে এখনই সেরা অভিনেত্রীর অস্কার দেওয়া উচিত। তাঁর ক্যাথরিন গ্রাহাম এখনও চোখে লেগে আছে।

এক নারীচরিত্রে কত যে ঝিলিক! ষাটের দশকে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ পত্রিকার প্রকাশক ক্যাথরিন গ্রাহাম আমেরিকার সংবাদজগতে প্রথম ক্ষমতাবান নারী। কাগুজে পরিবারের মেয়ে, কিন্তু প্রথম দিকে খবরের কাগজ, ব্যবসার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক ছিল না। তাঁর বাবা সংস্থার মালিকানা দিয়ে যান জামাই ফিলিপ গ্রাহামকে। ক্যাথরিন ৯০-এর দশকে তাঁর চমৎকার আত্মজীবনী ‘পার্সোনাল হিস্ট্রি’ লিখে পুলিৎজার সম্মানও পেয়েছিলেন। আত্মজীবনী জানিয়েছিল, ফিলিপ ডিপ্রেশনে ভুগতেন, নিজেদের মালিকানার ‘নিউজউইক’ পত্রিকার এক উঠতি রিপোর্টার মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতেন। পরে আত্মহত্যা করেন। পারিবারিক পত্রিকা-সংস্থার দায়িত্ব এসে পড়ে ক্যাথরিনের কাঁধে। বাকিটা ইতিহাস! ক্যাথরিনের মালিকানাধীন ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-ই হোয়াইট হাউসের গোপন নথি ছাপিয়ে জানায়, ভিয়েতনামে আমেরিকা অনেক দিনই হস্তক্ষেপ করছে। হারতে হারতেও যুদ্ধ চালাচ্ছে, রোজই কফিনবন্দি মার্কিন সেনা ফিরে আসছে।

এই ক্যাথরিনের চরিত্রে মেরিল প্রথমে বেশ ‘ভালনারেবল’, পুরুষশাসিত বোর্ড রুমে নিজেকে নিয়ে অনেকটাই দ্বিধাগ্রস্ত। পারিবারিক সংস্থা ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’কে স্টক এক্সচেঞ্জে নথিভুক্ত করাতে চান ক্যাথরিন, শেয়ারের দাম কত হবে? ২৪ না ২৭ ডলার? প্রায় ৩০ লক্ষ ডলারের ফারাক। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পাশাপাশি একটি বিজনেস ড্রামাও নিটোল ভাবে বুনে গিয়েছে স্পিলবার্গের এই ছবি।

Advertisement

এক দিকে সংস্থার আইনজীবীরা। তাঁদের বক্তব্য, এই গোপন নথি ছাপা উচিত নয়। ‘নিউ ইয়র্ক টাইম্স’ এ রকমই খবর ছেপে নিক্সন প্রশাসনের চক্ষুশূল হয়েছে, আদালতও জাতীয় স্বার্থে ভিয়েতনাম নিয়ে রিপোর্টিং বারণ করে দিয়েছে। ভুল পা ফেললে শেয়ারবাজারেও দাম হারাবে সংস্থা।

এ সবের মধ্যেই চূড়ান্ত মুহূর্ত এল এক ডিনার পার্টিতে। ফোন করলেন সম্পাদক বেন ব্র্যাডলি, ‘ছাপা যাবে তো?’ আলো-ঝলমল মেরিল স্ট্রিপের ঠোঁটের কোণে হাসি, ‘ইয়েস’। তিন অক্ষরের এই ছোট্ট শব্দটাতেই সিনেমার মুক্তি, গণতন্ত্রের মুক্তি। ক্ষমতার কাছে নতি স্বীকার করবে না ফোর্থ এস্টেট!

সম্পাদক বেন ব্র্যাডলির চরিত্রে টম হ্যাঙ্কস। ‘নিউ ইয়র্ক টাইম্স’ তাঁর নাকের ডগায় হোয়াইট হাউস নিয়ে স্কুপ নিউজ ছাপে, তাঁর হাত কামড়ানো ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। তিনি নিজে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জন কেনেডির বন্ধু, কিন্তু গোপন নথিসম্ভারে পেন্টাগনের মিথ্যের বহর দেখে হতবাক। ‘উই হ্যাভ টু বি আ চেক অন দেয়ার পাওয়ার,’ বলেন তিনি। বাস্তবে ক্যাথরিন গ্রাহাম আজ আর নেই, ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর মালিকানাও হাতবদল হয়ে আপাতত আমাজনের হাতে। তবু এই ছবি দেখতে দেখতে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর নতুন ট্যাগলাইনটা মনে পড়ে যায়, ‘ডেমোক্র্যাসি ডাইজ ইন ডার্কনেস’।

দ্য পোস্ট

পরিচালনা: স্টিভেন স্পিলবার্গ

অভিনয়: মেরিল স্ট্রিপ, টম হ্যাঙ্কস,
বব ওডেনকার্ক, সারা পলসন

৭.৫/১০

গণতন্ত্র হত্যার সেই অন্ধকার এই ছবির প্রথমেই। এলসবার্গ (ম্যাথু রিজ) ভিয়েতনামের যুদ্ধক্ষেত্রে বসে দ্রুত টাইপ করছেন। উড়ানে নিক্সন প্রশাসনের রবার্ট ম্যাকনামারা এলসবার্গের কাছ থেকে জেনে নেন, ভিয়েতনাম আমেরিকার কাছে মোটেও স্বস্তিদায়ক অভিজ্ঞতা নয়। খানিক বাদে এলসবার্গ দেখেন বিমান থেকে নেমে ম্যাকনামারা সাংবাদিকদের জানাচ্ছেন, ভিয়েতনাম যুদ্ধ ভাল ভাবেই এগোচ্ছে। র‌্যান্ড কর্পোরেশনের রিসার্চ স্কলার এলসবার্গের কাছেই ছিল ৮ হাজার পাতার গোপন নথি, সেগুলি তিনি তুলে দেন ব্র্যাডলিদের হাতে। স্টিভেন স্পিলবার্গের পরিচালনায় এর পর সাংবাদিকদের নিউজরুমে টাইপরাইটারের আওয়াজ বেড়ে যেতে থাকে, ভাগ ভাগ করে সকলেই নথির সারাৎসার তৈরিতে নেমে পড়েন।

বছর দুয়েক আগে ‘বোস্টন গ্লোব’ কাগজ নিয়ে হলিউড ‘স্পটলাইট’ ছবিটি তৈরি করেছিল। রিপোর্টারেরা কী ভাবে গির্জার যাজকদের শিশুনিগ্রহের খবর বের করলেন, তা নিয়ে ছবি। এই ছবি ছাপিয়ে গেল তাকেও।

কারণ, ‘দ্য পোস্ট’ শুধু একটা স্কুপ নিউজ প্রকাশের রোমাঞ্চকর কাহিনি নয়। ক্ষমতার বৃত্তে থাকা বন্ধুদল, রাজনৈতিক এস্টাব্লিশমেন্ট, শেয়ারবাজার, আইনজীবী সকলের সঙ্গে নিরুচ্চার যুদ্ধ লড়ে সত্য প্রকাশের লড়াই। পুলিৎজারজয়ী ক্যাথরিন গ্রাহামের চরিত্রকে এই ট্রাম্প জমানায় স্বচ্ছন্দে অস্কার দেওয়া যেতেই পারে! প্রস্তাবটা না হয় নরেন্দ্র মোদীর দেশের অকিঞ্চিৎকর এক ফিল্ম রিভিউয়ারের কাছ থেকেই গেল!

Advertisement