Advertisement
E-Paper

দল ভাঙা হাট, প্রতীকও মমতার হাতছাড়া হওয়ার অপেক্ষায়! ৭৭-এ সব হারিয়েও ইন্দিরা ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন, দিদি কি পারবেন?

বিপুল পরাজয়ের পর দল, প্রতীক, সবই হাতছাড়া হয়েছিল ইন্দিরার। স্বমহিমায় ফিরেছিলেন তিন বছরের মাথায়। ‘সর্বহারা’ দিদির কাছেও আছে তিন বছর সময়। ২০২৯-এর লোকসভা। কিন্তু নেই অনেক কিছুই।

স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬ ০৮:৫৫
Indira Gandhi fought back after her debacle but it is not easy for Mamata Banerjee

(নীচে বাঁ দিক থেকে) ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষদস্তিদার, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ফিরহাদ হাকিম। (পিছনে) ইন্দিরা গান্ধী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

আছেন, না ফুরিয়ে গিয়েছেন?

মুখ্যমন্ত্রিত্ব, বিধায়ক পদ গিয়েছিল ৪ মে। সে দিনই সন্ধ্যায়, মমতার অন্যতম সেনাপতি থেকে নিয়তি হয়ে ওঠা শুভেন্দু অধিকারী জানিয়ে দেন, মমতার ‘রাজনৈতিক সন্ন্যাস’ হয়ে গিয়েছে। ঘটনাক্রম দেখাচ্ছে, মমতার নিজের দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদ-বিধায়করাই আজ তাঁকে রাজনৈতিক সন্ন্যাসে পাঠাতে চাইছেন। যে মমতাকে ফোনে পাওয়া ছিল দুষ্কর এই দুই-তিন মাস আগেও, আজ তাঁর ফোন আর ধরছেন না অনেকেই।

হারের পর দু’মাস কাটেনি। প্রায় হাতছাড়া দল। যাঁদের সাংসদ, মন্ত্রী, মেয়র, চেয়ারপার্সন, বিধায়ক বানিয়েছিলেন, তাঁকে ঘিরে থাকতেন যে সব নট-নটী তারকাকুল—নেই কেউ। কাকলি ঘোষদস্তিদার, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাসের মতো দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠেরা আজ মমতার শত্রু। সিপিএম থেকে উড়ে এসে তৃণমূলে জুড়ে বসা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছেন দলের তাবড় প্রাক্তন নেতারা। যাঁকেই দলের কোনও দায়িত্ব দিচ্ছেন মমতা, তিনিই দায়িত্ব ছেড়ে উল্টো শিবিরে নাম লেখাচ্ছেন!

জেলা পরিষদ, পুরনিগম থেকে পঞ্চায়েত, ইতিমধ্যেই গিয়েছে বেশ কিছু; যাওয়া নিশ্চিত আরও। বিক্ষুব্ধরা পুলিশে অভিযোগ করে দলের কয়েকশো কোটি টাকা থাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ় করিয়ে দিয়েছেন। পাল্টা অধিবেশন ডেকে তাঁকেই সরিয়ে দিয়েছেন দলের মাথা থেকে। তাঁরাই আসল তৃণমূল, দাবি জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের কাছে। দলের প্রতীকটাও তাঁরাই চাইবেন।

ইন্দিরা গান্ধীকেও তাঁর দলের নেতারা বহিষ্কার করেছিলেন। ১৯৬৯-এ। ১৯৭৭-এর নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবির পর নতুন দলেও বিদ্রোহের মুখে পড়েছিলেন ইন্দিরা। কিন্তু দু’দু’বারই স্বমহিমায় ফিরে এসেছিলেন। বিক্ষুব্ধরা নিশ্চিহ্ন।

মমতার ক্ষেত্রে এখানে একটা তফাত আছে। ইন্দিরার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ আর্থিক নয়, ছিল রাজনৈতিক। তিনি স্বৈরাচারী। তৃণমূলের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ দুর্নীতির। দল ক্ষমতায় থাকতেই মমতার অন্যতম বিশ্বস্ত সঙ্গী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বান্ধবীর ডেরা থেকে বেরিয়েছিল কোটি কোটি কাঁচা টাকা। ক্ষমতা হারানোর পর নেতাদের চাষজমির তলা থেকেও বেরোচ্ছে। সব্যসাচী দত্ত ও তাঁর কথিত বান্ধবীর থেকে পাওয়া গেছে কয়েক কেজি সোনা। কাটমানি, তোলাবাজিতে ভুক্তভোগী রাজ্যের বহু মানুষ। সুতরাং, মমতাকে কিন্তু নিজেকে ‘সততার প্রতীক’ হিসেবে এ বার সত্যিই প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সেটা হয়তো খুব সহজ হবে না। ইলেক্টোরাল বন্ড থেকে দলের বিপুল রোজগার মানুষের নজর কেড়েছিল। তাঁর প্রধান সহযোগীদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির নানা রকম অভিযোগ। পাড়ায় পাড়ায় নেতাদের ঠাটবাট চাক্ষুষ দেখেছেন মানুষ।

এটা ঠিক, এখনও মমতার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত দুর্নীতির কোনও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসেনি। কিন্তু তাঁর পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের সম্পত্তির ‘অস্বাভাবিক বৃদ্ধি’ নিয়ে সিপিএম যে অভিযোগ গত প্রায় এক দশক করে আসছে, তা বিজেপি সরকার অগ্রাহ্য করবে, এমন সম্ভাবনা কমই। ইতিমধ্যেই তৃণমূল আমলের দুর্নীতি নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশের কথা বিধানসভায় বলেছেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত।

মমতা নিজেই স্বীকার করেছিলেন, মৃতদেহ সৎকারের জন্য ‘সমব্যথী’ প্রকল্পের ২০০০ টাকা থেকেও নেতারা কাটমানি নেন। শহরে কোনও নেতার নাম হয়ে গেল ‘স্কোয়্যার ফিট সেন’, কারও-বা ‘গ্যারাজ মজুমদার’। গ্রামে বিঘার পর বিঘা জমি, বাগান, ভেড়ি, চোখ ধাঁধানো বাড়ি ও গাড়ি।

আজ মমতা রাস্তায় নামতে চাইলে এঁদের কার জোর আছে তাঁর পাশে এসে ভিড় বাড়ানোর?

তা ছাড়া, তিনি নিজে করলেন কী? নন্দীগ্রামে যে শেখ সুফিয়ানের জাহাজবাড়ি দেখে মমতা বললেন, ও বাড়িতে কোনও দিন পদার্পণ করব না, সেই সুফিয়ানের হাতেই সঁপলেন নির্বাচনের দায়িত্ব। স্কুলে চাকরি নিয়ে এত বড় কেলেঙ্কারির পরও এ বারের প্রার্থী তালিকার প্রথম নামই ছিল সেই দুর্নীতিতে নাম জড়ানো পরেশ অধিকারীর। বার্তা পরিষ্কার।

আগে লোকে ভাবত, দিদি ভাল, কিন্তু ভাইদের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ নেই; ক্রমশ বার্তা গেল যে এ সব কিছু দিদির আশকারাতেই হচ্ছে। যাঁরা সরাসরি আশকারার কথা মানতে চাইলেন না, তাঁরাও বললেন, দিদির কিছু করার নেই; তাঁর দলে এ রকম ছাড়া লোক পাওয়া যায় না। কিন্তু আরজি কর কাণ্ডে প্রকট হয়ে উঠল দিদির প্রশ্রয়। প্রবল চাপের মুখে অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ সকালে ইস্তফা দিলেও বিকালেই তাঁকে ন্যাশনাল মেডিক্যালের অধ্যক্ষ পদে বদলি করা হয়। বার্তা পরিষ্কার, দিদি কাউকে বাঁচাতে চাইছেন।

তার ওপরে ভয়ের পরিবেশ। বাম আমলের অনিল বসুদের ছাপিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তৃণমূলের উদয়ন গুহ, শওকত মোল্লারা। সিপিএমের আমলের কেশপুর-আরামবাগ মডেলকে টেক্কা দিতে চেয়েছিল বীরভূম বা ডায়মন্ড হারবার মডেল। পুলিশকর্তাকে ফোন করে চোদ্দো গুষ্টির ষষ্ঠীপুজো করে দিয়েও অনুব্রত মণ্ডল রয়ে গেলেন বহাল তবিয়তে, বুক বাজিয়ে। বার্তা পরিষ্কার।

শুধু কি বিরোধী? আতঙ্কের পরিবেশ তো দলের মধ্যেও। সবাই অভিষেক ও আইপ্যাকের ভয়ে তটস্থ। বিদ্রোহ করলেই পেছনে লাগবে পুলিশ। নির্বাচনী প্রচার কালে আইপ্যাক সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে উত্তরবঙ্গের এক তৃণমূল নেতা আনন্দবাজার ডট কম-কে বলেছিলেন, নিজেদেরকে কর্মচারী বলে মনে হত তাঁদের, যেন মালিক বা তাঁর প্রতিনিধির নির্দেশ পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন।

এমনকি এখন যিনি রোজ মমতার হয়ে গলা ফাটাচ্ছেন, সেই কুণাল ঘোষও বলছেন, দলে ভাঙনের সব দোষ বিজেপি-কে দিলে হবে না। যাঁরা গিয়েছেন, তাঁদের যেমন নিজস্ব স্বার্থ আছে, তেমনই দলের যাঁরা শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁরা কোনও ভাবেই দায় এড়াতে পারেন না। নেতারা কেউ দুষছেন অভিষেকের প্রতি ‘অন্ধ স্নেহ’কে, কেউ বলছেন তাঁর তাঁবেদারি-মুগ্ধতার কথা।

১৯৭৮এর জানুয়ারিতে, মহারাষ্ট্রের এক জনসভায় প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছিলেন ইন্দিরা। জরুরি অবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেও সে সময় সংঘটিত সমস্ত ভুল ও বাড়াবাড়ির পুরো দায়ভার তিনি নিজেই নেওয়ার কথা বলেন। এমনকি অন্যদের ভুলের দায়ও।

কিন্তু মমতা তো দায় নেওয়ার রাজনীতি করতে অভ্যস্ত নন। তিনি দায় চাপানোর রাজনীতিই করেন। এ বারও, দল হারার পরে এসআইআর এবং গণনায় কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন। তুলতেই পারেন। আদালতে গিয়েছেন। অবশ্যই যেতে পারেন। কিন্তু রায়ে যে জনতার রোষের প্রতিফলনও ঘটেছে, এক বারও মানলেন না।

এত বড় বিপর্যয়, তার পর প্রথম যে সাক্ষাৎ বিধায়কদের সঙ্গে, সেখানে আত্মসমীক্ষার বদলে সবাইকে বললেন অভিষেকের লড়াইকে সম্মান জানিয়ে উঠে দাঁড়াতে। আলোচনা-সমালোচনা বন্ধ করতে নির্দেশ দিলেন অভিযোগ থাকলে লিখিত দিতে। মামলা মোকদ্দমায় বেশি দরকার মনে করে হঠাৎ কাকলিকে সরিয়ে কল্যাণকে লোকসভায় মুখ্যসচেতক করে দিলেন। কারও সঙ্গে আলোচনা না-করেই চন্দ্রিমাকে রাজ্য সভাপতি করে দিলেন।

বস্তুত, এত দ্রুত তৃণমূল ভাঙিয়ে সাফ করে দেওয়ার পরিকল্পনা সম্ভবত বিজেপির ছিল না। হারের পর দলের অন্দরে ক্ষোভের আগুনে তিনিই ঘি ঢালেন। বিধায়ক-সাংসদদের একটা বড় অংশ মনে করেন, দিদি এ বার সবাইকে নিয়ে ডুববেন। লোহা গরম দেখেই বিজেপি দ্রুত হাতুড়ির খোঁজ করে।

তৃণমূলের সংগঠন ও তার ধসে পড়াটা, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের মতে, একটা বিজ়নেস মডেলের সঙ্গে তুলনীয়। যে মডেল ক্ষমতা আর ব্র্যান্ড ভ্যালুর উপর দাঁড়িয়ে। তাঁর মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সাধারণ ঘর থেকে উঠে আসা অদম্য সংগ্রামী এক মহিলা হিসেবে মমতার একটা ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি হয়েছিল। এই ব্র্যান্ড দলের অন্য নেতাদের স্ব-স্ব অঞ্চলে ক্ষমতা বিস্তারে কাজে আসে। সেই ক্ষমতার সুবাদে এই নেতারা অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও লক্ষ্মীলাভ করেন। লাভের একটা অংশ দলের ওপরতলার পুষ্টিবৃদ্ধি করে।

ম্যাকডোনাল্ডস বা মনজ়িনিস-এর মতো বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডের যেমন স্থানীয় ফ্র্যাঞ্চাইজ়ি থাকে, এই নেতাদের অবস্থা খানিকটা সে রকম। এঁদের সূত্রেই দলের সংগঠন বাড়ে। কিন্তু বিভিন্ন অঞ্চলে একচ্ছত্র প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার লড়াই থেকে তৃণমূলের গোষ্ঠী সংঘর্ষও একটা ভয়াবহ রূপ নেয়।

সাধু ও অসাধু উপায় চলতে থাকা এই ফ্র্যাঞ্চাইজ়ি মডেলের মূল শর্ত ছিল সরকার ও পুলিশের সুরক্ষা। যে মুহূর্তে সরকারের পতন ঘটল, আর মমতা নিজের কেন্দ্রেই পরাজিত হলেন, দলের আঞ্চলিক নেতাদের জীবনরক্ষাই কঠিন হয়ে পড়ল। অঞ্চলে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ তো ছিলই, সঙ্গে যোগ হল প্রতিযোগী নেতাদের বদলা নেবার পরিস্থিতি।

দ্বৈপায়নের মতে, ২০২১-এ মমতা ব্যক্তিগত ভাবে নন্দীগ্রামে হারলেও তৃণমূল ২১৩ জন বিধ্যায়ক নিয়ে সরকারে আসায় ফ্র্যাঞ্চাইজ়ি ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। কিন্তু ২০২৬-এ মমতার হারের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের পতন এই নেতাদের সম্পূর্ণ অরক্ষিত করে তোলে। ফলে, এই ফ্র্যাঞ্চাইজ়ির সঙ্গে থেকে লাভ নেই বুঝে নেতারা নেত্রীর সঙ্গ ছেড়ে দেওয়া শুরু করেন। সম্পর্ক ছিল মূলত লেনদেনের। লেনদেন ফুরিয়ে গেছে।

যে ভাবে তাঁর দল হাতছাড়া হল, তাতে সহানুভূতির হাওয়া পেতে পারেন মমতা, ভাবছেন কেউ কেউ। এ ভাবেই অনেকে ভেবেছিলেন, মহারাষ্ট্রে দল হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় শিবসেনার উদ্ধব ঠাকরে বা এনসিপির শরদ পাওয়ার সহানুভূতির হাওয়া পাবেন। সহানুভূতি কতটা পেয়েছিলেন, পরিমাপের উপায় নেই; তবে ভোট ধরে রাখতে পারেননি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে, আবার ফিরতে গেলে মমতার সম্ভবত সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের মতো কোনও বড় ঘটনা লাগবে। কিন্তু কোনও বড় ঘটনা নিয়েও পথের আন্দোলন গড়ার জোর তাঁর কি আর আছে? সামনের উপনির্বাচনে যদি নিজের জোড়াফুল প্রতীক ধরে রাখতে না-পারেন, পারবেন অন্য কোনও প্রতীকে ভোট টানতে?

মমতা নিজেকে চিরকাল শক্তিশালী নেতা হিসেবে দেখিয়েছেন। বাম আমলে বলেছিলেন, ‘‘আমাকে মস্তানের ভয় দেখাবেন না, আমি গুন্ডা কন্ট্রোল করি।’’ আজ সে কথা বলার জোর আছে? লোকে প্রশ্ন করবে না, এতই যদি ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’, তা হলে এত দিন এই মক্কেলদের কন্ট্রোল করলেন না কেন?

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রণবীর সমাদ্দারের মতে, দলটা এ ভাবে কর্পূরের মতো উবে যাওয়ার দায় মমতারই। নির্বাচনে হার-জিত থাকেই, কিন্তু তাঁর দলের ক্ষেত্রে হেরে যাওয়াটা এত বড় সঙ্কট হয়ে উঠল একাধিক কারণে।

প্রথমত, তিনি নীতিভিত্তিক রাজনীতি করেননি, করেছেন কৌশলের রাজনীতি। কৌশলগত দক্ষতার কারণে দীর্ঘদিন সাফল্যও পেয়েছেন। কিন্তু পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্পর্কে তাঁর কোনও রণনীতিগত বোঝাপড়া তৈরিই হয়নি। ফলে, তিনি দলের মধ্যে কোনও প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তুলতে পারেননি। তাই হারার সঙ্গে সঙ্গে নেতাদের মধ্যে পালানোর প্রবণতা তৈরি হয়।

দ্বিতীয়ত, হারার পরে নেত্রীর শারীরিক ভাষা কর্মী-সমর্থকদের আরও ভেঙে দেয়। “দ্বিতীয় দিন থেকেই তো রাজনৈতিক হিংসা শুরু হয়ে গিয়েছে। অথচ, নেত্রী প্রায় দু’সপ্তাহ ঘরে বসে রইলেন। দল কোনও দিক নির্দেশনাই পেল না।”

তৃতীয়ত, জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির বাইরে বাংলার উন্নয়ন বা জাতীয় পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর কোনও ভিশন ছিল না। ফলে, তিনি কোনও এজেন্ডা সেট করতে পারেননি। “রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু হয় না। ঘুরে দাঁড়াতে গেলে তাঁকেই এজেন্ডা সেট করতে হবে। তবে এখনও পর্যন্ত যা দেখছি, আমার মনে হয় না সেই ক্ষমতা তাঁর আর আছে,” রণবীর বলেন।

বিজেপির বিরুদ্ধে তাঁর এজেন্ডা এখনও কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। শুভেন্দু সরকারের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত এমন বাজেট বানিয়েছেন যে ‘ট্রেড মিলে’ বাজেট বানানোর মতো প্রখর বুদ্ধির দাবি করা নেত্রী পাঁচ দিন পরেও কোনও প্রতিক্রিয়া দিয়ে উঠতে পারেননি।

দলীয় সূত্রে ইঙ্গিত, ভোট জালিয়াতি, খাদ্যাভ্যাস, অভিন্ন দেওয়ানি বিধির মতো বিষয়গুলি নিয়ে তিনি আক্রমণ শানানোর কথা ভাবছেন। গত কয়েক বছরের ভোটের প্রবণতা অবশ্য দেখাচ্ছে, হিন্দু জাতীয়তার বাইরে অর্থনৈতিক ইস্যুই সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে।

তা ছাড়া, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি এতটাই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এসেছে—তদুপরি আছে দিল্লির ক্ষমতা—যে, রাজ্যের শুভেন্দু অধিকারী সরকার সহসা মুখ থুবড়ে পড়বে বা কাজ করতে পারবে না, এ রকম সম্ভাবনা বিশেষ দেখছেন না কেউই। আর দিল্লির রাজনীতির জন্য, অর্থাৎ মোদীর ব্যর্থতার প্রশ্ন উঠলে, দিদির থেকে রাহুল গান্ধীর গ্রহণযোগ্যতা বেশি।

সর্বোপরি, সারা দেশেই বিজেপি যে রাজনীতিটা করে, সেটা ‘আমরা’র রাজনীতি। অনেকে মিলে একেকটা যুদ্ধের পরিকল্পনা ও রূপায়ণ হয়। একমাত্র ‘আমরা’র রাজনীতিতেই বিরোধীদের কাছে যেটুকু সুযোগ। কিন্তু মমতা বার বার ইন্ডিয়া ব্লককে দুর্বল করেছেন, নীতীশ কুমারকে অকারণ খুঁচিয়েছেন, কংগ্রেসকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বাংলায় জোট সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুরে বিজেপির জয়ের পথ প্রশস্ত করেছেন।

বর্তমানে তাঁর যে ‘একের বিরুদ্ধে এক’ ফর্মুলা, সেটা তো চালু করতে হলে এই উপনির্বাচনেই করা উচিত। পারবেন, বাম বা কংগ্রেসকে আসন ছেড়ে দিয়ে নিঃশর্ত সমর্থন দিতে?

দিদি কী করবেন? ‘আমি’ ছেড়ে ‘আমরা’র লড়াইতে নামবেন? না কি আবার রাস্তায় নামতে চাইবেন ‘একাই একশো’ মেজাজে? আপাতত বলছেন, ২১ জুলাই ধর্মতলাতেই সভা হবে। পাঁচ জন কর্মী থাকলেও তিনি যাবেন।

অনুমতি পেলেও কতটা সাড়া পাবেন? আর অনুমতি না-পেলে? দ্রুতই পরিষ্কার হতে চলেছে সেই ছবি।

Mamata Banerjee Indira Gandhi

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy