Advertisement
E-Paper

পূর্ব দিকে সরে আসছে ক্যারিবিয়ান ও আমেরিকান পাত! দ্বৈত সংঘাতেই এমন ভয়াল ভূমিকম্পের শিকার ভেনেজ়ুয়েলা

বুধবার ভেনেজ়ুয়েলায় স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিট নাগাদ প্রথম বার কম্পন অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৭.২। তার ঠিক ৩৯ সেকেন্ডের মাথায় ফের কেঁপে ওঠে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ। এ বার মাত্রা ৭.৫।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬ ০৯:০০
ভেনেজ়ুয়েলার নীচে ক্যারিবিয়ান পাত এবং দক্ষিণ আমেরিকান পাতের গতিবিধি।

ভেনেজ়ুয়েলার নীচে ক্যারিবিয়ান পাত এবং দক্ষিণ আমেরিকান পাতের গতিবিধি। গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ।

মাত্র ৩৯ সেকেন্ড। সামান্য ব্যবধানে পর পর দু’বার থরথর করে কেঁপেছে ভেনেজ়ুয়েলার মাটি। তাসের ঘরের মতো ঝরে পড়েছে উঁচু উঁচু ইমারত। ইট-কাঠ-কংক্রিটের জঙ্গল প্রকৃতির এক মুহূর্তের খেয়ালে কী ভাবে খেলাঘরে পরিণত হতে পারে, গত বুধবার তার সাক্ষী থেকেছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ। বিজ্ঞানীদের দাবি, এত তীব্র ভূমিকম্পের নেপথ্যে রয়েছে ভূ-পাতের বিশেষ এক ধনের অবস্থান। ২০২৩ সালে তুরস্ক-সিরিয়া এবং ২০২৫ সালে মায়ানমারেও এই ধরনের ভূমিকম্প হয়েছিল বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিট নাগাদ প্রথম বার ভেনেজ়ুয়েলায় কম্পন অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে তার মাত্রা ছিল ৭.২। এই কম্পনের উৎস উত্তর ভেনেজ়ুয়েলার স্যান সেবাস্তিয়ান ফল্ট। তার ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতে ৩৯ সেকেন্ড পরেই ৬টা ৫ মিনিটে ফের ভূমিকম্প হয়। এ বার রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ছিল আরও বেশি, ৭.৫। স্যান সেবাস্তিয়ান ফল্টেই আগের উৎস থেকে কিছুটা দূরে এই দ্বিতীয় কম্পন তৈরি হয়েছিল। ভেনেজ়ুয়েলার এই জোড়া ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যে হাজারের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। দেশের বিস্তীর্ণ অংশ এখন কেবল ধ্বংসস্তূপ। উদ্ধারকাজ চলছে। বহু মানুষের কোনও খোঁজ মেলেনি এখনও।

বিজ্ঞানীদের মতে, ভেনেজ়ুয়েলার এই বিপর্যয়ের নেপথ্যে রয়েছে মাটির নীচে দ্বৈত আঘাত। এই ধরনের ভূমিকম্পকে ‘ডাবলেট’ বলা হয়। কারাকাসের পশ্চিমে স্যান ফেলিপ শহরে প্রথম ভূমিকম্পটি হয়েছিল। মার্কিন জিয়োলজিক্যাল সার্ভে জানিয়েছে, ৭.২ মাত্রার প্রথম কম্পন নিকটবর্তী আর একটি ফাটলে চাপ দিয়েছিল। তার ফরে ৩৯ সেকেন্ডের মাথায় ফের জোরালো কম্পন হয়, যার তীব্রতা প্রথমটির চেয়েও বেড়ে গিয়েছিল। দু’টি কম্পনের উৎসের ব্যবধান ছিল মাত্র তিন মাইল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দ্বিতীয় কম্পনের উৎসের গভীরতা খুব বেশি ছিল না। মাটি থেকে মাত্র ছ’মাইল গভীরে ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। তার ধাক্কা অনুভব করা গিয়েছে সুদূর ব্রাজ়িলের উত্তর অংশ পর্যন্ত।

বিজ্ঞানীদের মতে, ভূমিকম্পে এই ধরনের ‘ডাবলেট’ বিরল হলেও একেবারেই যে দেখা যায় না, তেমন নয়। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও তুলনামূলক ভাবে বেশি হয়। ২০২৩ সালে তুরস্ক-সিরিয়ায় এই ধরনের ভূমিকম্প হয়েছিল। পর পর দু’বারের কম্পনে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল দু’টি দেশ। প্রথম কম্পনটি হয়েছিল ৭.৮ মাত্রায়। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফের ৭.৬ মাত্রায় কেঁপে উঠেছিল তুরস্কের মাটি। দুই দেশ মিলিয়ে ভূমিকম্পে সে বার মৃত্যু হয় ৬২ হাজারের বেশি মানুষের। তুরস্কের ভূকম্পন বিশারদ সুলেমান নালবান্ট এই জোড়া কম্পন নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর মতে, তুরস্কের যে পাত ভূমিকম্প ঘটিয়েছে, তার নির্দিষ্ট ফাটলের উপর গত দু’শো বছর ধরে চাপ তৈরি হচ্ছিল। প্রাথমিক ভাবে জোড়া কম্পনের নেপথ্যে ছিল সেই চাপই। প্রথম কম্পন থেকে চাপ নিকটবর্তী অন্য একটি চ্যুতিতে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়ে যায়। ফলে সেখানেও তীব্র ভূমিকম্প হয়। নালবান্টের কথায়, ‘‘এটা একটা খুব জটিল, ধারাবাহিক প্রক্রিয়া ছিল। দীর্ঘমেয়াদি ঐতিহাসিক চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তাৎক্ষণিক ধাক্কা।’’

ভেনেজ়ুয়েলাতেও তেমন কাণ্ড ঘটেছে। দক্ষিণ আমেরিকার ভূমিকম্পপ্রবণ বলয়ের মধ্যেই ভেনেজ়ুয়েলার অবস্থান। এখানে ক্যারিবিয়ান পাত দক্ষিণ আমেরিকান পাতের সঙ্গে ক্রমশ পূর্ব দিকে সরছে। পাতগুলিতে এমন কিছু চ্যুতি রয়েছে, যেখানে কখনও দু’টি ভূ-ফলক একে অপরের গা ঘেঁষে অনুভূমিক ভাবে সরে সরে যায়। কখনও আবার ভূ-ফলকগুলি বাধা পেয়ে সম্মিলিত চাপ তৈরি করে। হঠাৎ ধরে ফাটল! বুধবারও সেই ঘটনাই দেখা গিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূকম্পন বিশারদ মার্ক কুইগলের মতে, ভূমিকম্পের ফলে ওই অঞ্চলের সর্বত্র ভূমিধস নামে। মাটিও নরম হয়ে এসেছিল। মূলত পার্বত্য এলাকা। পাহাড়ের মধ্যে একটি সমতলে কারাকাস শহরটি গড়ে উঠেছে। এই সমতলের পলি ভূকম্পন তরঙ্গকে তীব্রতর করে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই ধরনের ভূমিকম্পকে ‘স্ট্রাইক স্লিপ’ ভূমিকম্পও বলা হয়। তাতে একটি পাতের নীচে জোর করে ঢুকে পড়ে অপর পাত। তুরস্ক-সিরিয়ার ভূমিকম্প, মধ্য মায়ানমারে গত বছরের ভূমিকম্পও ছিল ‘স্ট্রাইক স্লিপ’। মায়ানমারের বিপর্যয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ। ভেনেজ়ুয়েলার কম্পনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী কারাকাস। তা ছাড়া, লা গুয়েরা, মিরান্ডার মতো প্রদেশে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভূমিকম্পের কেন্দ্রে ছিল ইয়ারাকুই প্রদেশের ইয়ুমারে শহর। শুধু লা গুয়েরাতেই ১০০টির বেশি বহুতল ধসে পড়েছে। ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে বহু হোটেল। ভেনেজ়ুয়েলায় প্রকৃতির এই তাণ্ডব নিয়ে আগামী দিনে বিশদে গবেষণায় আগ্রহী অনেকেই।

venezuela Earthquake South America Tectonic plates

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy