ব্যাক্টিরিয়ার ডিএনএ-র ‘ট্রান্সক্রিপশন’ বা প্রতিলিপিকরণ প্রক্রিয়া। সেখানে সিগমা ফ্যাক্টরের কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘলালিত যে ধারণা, তা বদলে গিয়েছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। যক্ষ্মা সৃষ্টিকারী ব্যাক্টিরিয়া, মাইকোব্যাকটিরিয়াম টিউবারকিউলোসিস নিয়ে করা ওই গবেষণা যক্ষ্মা শুধু নয়, অন্য ব্যাক্টিরিয়া-ঘটিত রোগের কার্যকরী ওষুধ তৈরিতে দিশা দেখাবে,আশা গবেষকদের।
গবেষণায় যুক্ত ছিলেন কলকাতার বসু বিজ্ঞান মন্দিরের কেমিক্যাল সায়েন্সের গবেষক জয়ন্ত মুখোপাধ্যায়, নীলাঞ্জনা হাজরা ও অনিরুদ্ধ তিওয়ারি। তাঁদের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে আমেরিকার ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’ ও আন্তর্জাতিক জ়ার্নাল, ‘নিউক্লিক অ্যাসিডস রিসার্চে’। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে যে কোনও ব্যাক্টিরিয়ার ডিএনএ-র ট্রান্সক্রিপশন ‘সিগমা মডেল’ মেনে চলে বলে মনে করা হত। তবে তা সব ব্যাক্টিরিয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বিশেষত, মাইকোব্যাক্টিরিয়াম টিউবারকিউলোসিসেই দেখা গিয়েছে, প্রোটিনধর্মী বিভিন্ন সিগমা ফ্যাক্টরগুলি ট্রান্সক্রিপশন পর্বে অনেকটাই অপ্রত্যাশিত আচরণ করে।
ট্রান্সক্রিপশনে ডিএনএ-র কোনও নির্দিষ্ট অংশের প্রতিলিপি তৈরি হয়ে ‘আরএনএ পলিমারেজ’ উৎসেচকের সাহায্যে আরএনএ অণুতে প্রবেশ করে। প্রথম ধাপে, আরএনএ পলিমারেজ নির্দিষ্ট ‘ডিএনএ সিকোয়েন্স’, যা ‘প্রোমোটর’ হিসেবে পরিচিত, তার সঙ্গে যুক্ত হয়। এতে ডিএনএ-র দ্বিতন্ত্রী গঠন খুলে যাওয়ার সঙ্কেত পায়। পরের ধাপে, ‘আরএনএ পলিমারেজ’ ওই ডিএনএ-র মধ্যে দিয়ে এগোয় ও আরএনএ অণু তৈরি করতে থাকে। এই ধাপকে আরএনএ-র ‘ইলোনগেশন’ বলে।
জয়ন্ত জানান, এ পর্যন্ত ধারণা ছিল, সিগমা ফ্যাক্টর ‘আরএনএ পলিমারেজ’ উৎসেচকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ট্রান্সক্রিপশনের সূচনা করে এবং আরএনএ-র ইলোনগেশন শুরু হলে তা উৎসেচক ত্যাগ করে। সমস্ত ব্যাক্টিরিয়ার জন্য এইসিগমা সাইকেল বা মডেল প্রযোজ্য ছিল। তিনি বলেন, “তবে গবেষণায় আমরা দেখেছি, মাইকোব্যাক্টিরিয়াম টিউবারকিউলোসিস, ব্যাসিলাস সাটিলিসের ট্রান্সক্রিপশনে কিছু সিগমা ফ্যাক্টর আরএনএ পলিমারেজকে ছেড়ে গেলেও কয়েকটি গোটাপ্রক্রিয়া জুড়ে যুক্ত থাকে। এই ঘটনা এত দিনের প্রচলিত ধারণার সঙ্গে মেলে না।”
তিনি আরও জানান, মূলত তিন ধরনের সিগমা ফ্যাক্টরের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে—‘সিগমা এ’, ‘সিগমা ই’ ও ‘সিগমা এফ’। এদের মধ্যে সিগমা এ ও সিগমা ই আরএনএ-র ইলোনগেশন শুরুর পরে পরেই বা খানিক বিলম্বে উৎসেচকের সঙ্গ ছাড়ে। কিন্তু ‘সিগমা এফ’ ট্রান্সক্রিপশনের অগ্রগতির পরেও উৎসেচকের সঙ্গে জুড়ে থাকে। এতে প্রমাণিত হয়, নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে চলার বদলে প্রয়োজনে ব্যাক্টিরিয়া জিনগত পরিবর্তনের স্বার্থে নীতি বদলাতে পারে।
যক্ষ্মা পৃথিবীর সংক্রমিত মারণ রোগগুলির অন্যতম। বিশেষত, তার ড্রাগ-প্রতিরোধক স্ট্রেনগুলি চিকিৎসকের কাছে যথেষ্ট মাথাব্যথার কারণ। যক্ষ্মার ব্যাক্টিরিয়া মানবদেহে চরম প্রতিকূল পরিবেশেও প্রয়োজনীয় জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে টিকে থাকার ক্ষমতা রাখে।
জয়ন্তের মত, বর্তমানে সিগমা ফ্যাক্টরের আচরণ সম্পর্কে জানার পরে যক্ষ্মা শুধু নয়, অন্য ব্যাক্টিরিয়া-ঘটিত রোগের সুনির্দিষ্ট ওষুধ তৈরিও দিশা পেতে পারে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)