সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

রজনীগন্ধার নিষ্কলুষ সুবাসের মতো...

Moushumi-Amol
দো লড়কে দোনো কড়কে

অমোল পালেকর

বছর পাঁচেক আগে বাসুদার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল। ফোনে যোগাযোগ ছিল। প্রায়ই শুনতাম ওঁর শরীর ভাল নেই। এক দিন ফোনে বললাম, ‘‘আপনাকে দেখতে যেতে চাই। আর একটা ছোট সারপ্রাইজ়ও থাকবে আপনার জন্য।’’ শুনে ফোনের ও-পার থেকে বললেন, ‘‘ছাড়ো তো সারপ্রাইজ়। তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো।’’ ওঁকে দেখতে আমি গিয়েছিলাম। তবে আমার সঙ্গে আরও চার জন শিল্পী ছিলেন। বিদ্যা সিংহ, জ়ারিনা ওয়াহাব, দীপ্তি নাভাল আর বিন্দিয়া গোস্বামী... ওঁরই ছবির চার নায়িকা। আমাদের একসঙ্গে দেখে এত খুশি ও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন যে, কী বলব! আমাদের কাছেও ওই সাক্ষাৎ খুব আনন্দের ছিল। এর পরে বাসুদার মেয়ের সঙ্গেই ফোনে কথা হত। দিনে দিনে ওঁর শরীরের অবনতি হচ্ছিল...
আমার প্রথম হিন্দি ছবি ‘রজনীগন্ধা’ বাসুদার সঙ্গে। তার পরে প্রায় আটটি ছবি ওঁর সঙ্গে করেছি। আমাকে বেশ পছন্দ করতেন বাসুদা। সেটা আমার সৌভাগ্য। 
 
পরিচালক হিসেবে কয়েকটি বিশেষ গুণ ছিল ওঁর। বিমল রায়, হৃষীদার (হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়) মতো বাঙালি পরিচালকেরাও মুম্বইয়ে চুটিয়ে কাজ করেছেন। তাঁরা স্বমহিমায় উজ্জ্বল। তবে কলকাতার বা মুম্বইয়ে কাজ করতে আসা বাঙালি পরিচালকদের মধ্যে, বাসুদার মতো হিন্দি ভাষার উপরে দখল আমি আর কারও দেখিনি। ওঁর বেশির ভাগ ছবির সংলাপ নিজেরই লেখা। সেগুলোয় ফুটে উঠত ওঁর ‘পারফেক্ট হিন্দি’র নিপুণতা। আমার কাছে, এটা একটি 
বিরল গুণ।
 
মানুষ হিসেবে সাদাসিধে ছিলেন। ওঁর সারল্য, সূক্ষ্ম রসবোধ ব্যক্তি বাসুদার যেমন পরিচায়ক, তেমনই ওঁর ছবিতেও এই আঙ্গিকগুলো ফুটে উঠত। সিনেমা মাধ্যমটির উপরে এক অনায়াস দক্ষতা ছিল। অথচ তা নিয়ে কোনও বাগাড়ম্বর ছিল না। খুব কম পরিচালকের মধ্যেই এটা দেখেছি।
‘চিতচোর’, ‘ছোটি সি বাত’, ‘বাতো বাতো মেঁ’, ‘অপনে পরায়ে’... কোনটি সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র আমি বলতে পারব না। কারণ আমার কেরিয়ারে প্রত্যেকটি ছবি অভিনেতা হিসেবে আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। নতুন ভাবে আমাকে আবিষ্কার করেছে।
রজনীগন্ধার নিষ্কলুষ সুবাসের মতোই বাসুদা বেঁচে থাকবেন আমার জীবনে... 
 
অনুলিখন: মধুমন্তী পৈত চৌধুরী  

মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়

বাসু চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় অনেক ছবিতে কাজ করেছি। অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে ‘মনজ়িল’, অমোল পালেকরের সঙ্গে ‘দো লড়কে দোনো কড়কে’, বিনোদ মেহরার সঙ্গে ‘উস-পার’-এর মতো বহু ছবিতে অভিনয় করেছি। ‘মনজ়িল’-এর ‘রিমঝিম গিরে সাওয়ন’ গানে বৃষ্টির দৃশ্যে আমায় আর অমিতকে (অমিতাভ বচ্চন) বললেন, তোমরা হাত ধরে ছুটবে। কিছু দূর যেতেই গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকত। গাড়িতে উঠে পড়তাম, আবার আর একটা স্পটে গিয়ে হাঁটতাম। এ ভাবেই শুট করতেন। খুব সহজ-সরল ভাবে আর কম পয়সায় ছবি বানাতেন।
শুটিং ফ্লোর থেকে বাড়িতে ওঁর সঙ্গে এত সুন্দর সুন্দর সময়ে কাটিয়েছি। জীবনের ছোট ছোট আনন্দ, দুঃখ, পাওয়া-না পাওয়াগুলোর দিকে খুব নজর ছিল। ওঁর ছবিগুলো দেখলেই সেটা বোঝা যায়। ২০০৬-এ একটা ছবি করছিলাম ওঁর সঙ্গে। শুটিং চলাকালীন এমন বৃষ্টি, মুম্বই ভেসে গেল। যেখানে শুট হচ্ছিল সেখানেই আটকে পড়েছিলাম প্রায় দেড় দিন। সেই টেনশনের দিন কখনও ভুলব না। 
 
এমনিতে সেটে সব সময় খুব আনন্দ, হাসিখুশির পরিবেশ বজায় রাখতেন। আমার বাড়িতেও কতবার এসেছেন। যখনই আসতেন, সে সকাল আটটা হোক, দুপুর তিনটে হোক বা রাত বারোটা, ঠিক আড্ডা জমিয়ে দিতেন। আর যখনই আসতেন, আমার জন্য রজনীগন্ধা ফুল নিয়ে আসতেন। ওঁর খুব প্রিয় ছিল ওই ফুলটা। পরে তো ‘রজনীগন্ধা’ নামে একটি  ছবিও করেন। ওঁর ছবিগুলো যেমন মিষ্টি, মানুষটাও তেমন ছিলেন। ওঁর স্ত্রী কেকাও খুব মিশুকে ছিল। আর খেতে ভালবাসতেন। আমার বাড়িতেও বাঙালি ঘরোয়া রান্না খেয়েছেন। খাওয়া আর আড্ডা ছিল প্রাণ। চপ, কাটলেট, মাছ যেমন খেতেন, তেমনই পানও করতেন।
 
তবে বাসু চট্টোপাধ্যায়কে কখনও রাগ করতে দেখিনি আমি। আর রাগ করলেও আমি কাউকে পরোয়া করতাম না। আমায় কিছু বললেই সেটের মধ্যেই এত চেঁচামেচি করতাম যে আমায় কিছু বলতেনই না। একে বয়সে অনেক ছোট ছিলাম, সবে সবে মা হয়েছি, তার উপরে কাজের চাপ। সেই সময়ে ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র বাঙালিরা ছিলেন অভিভাবকের মতোই। উনিও খুব স্নেহ করতেন আমায়। ওঁর থেকে এত আদর ভালবাসা পেয়েছি, তাই মনে হয় আমায় খুব স্পয়েলও করেছেন। তবে টেনশন করতেন খুব। আর টেনশন হলেই রুমাল চিবোতেন। হয়তো কোনও দৃশ্য শুট হবে, দেখি বসে বসে রুমাল চিবোচ্ছেন। আমি গিয়ে ধরে ফেলতাম, ‘রুমাল চিবোচ্ছেন কেন?’ তাড়াতাড়ি সেটা মুখে বুলিয়ে নিয়ে বলতেন, ‘না, না, মুখ মুছছি।’ এখন পিছন ফিরে তাকালে হাসিঠাট্টার সেই দিনগুলি মনে পড়ে যায়।
 
অনুলিখন: নবনীতা দত্ত

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন