শিশু কি ভোজনবিলাসী? অল্প খেয়ে তার তৃপ্তি হয় না? বকাবকি করলেও খাই খাই প্রবৃত্তি যায় না? এর জন্য শিশুকে দোষ দিলে হবে না। দায়ী কিন্তু মা-বাবাই। সন্তানের ওজন বাড়লেও কেবল তার খাওয়াদাওয়ার দোষ দিলে হবে না। শিশু বেশি পরিশ্রম করে না, জাঙ্ক ফুড খায়, এ সব একমাত্র কারণ নয়। শিশুর ওজন বৃদ্ধির জন্য দায়ী বাবা-মাও। এমনটাই দাবি গবেষণায়। বাবা-মায়ের ওজন যদি বেশি হয়, তা হলে শিশুও স্থূল হতে পারে। কী ভাবে তা সম্ভব, ব্যাখ্যা করেছেন গবেষকেরা।
‘বিএমআই’ শব্দটি আর অপরিচিত নয়। চারদিকেই ওজন কমানোর যা হিড়িক পড়েছে, তাতে ‘বিএমআই’ বা ‘বডি মাস ইনডেক্স’ কথাটি এখন বেশ পরিচিতই। ‘বিএমআই’ অর্থাৎ, বডি মাস ইনডেক্স মানে হল, ওজন ও উচ্চতার অনুপাত। এটি যত বেশি হবে, ততই তা খারাপ। ‘বিএমআই’ ৩০ বা তার বেশি হলে তাকে স্থূলত্ব বলেই ধরে নেওয়া হয়। এই ‘বিএমআই’-এর সঙ্গে কেবল খাওয়াদাওয়া বা অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন জড়িত নয়, এর সঙ্গে জিনের সংযোগ আছে বলেও দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ, বাবা-মায়ের ‘বিএমআই’ যদি বেশি হয় বা অভিভাবকেরা যদি স্থূলত্বের শিকার হন, তা হলে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও সেই স্থূলত্বের জিন বাহিত হতে পারে বলেই দাবি। ব্রিটেনের ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং নরওয়েজিয়ান ইনস্টিটিউট অফ পাবলিক হেল্থের গবেষকেরা এমনই দাবি করেছেন। ‘প্লস মেডিসিন’ জার্নালে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।
আরও পড়ুন:
স্থূলত্বের জিন বাবা-মায়ের থেকে সন্তানের মধ্যেও আসে?
১৯৯৯ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রায় ৮৬,০০০ শিশুর উপর সমীক্ষা চালানো হয়। গবেষকেরা ৫ থেকে ৮ বছর বয়সি শিশুদের সঙ্গে তাদের বাবা-মায়ের বিএমআই-এর তুলনা করেন। দেখা যায়, শিশুরা যত বড় হতে থাকে, ততই তাদের বিএমআই-এর মাত্রা বাড়তে থাকে। তার সঙ্গেই শিশুদের জিনগত পরীক্ষা করেও দেখা যায়, বাবা-মায়ের শরীরে থাকা স্থূলত্বের জিনের সঙ্গে শিশুর শরীরের থাকা জিনের প্রায় ৯৪ শতাংশ মিল রয়েছে। অর্থাৎ, বাবা-মায়ের থেকে সে সব জিন শিশুর শরীরেও এসেছে। বাবা-মা স্থূল হলে সন্তানেরও স্থূলকায় হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়, গবেষণায় দাবি এমনটাই। সন্তানের চেহারার গড়ন কেমন হবে, ওজন কত বেশি হবে, তা নির্ধারণ করে জিনই।
গবেষকেরা জানাচ্ছেন, স্থূলতার জন্য কোনও একটি নির্দিষ্ট জিন দায়ী নয়, বরং একাধিক জিন রয়েছে এর নেপথ্যে। সেগুলির অধিকাংশই বাবা-মায়ের থেকে সন্তানের মধ্যে আসে এবং শিশুর বিপাকক্রিয়া ও হজমক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। একে বলে ‘পলিজেনিক ওবেসিটি’। কিছু জিনের প্রভাবে শিশুরা লোভনীয় কোনও খাবার দেখলে বা গন্ধ পেলেই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। খিদে না পেলেও তা খাওয়ার বায়না করে। আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে শিশুর মধ্যে ‘বিঞ্জ ইটিং’-এর প্রবণতা তৈরি হয়। গবেষণায় এমনও দেখা গিয়েছে, বাবা-মায়ের শরীর থেকে আসা কিছু জিন শিশুর শরীরে বিপাকক্রিয়ার হার কমিয়ে দেয়, অতিরিক্ত ক্যালোরি পোড়ানোর ক্ষমতাও নষ্ট হয়। ফলে শিশু যা খায়, তা মেদ হয়ে জমতে থাকে শরীরে।
আরও পড়ুন:
দায়ী কোন কোন জিন?
স্থূলত্বের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী ‘এফটিও’ জিন। মা বা বাবার শরীর থেকে এই জিন সন্তানের শরীরে এসে তা সরাসরি মস্তিষ্কের 'হাইপোথ্যালামাস' অংশকে প্রভাবিত করে। ফলে শিশু ভোজনবিলাসী হয়। অল্প খেয়ে তার তৃপ্তি হয় না। শৈশবকালীন স্থূলতার কারণ এই জিন।
‘এলইপি’ ও ‘এলইপিআর’ জিনও বাবা-মায়ের থেকেই আসে শিশুর শরীরে। ‘লেপটিন’ হল এমন এক হরমোন, যা খাওয়াদাওয়ায় নিয়ন্ত্রণ রাখে। কখন খিদে পাবে আর কখন নয়, তা এই হরমোনই নিয়ন্ত্রণ করে। এই হরমোনকে আবার নিয়ন্ত্রণ করে ‘এলইপিআর’ জিন। সেটিতে যদি ত্রুটি থাকে, খিদে না পেলেও খাওয়ার ইচ্ছা জাগে।
আরও একটি জিন বাবা-মায়ের থেকে সন্তানের মধ্যে আসে, যার নাম ‘পিএমওসি’। বাবা-মায়ের শরীর থেকে এই জিনের ত্রুটিপূর্ণ সংস্করণ এলে শিশুর বিঞ্জ ইটিংয়ের প্রবণতা বাড়ে যা স্থূলত্বের কারণ হয়ে উঠতে পারে।