এক দুরন্ত ঘূর্ণির নাম ইলা। গান তার হাতিয়ার। আর সন্তান তার জীবন।
এলা, অর্থাৎ এই ‘হেলিকপ্টার এলা’ ছবিতে কাজল আসলে দু’ধারার। ছবির প্রথম অধ্যায়ের কিছু অংশে তিনি মডেল, গায়িকা। আবার পরবর্তী অধ্যায় থেকে ছেলে পাগল মা!
সিঙ্গল মাদারের ছেলে মানুষ করার সাঙ্ঘাতিক লড়াই, পুরুষতন্ত্রের যন্ত্রণা ও একা মায়ের সংগ্রাম! এই সমস্ত ট্যাগলাইনে ‘হেলিকপ্টর এলা’র প্রচার হলেও এই ছবি সেই চেনা খাতে বয়ে যায়নি। বরং কলেজ পড়ুয়া ছেলের মা এখানে লাল শার্ট আর ব্লু ট্রাউজারে ছেলের সব কিছু জানার আকাঙ্ক্ষায় ফেসবুক থেকে টুইটে ছেলের বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা জমায়। কান পেতে ছেলের বন্ধুর প্রেমিকাকে বাদ দিয়ে অন্য মেয়েকে চুমু খাওয়ার গল্প শোনে...শুধু ছেলেময় জগত তার। ছেলের সঙ্গে এক কলেজে আবার পড়াশোনা করতে ভর্তি হয়ে যায়। শুধু ছেলের সঙ্গ পাবে বলে। ছেলে মদ বা সিগারেট ধরল? এই ভেবে মধ্যরাতে ঘুমন্ত ছেলের মুখে গন্ধ শুকতে যায়। কারও বারণ সে মানে না।
কিন্তু কেন সে এমন করে? এই অতিরিক্ত আঁকড়ে ধরার কারণ ইলার স্বামী ওরফে টোটা রায়চৌধুরী যে হঠাৎ ছেলে জন্মানোর কয়েক বছর পরে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। তাকে কেউ আটকাতে পারেনি। কেন সে যায়? কারণটা ছবি বলবে। কিন্তু তার যাওয়া ছবিতে যে ভাবে এসছে সেটা খুব যে একটা জোরালো কারণ তা মনে হয় না। হঠাৎ ছেলে বউ আর ছেলে ফেলে ঘরছাড়া হল দেখেও ছেলের মা কেমন যেন ছবিতে রিঅ্যাক্ট করল না। এই জায়গাতে খানিক খটকা লাগে। নেহা ধূপিয়া আর টোটা রায়চৌধুরীর অভিনয় অনায়াস। এ ছবির গানের মধ্যে যেমন নব্বইয়ের নস্টালজিয়া আছে তেমনই আজকের ফুরফুরে মেজাজ আছে। সংলাপ কাজলের মতোই মজাদার, ক্ষুরধার...তবে কখনও মনে হয় কাজল কি একটু বেশি বাড়াবাড়ি করছেন অভিনেত্রী হিসেবে?

আরও পড়ুন
মুভি রিভিউ: কণ্ঠী শিল্পীদের কথা প্রথম বলল ‘কিশোর কুমার জুনিয়র’

এই ধাক্কা ছাড়া কাজল আর ঋদ্ধি সেনের হেলিকপ্টার এক কথায় চমৎকার। টেক অফ থেকে ল্যান্ডিং— রংময়, গতিময়, ছন্দময় এবং অবশ্যই সুরময়। ছবির দৃশ্যের ধারাই বার বার মনে করায় এ ছবির পরিচালক প্রদীপ সরকার।
কাজলকে কী বলি? কখনও তিনি ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’-এর যৌবনষড়শী কাজল, কখনও বা মায়াময় মোহিনী এলা। এক জন গায়িকার স্টেজ পারফর্ম্যান্সের আদবকায়দা থেকে একলা মায়ের অসহায়তা তার শিরায় শিরায় ফুটে ওঠে। সংলাপ থেকে অভিনয়, কাজলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন ঋদ্ধি সেন। তাঁর অভিনয়ের আকাশ অনেক বড়, বারে বারেই প্রমাণ করছেন তিনি। দু’জনের পাশাপাশি অভিনয় দেখতে দেখতে মনে হয় ফেসবুক, হোয়াটস্অ্যাপের যুগের ‘আধুনিক’ মা-ছেলের বন্ডিং দেখছি। নাহ, এখানে বাবা নেই বলে নাকি সুরে কান্না নেই কোথাও। মা ছেলেকে ক্রিকেট শেখাতে পারছেনা বাবার দরকার ছিল এমন কোনও গল্প নেই। এ ছবি দেখতে দেখতে মনে হয়, ছেলে মানুষ করতে এক জন পরিণত মানুষ লাগে শুধু। যাকে বাবা, মা যে কোনও নামেই ডাকা যেতে পারে। মনে হয় নিজের স্পেসের জন্য আগে মানুষকে বাঁচতে হবে। নিজের ভাললাগার সঙ্গে একাত্ম হতে হবে। প্রেম জীবনে নাই বা থাকল! সত্যি তো এ ছবি কাজলের একটা বিয়ে বা বিয়ে না করা হাল্কা প্রেম দেখাতেই পারতো। এই চেনা আবেগের ফাঁদে এই ছবি পা দেয়নি। ধন্যবাদ প্রদীপ সরকার। তবে কাজলকে ঘিরে একটা প্রশ্ন ঘুরছে মাথায়। মধ্যবিত্ত বাড়ির মা কেন সারা ক্ষণ সিল্কের কুর্তি পরে ছেলের জন্য রান্না করে? স্টাইলিস্ট মা কেন সারা ছবি জুড়ে একটা ব্যাগ নিয়েই ঘুরল?

আরও পড়ুন
মুভি রিভিউ: যিশুর সেরা অভিনয়, তবে কামাল করলেন জয়া

অনেকে ইতিমধ্যেই এই ছবির সঙ্গে হিন্দি নাটক, অন্য এক বাংলা ছবির তুলনা করছেন। তা করুন। সে ক্ষেত্রে এই ছবির গল্পে তেমন নতুনত্ব না থাকলেও, কাজলের অভিনয় কোথাও অতি নাটকীয় মনে হলেও, এই ছবি যে মানুষের একক সত্তা হয়ে বেঁচে থাকার অফুরান আলো দেখায়, এই অস্থির সময়ে সেটাই যথেষ্ট।

(মুভি ট্রেলার থেকে টাটকা মুভি রিভিউ - রুপোলি পর্দার সব খবর জানতে পড়ুন আমাদের বিনোদন বিভাগ।)