Advertisement
E-Paper

ইন্ডাস্ট্রির বড়রা যদি নবাগত হিসাবে কাঁধে হাত রাখেন, তা হলে আত্মবিশ্বাস বাড়বে: রুদ্রজিৎ রায়

সিনেমা তৈরির পথটা খুব মসৃণ ছিল না রুদ্রজিতের। তিনি নিজেও নাকি আটকে ছিলেন পিঞ্জরে। নিজের জীবন থেকে শুরু করে, নবাগত পরিচালক হিসাবে ইন্ডাস্ট্রির প্রতি প্রত্যাশা, সবটাই জানালেন আনন্দবাজার ডট কম-কে।

সম্পিতা দাস

শেষ আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬ ১০:২০
রুদ্রজিৎ রায়

রুদ্রজিৎ রায় ছবি: সংগৃহীত।

পেশায় তিনি চিকিৎসক, যদিও নেশা সিনেমা। ছোটবেলা থেকেই চাপ ছিল ডাক্তার হওয়ার। বড়পর্দার সঙ্গে তাই তাঁর পরিচয় যৌবনে এসে। তার পর বারবার একটাই চিন্তা মনের মধ্যে লালন করেছেন যে, সিনেমা তৈরি করবেন। দীর্ঘ চিকিৎসকজীবনের পরে পরিচালক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করছেন রুদ্রজিৎ রায়। তাঁর ছবি ‘পিঞ্জর’ মুক্তি পাচ্ছে ১০ জুলাই। সিনেমাজগতে আসা খুব একটা সহজ ছিল না। তিনি নিজেও নাকি আটকে ছিলেন ‘পিঞ্জর’-এ। নিজের জীবন, নবাগত পরিচালক হিসাবে ইন্ডাস্ট্রির প্রতি আশা, সব নিয়েই আনন্দবাজার ডট কম-এর মুখোমুখি পরিচালক।

প্রশ্ন: আর তো দিনকয়েক পরেই ‘পিঞ্জর’ মুক্তি পাবে। কী ভাবে কাটছে সময়টা?

রুদ্রজিৎ: হ্যাঁ। আসলে এখন এতটাই ব্যস্ত যে, ‘টাইম ম্যানেজ’ করাটা মস্ত কাজ হয়ে উঠেছে। আমার নিজস্ব একটা পেশা রয়েছে। সেখানে দায়বদ্ধতা রয়েছে। এর পাশাপাশি ছবির মুক্তি। মনে হচ্ছে, এখনও খুঁটিনাটি অনেক কিছু বাকি। চেম্বারের সময়, ওপিডি সামলে সিনেমার প্রচারে যাওয়া, সবটা আমার কাছে বেশ নতুন। তাই সবটা সামাল দিতে একটু চাপই হচ্ছে।

প্রশ্ন: চিকিৎসক থেকে পরিচালকের ভূমিকায়কোনটা বেশি সহজ?

রুদ্রজিৎ: মানুষের রোগ সারানো বেশি সহজ। কিন্তু, এই কাজটা খুব কঠিন। ১০০ জন রোগী দেখে ক্লান্তি আসে না। পরিচালনায় মাথার খেলাটা বেশি। প্রতিটি পদক্ষেপ খুব বুঝে ফেলতে হয়, নয়তো ‘চেকমেট’ হয়ে যেতে পারে।

প্রশ্ন: ‘পিঞ্জর’-এর গল্পের জন্ম কী ভাবে?

রুদ্রজিৎ: এই ছবির গল্পটা আমার ও আমার বন্ধু রাহুল রায়ের একসঙ্গে লেখা। গল্পটা আমার হলেও চিত্রনাট্যের অনেকটাই ওঁর লেখা। গল্পটা লিখতে শুরু করি ২০১৭ সালে। মফস্‌সলের দিকে, কখনও সুন্দরবন কখনও গুড়াপ, এ সব জায়গায় প্রায়ই চিকিৎসা করতে যেতাম। কোনও গাড়ি নয় বরং লোকাল ট্রেনে করেই যেতে হত। লোকাল ট্রেনে চারপাশে এত চরিত্র ঘোরাফেরা করে। সেখান থেকেই আমার ছবির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্রকে পেয়ে যাই। এ ছাড়াও কোভিডের সময়ে দেখা কিছু মানুষের জীবন ও আমার শৈশবের বেশ কিছু অভিজ্ঞতাকে মিশিয়ে এই গল্পটা তৈরি করেছি।

প্রশ্ন: পরিচালকের দায়িত্ব সামলানো খুব সহজ নয় কখনও কোনও বাধা পেয়েছেন?

রুদ্রজিৎ: অবশ্যই। এই কাজে আমার প্রথম বাধা ছিল টাকা। আমরা স্বাধীন ভাবে ছবিটা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু, সেটা পারিনি। তখন গিল্ডের সমস্যা ছিল। আমাদের চিত্রগাহক, সাউন্ড রেকর্ডিস্টকে সাসপেন্ড করা হয় গিল্ডের তরফে। কারণ, কেউ একজন জেনে যায় যে, আমরা স্বাধীন ভাবে ছবিটা তৈরি করছি। আর তাতেই আপত্তি ওঠে। ‘গুপি শুটিং’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। তখন শুটিং লোকেশন বদলে অন্য রাজ্যে নিয়ে যেতে হয়। প্রথমে ভেবেছিলাম, কলকাতায় কিছুটা আর তার পরে বাকিটা বোলপুরে শুট করব। পরে অবশ্য ঝাড়খণ্ডে গিয়ে শুটিং করতে হয়। তবে সেটা আমার মতে, শাপে বর হয়েছে। কারণ, তাতে প্রাকৃতিক বৈচিত্র পেয়েছিলাম, যেটা ছবির কাজে লেগেছে।

শুটিংয়ের ফাঁকে রুদ্রজিৎ ও তাঁর টিম।

শুটিংয়ের ফাঁকে রুদ্রজিৎ ও তাঁর টিম। সংগৃহীত।

প্রশ্ন: আপনার প্রথম ছবি নতুন কী করার চেষ্টা করেছেন?

রুদ্রজিৎ: আমরা ষাট বছরের পুরনো লেন্সকে একটা অ্যাডপ্টার দিয়ে ডিজিটাল ক্যামেরার সঙ্গে লাগিয়ে শুট করেছি। বড়পর্দায় ছবিটা যাতে একটা অন্য ধরনের অনুভূতি দেয়। এমনকি প্রায় দেড় বছর ধরে প্রতিটা শট এক জন ‘ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার’কে দিয়ে শুট করানো হয়েছে। এ ছাড়াও এই ছবিটার সাউন্ড ডিজ়াইনের উপর বাড়তি জোর দেওয়া হয়েছে। ছবির একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে পাখি। প্রতিটা পাখির আওয়াজ আলাদা করে রেকর্ড করা হয়েছে। দর্শক যখন সিনেমাটা দেখবে, সেই অনুভূতি পাবে।

প্রশ্ন: পিঞ্জর মানে তো খাঁচা আপনার নিজের জীবনে কখনও কোথাও আটকা পড়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হয়েছে?

রুদ্রজিৎ: আমি আমার জীবনে বহু বার আটকে গিয়েছি। ছোটবেলা থেকেই মনে হত, আমি প্রতিদিন যেন একটা নতুন খাঁচায় বন্দি। তবে এটা এখন অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। জীবন যত বার নতুন চ্যালেঞ্জ দিয়েছে, আমি সেটাকে উপভোগ করতে শুরু করি। তাই কাজটা খুব কঠিন মনে হয় না।

প্রশ্ন: চিকিৎসক হিসাবে একটা স্থিতিশীল জীবন ও পেশা রয়েছে। হঠাৎ মাঝবয়সে এসে নতুন পেশায় নিজেকে জড়ালেন কেন?

রুদ্রজিৎ: প্রথমত, শৈশব থেকেই পড়াশোনা খুব সহজ ছিল না আমার জন্য। কারণ, আমি ডিসলেক্সিক। এখনও মাঝেমাঝে প্রেসক্রিপশন উল্টো দিক থেকে লিখে ফেলি। স্কুলে মধ্যমেধার ছাত্র ছিলাম। আমার স্মৃতিশক্তিও দারুণ নয়। ডাক্তারি পড়ি বিদেশে। তবে পড়াশোনার প্রতি ভালবাসা বা মন দিতে শুরু করি একাদশ শ্রেণিতে উঠে। সারাজীবন শিক্ষকদের থেকে অনেক খারাপ কথা শুনেছি। এক শিক্ষক বলেই দিয়েছিলেন যে, আমি সারাজীবন ডিম বিক্রি করব। আসলে আমিও জানতাম না যে, আমার কোনও সমস্যা আছে। ‘তারে জ়মিন পর’ ছবিটা দেখার পর বুঝতে পারি। পরে ডাক্তারি পড়তে গিয়ে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখাই। এখনও কথা বলতে গেলে আটকে যাই। মঞ্চে কথা বলতে বা বেশি লোকের সামনে কথা বলতে একটা জড়তা কাজ করে। এটা আমার জীবনের একটা ‘পিঞ্জর’, যেখান থেকে প্রতিনিয়ত লড়াই করে নিজেকে বার করে আনি।

প্রশ্ন: সিনেমা ছাড়া আর কী ভালবাসেন?

রুদ্রজিৎ: আমার প্রথম প্যাশন ফোটোগ্রাফি। আট বছর বয়স থেকে ছবি তুলি। আমার বাবা একজন নামী চিত্রগ্রাহক ছিলেন। এই দুনিয়াটা বাবার চোখ দিয়ে দেখেছিলাম। ল্যান্ডস্কেপ ও দুর্গম জায়গায় গিয়ে ছবি তুলতাম। সেখান থেকে তথ্যচিত্র বানানোর ইচ্ছা জাগে। এর পর ভাবি, ডাক্তারির পাশাপাশি এই কাজটাও করব। অবসরযাপনের জন্যও তো ভাল। আমি এমন পরিচালক নই যে, প্রতি বছর একটা করে ছবি আনব। আমি বিশ্বাস করি, ১০-১২ দিনে ছবি তৈরি করা যায় না। আমি এমন ছবি বানাব, যেটা পরবর্তী সময়ে মানুষের কাজে লাগবে। যেটা সকলের থেকে আলাদা হবে।

প্রশ্ন: বাবা চিত্রগ্রাহক ছিলেন পরিবারের থেকেই কি এই কাজের উৎসাহ পান?

রুদ্রজিৎ: না। আমাকে ছোটবেলা থেকেই ডাক্তার তৈরি করার জন্যই পড়াশোনা করানো হয়। আমার ঠাকুরদা ডাক্তার ছিলেন। বাবা ডাক্তারি পড়েও ছেড়ে দেন। তাই পরিবারের তরফে এর জন্য ছোট থেকে উৎসাহ পাইনি। প্রথম ছবি দেখা আমার সঞ্জয় লীলা ভন্সালীর ‘দেবদাস’। আর ছোটবেলায় এক বার ‘জুরাসিক পার্ক’ দেখতে গিয়েছিলাম বাবা-মায়ের সঙ্গে। আসলে আমার বাড়িতে সিনেমা দেখার অনুমতি ছিল না। আমার প্যাশন থেকেই পরিচালনায় পা দেওয়া।

প্রশ্ন: নতুন পরিচালক হিসাবে ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে কতটা আশাবাদী?

রুদ্রজিৎ: অনেকের ভাল লাগতে পারে, অনেকের খারাপ লাগতে পারে। তবে নবাগত হিসাবে ইন্ডাস্ট্রির বড়রা যদি কাঁধে হাতটা রাখেন, তা হলে আমার আত্মবিশ্বাসটা বাড়বে। আসলে আমি সকলকে চিনি না। তবে সকলে যদি ছবিটা দেখেন এবং ইন্ডাস্ট্রি যদি নতুন পরিচালককে জায়গা করে দেয়, তা হলে বুঝব যে ইন্ডাস্ট্রি আমার পাশে আছে। তবে আমার কারও সঙ্গে প্রতিযোগিতা নেই। বক্সঅফিসেও কারও সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। একমাত্র প্রতিযোগিতা হতে পারে চলচ্চিত্র উৎসবে। আমি আমার নিজের ঘরানা তৈরি করতে চাই।

প্রশ্ন: রাজ্যে পালাবদল হয়েছে, পুরনো গিল্ডও নেই নতুন পরিচালকদের ক্ষেত্রে পরিবর্তিত পরিস্থিতি কতটা অনুকূল হবে?

রুদ্রজিৎ: দেখুন, যদি আমি দেখি আমাদের ইন্ডাস্ট্রির অভিজ্ঞ অভিনেতারা, প্রযোজকেরা পাশে দাঁড়াচ্ছেন, ছবিটা দেখছেন— তা হলে বুঝব ইন্ডাস্ট্রি বদলেছে। সম্প্রতি আমার ছবির একটা অনুষ্ঠানে এসেছিলেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, লকেট চট্টোপাধ্যায়েরা। আমি আশাবাদী, সকলে পাশে থাকবেন। বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় ইতিমধ্যেই ছবির ডিস্ট্রিবিউশন নিয়ে নেওয়া হয়েছে। সিঙ্গাপুর সরকার ও একটি বেলজিয়ান কোম্পানিও ছবিটার পরিবেশনার দায়িত্ব নিয়েছে। এ বার দেখার, কলকাতার থেকে কতটা সহযোগিতা পাই। কলকাতা ছাড়াও সারা বিশ্বে ছবিটা মুক্তি পাবে।

প্রশ্ন: ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন রাতুলশঙ্কর প্রথম থেকে ওঁর কথাই ভেবেছিলেন?

রুদ্রজিৎ: একদম। রাতুলকে দীর্ঘদিন ধরে চিনি। আমার ভাবনাটা খুব সুন্দর করে বুঝতে পারে। দীর্ঘ এক থেকে দেড় বছর যে ভাবে রাতুল ও ওঁর টিম কাজ করেছে, সেটা প্রশংসনীয়। রাতুল এই ছবিতে ‘ম্যাজিক’ করেছেন। সাউন্ড ও মিউজ়িক এই ছবির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই আমি এটা বলতে পারি যে, দর্শক প্রেক্ষাগৃহ থেকে ছবিটাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে বেরোবেন।

প্রশ্ন: শুটিং শেষ করেই ছবির অন্যতম অভিনেত্রী মল্লিকা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিয়ে করেন?

রুদ্রজিৎ: আমি ওকে একটা পার্টিতে দেখেছিলাম। তখনই ভেবেছিলাম যে, আমার ছবির চরিত্র হতে পারে ও। তখন মল্লিকার ধারাবাহিক চলছে, এককথায় কিন্তু ছবিটা করতে রাজি হয়নি। তার পর শেষমেশ মল্লিকা রাজি হয়। শুটিংয়ের সময় থেকেই একে অপরের প্রতি অনুভূতি বাড়ে। আসলে আমরা দু’জনেই একটা খাঁচায় বন্দি ছিলাম। দু’জনেই সেখান থেকে বেরিয়ে আসি। সত্যি বলতে একেই হয়তো ভাগ্য বলে।

মল্লিকা বন্দ্যোপাধ্য়ায় ও রুদ্রজিৎ রায়ের প্রাক্-বিবাহ অনুষ্ঠানের সময়।

মল্লিকা বন্দ্যোপাধ্য়ায় ও রুদ্রজিৎ রায়ের প্রাক্-বিবাহ অনুষ্ঠানের সময়।

Bengali Movie Bengali Director Tollywood Film Tollywood Debut

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy