Advertisement
E-Paper

বিবাহের মাঝে তৃতীয় ব‍্যক্তির আনাগোনা ঘর ভাঙার যথেষ্ট কারণ নয়! কেন দ্বিধাবিভক্ত সমাজ?

সত্যিই কি তৃতীয় ব্যক্তি ঢুকে পড়ায় বহু বছর ধরে যত্নে লালন করা সম্পর্ককে মাটিচাপা দেওয়া যায়? আবার তৃতীয় ব্যক্তির অস্তিত্ব জেনেও সম্পর্ক বহন করে চলা যায়? এই দুই প্রশ্নেরই নির্দিষ্ট উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬ ০৮:৫৫
সম্পর্কে প্রতারণা নিয়ে কী বলছে টলিপাড়া?

সম্পর্কে প্রতারণা নিয়ে কী বলছে টলিপাড়া? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

সম্পর্কে প্রতারণা। যুগের পর যুগ ধরে এমন নানা দৃষ্টান্ত রয়েছে। কেউ প্রতারণাকে ‘পরকীয়া’র মতো পোশাকি নামে ডাকেন। কেউ আবার মনে করেন, সম্পর্কে বিশ্বাস ভাঙাই কফিনের শেষ পেরেকের মতো। তার পরে আর সম্পর্ক বহন করা যায় না। তবে সম্প্রতি অভিনেতা তথা একটি রিয়্যালিটি শোয়ের প্রতিযোগী রাম কপূর তা মনে করেন না। তাঁর মতে, প্রতারণা মানেই সম্পর্ক ভেঙে যাবে, এমন নয়। কখনও সখনও একটু ‘ভুল’ হতেই পারে। রামের এই মন্তব্য নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে নানা মহলে।

সেই সমালোচনা গড়িয়েছে নানা বিতর্কে। এই ভাবনাকে অনেকেই পুরুষতন্ত্রের প্রতিফলনও বলছেন। বলিউডের ছবিতেও অবশ্য একাধিক বার প্রতারণাকে প্রেমের মোড়কে তুলে ধরা হয়েছে। ‘কভি অলবিদা না কেহনা’, ‘গেহরাইয়াঁ’, ‘লাইফ ইন আ মেট্রো’, ‘বিবি নম্বর ওয়ান’-সহ বেশ কিছু ছবিতে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে ‘রোম্যান্টিক’ কায়দায় দেখানো হয়েছে। যদিও ‘কভি অলবিদা না কেহনা’র মতো ছবিতে প্রতারণার পরে আর প্রাক্তনের কাছে ফিরে যাওয়া দেখানো হয়নি। অন্য দিকে ‘বিবি নম্বর ওয়ান’-এর মতো ছবিতে দেখানো হয়েছে প্রতারক স্বামীর উপলব্ধি। তাকে ফের আগলেও নেয় স্ত্রী। টিকে যায় সম্পর্ক। রামের মন্তব্যেও এমনই বার্তা রয়েছে।

মানুষের প্রেমে পড়ার গতিপ্রকৃতি আজও ব্যাখ্যাতীত। কিন্তু সম্পর্কে জড়ানোর সঙ্গে আসে কিছু মূল্যবোধ ও দায়বদ্ধতা। পরস্পরের সঙ্গে স্বচ্ছতা দাবি করে প্রতিটি সম্পর্কই।অভিনেত্রী শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায় মনে করেন, শুধু প্রেমের সম্পর্ক নয়। যে কোনও সম্পর্কেই প্রতারণার সঙ্গে আপস করা যায় না। তাঁর কাছে প্রতারণা মানেই সম্পর্কের সমাপ্তি। অভিনেত্রী বলেন, “যাঁকে নিজের অমূল্য সময় দিচ্ছি, সে যদি প্রতারণা করে, তার সঙ্গে আর থাকার কোনও প্রশ্নই নেই।” তবে অভিনেতা অঙ্কুশ হাজরার মতে, প্রতারণার পরে একটা সুযোগ দিয়ে সুখী রয়েছেন অনেকেই। “এমন অনেককেই চিনি যাঁরা সম্পর্ককে দ্বিতীয় সুযোগ দিয়েছেন। সঙ্গীকে ক্ষমা করে সবটা ঠিক করে নিয়েছেন এবং বর্তমানে সুখে আছেন।”

কিন্তু হারানো বিশ্বাসে ফিরে পাওয়া কি খুব সহজ বিষয়? প্রত্যেকটি সম্পর্কের ভিন্ন কাহিনি, ভিন্ন সমীকরণ থাকে ঠিকই। কিন্তু মানুষের মনে এক বার প্রতারণার ক্ষত তৈরি হলে, তা নিরাময় হয়? শ্রাবন্তী মনে করেন, যিনি এক বার প্রতারণা করেন, তিনি বার বার করতে পারেন। অভিনেতা ঋষি কৌশিক জানান, প্রত্যেকটি সম্পর্কে প্রত্যেকের ভিন্ন অভিজ্ঞতা। বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যায় না। তাঁর কথায়, “আসলে বিশ্বাস এমন একটা জিনিস, যা ভাঙলে জোড়া লাগে না। প্রতারিত হয়ে হয়তো অনেকেই মানিয়ে নেন, পরিস্থিতির কথা ভেবে পুরোপুরি সম্পর্কটা ভেঙে ফেলেন না। কিন্তু সম্পর্ক কখনওই আগের অবস্থায় আর ফিরতে পারে না।”

বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা, পরকীয়া— এই বিষয়গুলির কি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা রয়েছে? প্রেমের বিষয়ে রাধাকৃষ্ণের উদাহরণ টানা হয় প্রায়ই। তাঁদের প্রেমও তো তথাকথিত ‘বৈধ’ নয়! তা হলে তাঁরা কী ভাবে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠলেন? তাঁরা কি কেবলই পুরাণেই আবদ্ধ। ‘ঘরে বাইরে’, ‘চোখের বালি’, ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’র মতো গল্প-উপন্যাসেও বিবাহবহির্ভূত প্রেমের আখ্যান রয়েছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ পড়েছেন এবং প্রেমের ভাষা শিখেছেন। সেগুলিও কি বইয়ের পাতা পর্যন্তই সীমিত? বাস্তবের চিত্রটা অন্য রকম? সোহিনী সেনগুপ্ত দু’বার না ভেবেই স্পষ্ট জানান, তাঁর অভিধানে তৃতীয় ব্যক্তির কোনও জায়গা নেই। অভিনেত্রীর মতে, প্রতারণা আসলে সঙ্গীর প্রতি অশ্রদ্ধা। তিনি বলেন, “আমার সঙ্গে প্রতারণা মানে আমার মানহানি করা। এই অশ্রদ্ধা কিন্তু সহজে মুছে যায় না। প্রতারণা ও অসম্মান আমি কোনও ভাবেই মেনে নিতে পারব না।” মধ্যযুগের ইংরেজি কবিতা ‘স্যর গোয়েইন অ্যান্ড দ্য গ্রিন নাইট’-এর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “সেখানে পড়েছিলাম, একজন মহিলা সবার আগে শুধু সম্মান চান। তাই প্রতারণার মতো অসম্মান কখনওই মেনে নেওয়া যায় না।”

সমাজে এমন অনেকেই আছেন যাঁরা ঘোষিত ভাবে একাধিক সম্পর্কে থাকেন, তাঁদের বহুগামী বা ‘পলিগ্যামাস’ বা ‘পলিঅ্যামোরাস’ বলা হয়ে থাকে। তাঁদের বাদ দিয়ে যাঁরা চিরাচরিত সম্পর্কে থাকেন, তাঁদের মধ্যে প্রতারণাকে কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না, এমন মত সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের। তাই অভিনেতার স্পষ্ট কথা, “প্রতারণা শব্দটাই তো খুব নেতিবাচক। বিয়ে ভাঙার জন্য কারণ হিসাবে প্রতারণাই যথেষ্ট।”

সম্পর্কের বিষয় প্রায়ই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় নতুন প্রজন্মকে। তাঁদের অভিধানে রয়েছে ‘সিচুয়েশনশিপ’, ‘বেঞ্চিং’, ‘ব্রেডক্রাম্বিং’-এর মতো নতুন নতুন শব্দ। তাঁরা নাকি সম্পর্ক, বিয়ে— এই বিষয়গুলিকে সেই ভাবে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু তাঁদের কাছে প্রতিটি সম্পর্কের ভিন্ন নাম রয়েছে। কোন সম্পর্ক সারা জীবনের আর কোন সম্পর্ক ক্ষণিকের, তারও স্বচ্ছ ধারণা রয়েছে, এমনও মনে করেন অনেকে। ‘জেন জ়ি’ অভিনেতা ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়ও জানান, নতুন প্রজন্ম সম্পর্কের গণ্ডির বিষয়ে যথেষ্ট অবগত। চক্ষুলজ্জার খাতিরে সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখতে হবে, বিয়ে করতে হবে, এমন ভাবনা নয় তাঁদের। তাই বিয়ের ব্যাপারেও আগ্রহী কম তাঁরা। ঋতব্রতের স্পষ্ট বক্তব্য, “প্রতারণার জন্যই বহু দাম্পত্য আজও অসুখী। এ ব্যাপারে আমাদের প্রজন্মের বেশির ভাগই খুব সচেতন। নতুন প্রজন্মের অনেকেই প্রতারণার মতো বিষয় এড়াতে বিয়েতে অনাগ্রহী। বিয়ে করলেও সন্তান নিতে চাইছেন না তাঁরা। অসুখী দাম্পত্যে পরিবারকে জড়ান না তাঁরা। সম্পর্ক থেকে তাঁরা কী চান, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা রয়েছে।”

বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে বলিউডের অভিনেতাদেরও নানা মত রয়েছে। অভিনেত্রী রাধিকা আপ্‌টে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ককে নেতিবাচক আতসকাচে দেখতে চান না বলে জানিয়েছিলেন এক সাক্ষাৎকারে। তিনি মনে করেন, সম্পর্কে বহু ধূসর রং থাকে। সাদা-কালো চোখে সবটা বিচার করা যায় না। তিনি নিজে সম্পর্কে কখনও প্রতারণা করেননি। কিন্তু তা বলে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে নারাজ তিনিও। টলি-নায়ক অঙ্কুশ হাজরার মতে, প্রতিটি যুগলের মধ্য়ে ভিন্ন সমীকরণ থাকে। তবে বুঝতে হবে, কে এক বার ভুলবশত তৃতীয় কারও সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন, আর কার স্বভাব বার বার পিছলে যাওয়া। অভিনেতার কথায়, “হয়তো অনেক সময়ে মোহ তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু কিছু মানুষের স্বভাবই প্রতারণা করা। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি তাঁরা সহজেই আকর্ষিত হন। দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে।” ঐন্দ্রিলা সেনের সঙ্গে ১৬ বছর ধরে সম্পর্কে আছেন অঙ্কুশ। নিজের প্রেমের প্রসঙ্গ টেনে অভিনেতা বলেন, “আমাদের মধ্যে সম্মানের জায়গাটা এখন সবার আগে। পূর্ণ স্বচ্ছতাও রয়েছে। আমার প্রাক্তন সম্পর্কের কথাও ঐন্দ্রিলাকে খোলাখুলি বলি, ও সেটা উপভোগও করে। ও জানে, আমি কেমন।”

প্রতারণারও আবার রকমফের হয়। সেই প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল কাজল ও টুইঙ্কল খন্নার একটি অনুষ্ঠানে। তৃতীয় ব্যক্তিকে শরীর দিলে আপত্তি নেই। তবে তৃতীয় ব্যক্তির সঙ্গে মনের সম্পর্ক গড়ে উঠলে তা বিপজ্জনক। তখন সম্পর্ক ভাঙার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই মন্তব্য নিয়েও আলোচনা হয়েছিল দীর্ঘ। সত্যিই কি তাই? প্রতারণারও কি এমন রকমফের হয়? অনুষ্ঠানে উপস্থিত জাহ্নবী কপূর অবশ্য জানিয়েছিলেন, তাঁর কাছে শারীরিক ও মানসিক— দুই প্রতারণাই সমান। তখন কাজল ও টুইঙ্কল নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রীকে বলেছিলেন যে, বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে বদলে যাবে তাঁর ভাবনাও।

সত্যিই কি সম্পর্কের বয়সও অনেক সময়ে প্রতারণার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে? অঙ্কুশ এই প্রসঙ্গে বলেন, “এমন দেখেছি, ২০ বছর একসঙ্গে রয়েছে সুখী দম্পতি। ২১ তম বছরে কারও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে হয়েছে। তখন কিন্তু আচমকাই সম্পর্ক ভেঙে দেওয়া যায় না। এক বার প্রতারণা করেছেন বলেই কাউকে চরিত্রহীন বলেও দেগে দেওয়া যায় না। তবে সম্পর্কের প্রথম কয়েক বছরে বিষয়টা অন্য রকম হতে পারে।” অভিনেত্রী শ্রাবন্তীর দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্য অন্য রকম। তাঁর কথায়, “যাঁর সঙ্গে এতগুলো বছর থাকলেন, তার সঙ্গেই যদি প্রতারণা করেন, তা হলে তা আরও বেশি করে মানা যায় না।”

শারীরিক ও মানসিক— এই দুই ধরনের প্রতারণা নিয়ে সুজয়প্রসাদ বলেন, “আসলে ব্যক্তিবিশেষে বিষয়টা নির্ভর করে। কেউ যদি তৃতীয় ব্যক্তির সঙ্গে শারীরিক ভাবে লিপ্ত হয়ে এসে সঙ্গীকে সবটা বলতে পারেন, তা হলে তা নিয়ে কিছু বলার নেই। দু’জনের মধ্যে যদি এমন সমীকরণ থাকে, তা হলে তাকে প্রতারণা বলা যায় না। কিন্তু গোপনে অন্য কারও সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।” ঋতব্রতের মত, “যে কোনও প্রতারণাকে প্রতারণা হিসাবেই দেখতে চাই। এর কোনও রকমফের আমার কাছে নেই।” সোহিনী সেনগুপ্তের কাছেও যে কোনও ধরনের প্রতারণাই সমান। তাঁর বক্তব্য, “হয়তো কিছু মানুষের মধ্যে বহুগামী প্রবৃত্তি থাকে। কিন্তু প্রবৃত্তির সঙ্গে বুদ্ধি বিবেচনা কাজে লাগানোও তো মানুষের কাজ। যদি তৃতীয় ব্যক্তি চলে আসে, তা হলে স্থায়ী সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যাওয়াই ভাল।”

কিন্তু সত্যিই কি তৃতীয় ব্যক্তি ঢুকে পড়ায় বহু বছর ধরে যত্নে লালন করা সম্পর্ককে মাটিচাপা দেওয়া যায়? আবার তৃতীয় ব্যক্তির আগমন জেনেও সম্পর্ক বহন করে চলা যায়? এই দুই প্রশ্নেরই নির্দিষ্ট উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন। কথায় আছে ‘প্রেম ও যুদ্ধে, সব কিছুই বৈধ’। সেই প্রেম যদি পরকীয়া হয়ে থাকে? তা হলেও কি বৈধতা বজায় থাকবে? এই তরজার কোনও ইতি আদতেই নেই!

Ram Kapoor Srabanti Chatterjee Rwitobroto Mukherjee Ankush Hazra Rishi Kaushik

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy