Advertisement
E-Paper

‘বাবা অবশ্যই জিনিয়াস ছিলেন, তবে আমিও মন্দ নই,’ একান্ত আড্ডায় দাবি ‘মহীন’-পুত্র গাবুর

পরিবারে সঙ্গীতের অবস্থান থেকে মৌলিক গানের ভবিষ্যৎ, সব নিয়ে আলোচনা করলেন গাবু তথা গৌরব চট্টোপাধ্যায়।

স্বরলিপি দাশগুপ্ত

শেষ আপডেট: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৭
সঙ্গীত সফর নিয়ে অকপট গাবু।

সঙ্গীত সফর নিয়ে অকপট গাবু। ছবি: সংগৃহীত।

ঘর জুড়ে নানা বাদ্যযন্ত্র। দেওয়ালে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের নানা ছবি। নাকতলার বাড়ির আনাচকানাচ জুড়ে রক মিউজ়িকের ছোঁয়া। সেই সময়ে কেমন ছিল এই বাড়ির আবহ? পরিবারে সঙ্গীতের অবস্থান থেকে মৌলিক গানের ভবিষ্যৎ, সব নিয়ে আলোচনা করলেন গাবু তথা গৌরব চট্টোপাধ্যায়।

প্রশ্ন: সঙ্গীতের ক্ষেত্রে আপনার পারিবারিক ধারা রয়েছেসেটা বহন করে নিয়ে যাওয়ার ভার কি খুব বেশি?

গাবু: হ্যাঁ, একটা ভার রয়েছে। সেটা নামিয়ে রেখে যতটা নিজের মতো কাজ করা যায়, ততই সুবিধা। আমাকে কেউ প্রশ্ন করলে, আমি বলি ‘বাবা জিনিয়াস ছিল। আমি নই। কিন্তু আমিও মন্দ নই।’ (হাসি) আমার মতো কাজ করে গিয়েছি। তবে হ্যাঁ, পরিবারের জন্যই ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন বিষয় কাছ থেকে জানতে পেরেছি। এখন আমার ভাবনাচিন্তা যা, সেটা আমার বাবা-মায়ের জন্যই।

প্রশ্ন: বাড়িতে গানের পরিবেশ দেখেই বড় হওয়া...

গাবু: হ্যাঁ ছোটবেলায় দেখেছি নিয়মিত গানবাজনা হয়েছে। বাউলরা এসেছেন এবং আসর মেতে উঠেছে। বাবা গান লিখত, সেটা দেখতাম। আমাদের তুতো ভাইবোনেদের সকলে একটা করে বাজনা বাজাতে পারে। বিভিন্ন শিল্পজগতে বাবার বন্ধু ছিল। তাঁরা আসতেন। বাড়িটা একটা ‘ইন্টেলেকচুয়াল অ্যাক্টিভিটি’র কেন্দ্র ছিল। সে সব দেখেই বড় হয়েছি।

প্রশ্ন: কখনও মনে হয়নি যে পারিবারিক ধারাকে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে?

গাবু: কখনও এই অনুভূতিটাই ছিল না যে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ‘পড়াশোনা করো’, এটা যেমন বলা হত, সঙ্গে এটাও বলা হত, ‘নিয়ম করে রেওয়াজ করো’। দুটো ক্ষেত্রেই বকা খেতাম।

প্রশ্ন: নিজের পরিচিতি ও স্বতন্ত্রতা তৈরি করা কি এ ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে ওঠে?

গাবু: ১৯৯৫ সাল থেকে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ সম্পাদিত অ্যালবামগুলো প্রকাশ করা শুরু করল। সেখানেই আমাদের ব্যান্ড ‘লক্ষ্মীছাড়া’র প্রথম আত্মপ্রকাশ। ‘মহীনের ঘো়ড়াগুলি’ সম্পাদিত অ্যালবাম নিয়ে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে যায়।

প্রশ্ন: কী রকম?

গাবু: ৭০-এর দশকে ব্যান্ডটা (‘মহীনের ঘোড়াগুলি’) ছিল। তার পরে ৯০-এর দশকে ব্যান্ডের অ্যালবামগুলো বাবা প্রকাশ করতে থাকে। তখন থেকেই আমাদের ‘লক্ষ্মীছাড়া’র সফর শুরু। স্কুলে পড়তেই পড়তেই এই ব্যান্ড শুরু। আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। টেলিভিশনে বাচ্চাদের ব্যান্ড হিসাবে গেয়েছি। বাবা ১৯৯৯-এ চলে গেল। তার পরেই আমাদের ব্যান্ডটা স্বাধীন ভাবে পথচলা শুরু করল। নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি করার থেকেও, আমার লক্ষ্য ছিল ‘লক্ষ্মীছাড়া’র পরিচিতি তৈরি করা। সেটা হতে হতেই আমার নিজের পরিচিতি তৈরি হয়ে গেল। তার পরে ‘দ্য থ্রি সিজ়’ ব্যান্ডটির সঙ্গেও কাজ শুরু হল। ছবিতেও কাজ করলাম।

প্রশ্ন: ‘দ্য থ্রি সিজ়’-এর সফর শুরু হল কী ভাবে?

গাবু: এই ব্যান্ডটি অর্ধেক অস্ট্রেলিয়ার আর অর্ধেক এখানকার, স্যাক্সোফোন বাদক ম্যাট কিগান সিডনির মানুষ। ২০০৯ সালে ওঁরা শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন। সেখান থেকে ওঁর সঙ্গে আলাপ। সেখান থেকেই রাজু দাস বাউল ও কালিম্পং-এর দেবাশিস মোথোর সঙ্গে ওঁর আলাপ। আমাদের তিনজকে নিয়ে ম্যাট কাজ শুরু করেন। দেশ-বিদেশের একাধিক ফেস্টিভ্যালে আমরা বাজিয়েছি। অনেক সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে।

‘দ্য থ্রি সিজ়’ ব্যান্ড।

‘দ্য থ্রি সিজ়’ ব্যান্ড।

প্রশ্ন: খুব শীঘ্রই নতুন অ্যালবাম আসছে?

গাবু: ২০২২ সালে ইংল্যান্ডে আমরা একটা অনুষ্ঠান করেছিলাম। তখন পিটার গ্যাব্রিয়েলের ‘রিয়্যাল ওয়ার্ল্ড’ স্টুডিয়োয় একটি অ্যালবাম রেকর্ড করি। সেইটা অবশেষে প্রকাশিত হতে চলেছে। বাংলা, নেপালি-সহ বিভিন্ন ভাষার গান রয়েছে অ্যালবামে।

প্রশ্ন: বাঙালি এখনও কথায় কথায় ‘স্বর্ণযুগের গান’-এর কথা বলে। সেই জায়গায় কলকাতায় থেকে ওয়েস্টার্ন ঘরানার মিউজ়িক করা কি সহজ ছিল?

গাবু: আসলে একটা বিভাগের মানুষের কাছে সত্যিই সাড়া পেয়েছিলাম। আমি সব সময় ইতিবাচক দিকগুলোই দেখতে ভালবাসি। ‘লক্ষ্মীছাড়া’ যখন শুরু করেছিলাম, তখন টেলিভিশন, বেতারমাধ্যমকে পাশে পেয়েছিলাম। এখন সেখানে নির্দিষ্ট প্রযোজনা সংস্থার ছবির গান ও বলিউডের ছবির গান ছাড়া কিছু চলে না। তাই নতুন ব্যান্ড বা সিঙ্গার-সংরাইটাররা সেই সাহায্যগুলো পায় না। আমাদের ব্যান্ড-এর ৩১ বছর বয়স হয়ে গেল। মানুষ গ্রহণ করেছেন বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।

প্রশ্ন: বর্তমানে বলিউড সঙ্গীতের রমরমা বেশি। হাতে গোনা কয়েকটি অনুষ্ঠান এবং ‘পাব’-এ স্বাধীন গানবাজনার চল রয়েছে। কী বলবেন?

গাবু: নতুনদের জন্য সত্যিই কঠিন এই লড়াইটা। বিশেষ করে যাঁরা মৌলিক গানবাজনা করেন, তাঁদের জন্য। আমি চেষ্টা করি নিজে কিছু ফেস্টিভ্যাল আয়োজন করার, যেখানে নতুনরা সুযোগ পাবেন। আমাদের সময়ে ব্যান্ডের প্রতিযোগিতা হত, সেখানে সকলে নিজেদের মৌলিক গান গাইত। এখন বেশিরভাগ জায়গায় বলিউড। কিন্তু এর মধ্যেই নিজেদের চেষ্টা করে যেতে হবে। এখনও এমন কিছু শ্রোতা রয়েছেন, যাঁরা সব অনুষ্ঠানে যান। পর পর হয়তো ‘ফসিল্‌স’, ‘লক্ষ্মীছাড়া’, ‘চন্দ্রবিন্দু’র অনুষ্ঠান দেখেন। লাইভ শো-এর একটা অন্য আনন্দ আছে। তাই এই শ্রোতাদর্শকের কাছে এই খবরগুলো পৌঁছোনো প্রয়োজন। তবে অনুষ্ঠান কিন্তু আগের চেয়ে বেড়েছে।

প্রশ্ন: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের শিল্পীরা এই অনুষ্ঠানগুলোয় কি বেশি সুযোগ পাচ্ছেন বলে মনে হয়? সেই জায়গায় যদি স্থানীয় শিল্পীদের জায়গা দেওয়া হত, ভাল হত না?

গাবু: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শিল্পীরা যেমন আসছেন, আসুন। ভাবতে পারি না, কলকাতায় বসে ‘ড্রিম থিয়েটার’-এর অনুষ্ঠান দেখব! তবে পাশাপাশি এখানকার শিল্পীদেরও সুযোগ দেওয়া হোক।

প্রশ্ন: বাঙালি শ্রোতা এখনও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের স্বীকৃতি দিতে শেখেনি বলে মনে হয়? নাকি তাঁদের কাছে কণ্ঠশিল্পীই প্রধান?

গাবু: এটা আসলে শুধু বাংলায় নয়। ভারত এবং সারা বিশ্বের মানুষের কাছেই গায়ক বা গায়িকাই সবার উপরে। শ্রোতাদর্শকের একাংশ আলাদা করে বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের চেনেন, তাঁরা আলাদা করে গিটার বা ড্রাম্‌স-এর অংশও মন দিয়ে শোনেন। তবে সত্যিই, এ বার একটু বোঝার সময় এসেছে যে ব্যান্ড মানে শুধু কণ্ঠশিল্পী নয়। আর বাকিরা ‘হ্যান্ডস’ নয়। এই কথাটা শুনলেই মাথা গরম হয়ে যায়। আমি কিন্তু যত বার শুনেছি, মুখের উপরে সবটা বলে বুঝিয়ে এসেছি। একটা ব্যান্ড-এ তো প্রত্যেকের সমান ভূমিকা রয়েছে।

প্রশ্ন: বর্তমানে বাংলা ব্যান্ড করে কি জীবনযাপন সম্ভব?

গাবু: অনেকেই করছেন। তবে আমি বলব, আর্থিক নিরাপত্তার জন্য একটা ‘ব্যাকআপ’ রাখা জরুরি।

প্রশ্ন: কিন্তু, অন্য কাজ করেও কি গানবাজনা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব?

গাবু: অবশ্যই সম্ভব। আমাদের ব্যান্ডে কেবল আমি আর বোধি পুরোপুরি মিউজ়িকটাই করি। বাকিরা চাকরি করছেন ও ব্যবসা করছেন। ওদের জন্য সকাল ৯টায় আমরা মহড়া শুরু করি। মহড়া সেরে ওঁরা যে যাঁর কাজে চলে যান। আসলে টিকে থাকতে হবে। উপলব্ধি করতে হবে, আমি আগে শিল্পী। পাশাপাশি চাকরিটা করি। উল্টোটা হলে মুশকিল।

প্রশ্ন: কিন্তু বহু ব্যান্ড তো ভেঙেও যায় বোঝাপড়ার অভাবে...

গাবু: আমাদের এই দিক থেকে কপাল ভাল। যাঁরা ব্যান্ড ছেড়েও দিয়েছেন, সকলের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল রয়েছে। ওঁরা ‘লক্ষ্মীছাড়া’কে এখনও একই ভাবে ভালবাসেন। সবচেয়ে বড় কথা, কাউকে কখনও ব্যান্ড থেকে বার করা হয়নি। স্বেচ্ছায় সকলে বেরিয়েছেন।

প্রশ্ন: বাংলা ছবির সঙ্গীত এখন কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে বলে মনে হয়?

গাবু: সব ছবি সমান জায়গা পায় না। এই বিষয়টা যদি একটু ঠিক হত, তা হলে ভাল হত। হাতেগোনা এক-দু’টো প্রযোজনা সংস্থা সবটা ধরে রেখে দিয়েছে। বাকিদের ছবির গুণমান ভাল থাকলেও যথার্থ জায়গা দেওয়া হয় না। তাই এমন অনেক পরিচালক রয়েছেন, যাঁরা কাজটাই ছেড়ে দিয়েছেন। পরিশ্রম করে একটা ছবি তৈরি করার পরে কেউ যদি প্রভাব খাটিয়ে সেই ছবি তুলে দেয়, তা হলে আর সে কী করবে! এটা একটা সমস্যা। এই সমস্যা মিটলে ভাল কাজ আরও হবে। এমন বহু শিল্পী রয়েছেন, যাঁদের ছবির গানের চেয়ে আমার তাঁদের মৌলিক গান বেশি ভাল লাগে।

প্রশ্ন: যেমন, কারা?

গাবু: অনুপমের কথাই বলা যায়। ওঁর মৌলিক গান যেমন আমার বেশি ভাল লাগে।

প্রশ্ন: বাংলা সঙ্গীতজগতের গায়ক-গায়িকাদের মধ্যে কয়েকটা নামই ঘোরাফেরা করে। অথচ রিয়্যালিটি শোয়ে বহু প্রতিভা দেখা যায়। এটা কি স্বজনপোষণের জন্য?

গাবু: কে কার সঙ্গে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করবে, সেই অনুযায়ী কাজ হয়, এটা ঠিক। আমিও তো বন্ধুবান্ধবকে নিয়েই বেশি কাজ করি। আমরা পরস্পরকে বুঝি। তবে ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রে ‘পাওয়ার গেম’-এর একটা ভূমিকা তো রয়েছেই।

প্রশ্ন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বহু আলোচনা হচ্ছে। সঙ্গীতশিল্পীদের কাছেও কি এটা ভয়ের কারণ?

গাবু: আমি এটাকে ভয়ের কারণ হিসাবে দেখি না। আমার মতে এআই (আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) একটা ‘টুল’। কে কী ভাবে সেটা ব্যবহার করবে, তার উপরে অনেক কিছু নির্ভর করে। অনেকে একেবারেই পছন্দ করছেন না। অনেকে আবার সেটা নিয়েই কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বদল হয়তো আসবে, সেটা নিয়েই চলতে হবে।

Gaurab Chattopadhyay Gaurab Chatterjee
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy