Advertisement
E-Paper

চাঁদ থেকে ছিটকে আসা পাথর পড়েছিল আফ্রিকার মরুভূমিতে! প্রাণ তখন আসি আসি করছে পৃথিবীতে

মরুভূমিতে পাওয়া চন্দ্রখণ্ডটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা ১২৫৯৩’ (এনডব্লিউএ ১২৫৯৩)। বিজ্ঞানীদের দাবি, চাঁদের তিনটি পৃথক সংঘর্ষের ক্ষতচিহ্ন এই পাথরে সংরক্ষিত রয়েছে।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৫ জুন ২০২৬ ০৯:০৪
চাঁদ থেকে পাথরখণ্ড ছিটকে এসে পড়েছিল পৃথিবীর বুকে।

চাঁদ থেকে পাথরখণ্ড ছিটকে এসে পড়েছিল পৃথিবীর বুকে। ছবি: এআই সহায়তায় তৈরি।

কোটি কোটি বছর আগে মহাকাশে ঘটে যাওয়া বিপর্যয়ের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া গেল আফ্রিকায়! উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার মরুভূমি থেকে একটি পাথরের টুকরো উদ্ধার করেছেন বিজ্ঞানীরা। পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, আদৌ তা এই পৃথিবীর কোনও অংশ নয়! তা চাঁদের এক খণ্ড। ওই পাথরে মহাকাশের প্রাচীন সংঘর্ষের হদিস মিলেছে। পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহকে নাড়িয়ে দিয়েছিল সেই সংঘর্ষ। প্রাণ তখনও জাঁকিয়ে বসতে পারেনি পৃথিবীতে। সবে তার চোখ ফুটছিল মাত্র!

মরুভূমিতে পাওয়া চন্দ্রখণ্ডটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা ১২৫৯৩’ (এনডব্লিউএ ১২৫৯৩)। বিজ্ঞানীদের দাবি, চাঁদের তিনটি পৃথক সংঘর্ষের ক্ষতচিহ্ন এই পাথরে সংরক্ষিত রয়েছে। তার মধ্যে একটি প্রাচীন সংঘর্ষ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, তা চন্দ্রপৃষ্ঠের একাংশকে গলিয়ে দিয়েছিল। গলিত পাথর ছড়িয়ে পড়েছিল চাঁদের একাংশ জুড়ে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সময়ের পৃথিবী তথা সৌরজগতের একাংশের অবস্থা সম্পর্কেও আন্দাজ পান বিজ্ঞানীরা।

পৃথিবীতে সুদূর অতীতের শিলা বেশ দুর্লভ। কারণ, আমাদের এই গ্রহ সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকে বহু বার বহু ক্ষয়, বিপর্যয় এবং ভূগঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে। অতীতের শিলা নিশ্চিহ্ন হয়ে মাথা তুলেছে নতুন ভূত্বক। তাই প্রাচীন সময়ের খুব বেশি নিদর্শন পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া যায় না। আফ্রিকার চন্দ্রখণ্ডটিকে সেই কারণেই অত্যন্ত বিরল এবং গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীদের একাংশ। পৃথিবীর মতো চাঁদের শিলায় এত পরিবর্তন হয়নি। তাই অতীত নিদর্শনের সংরক্ষণাগার হিসাবে কাজ করে চাঁদ। সেখান থেকে আসা পাথরখণ্ডটিতেও রয়েছে অতীতের চিহ্ন।

আফ্রিকার চন্দ্রখণ্ডটি নিয়ে গবেষণা করেছেন আমেরিকার কলোরাডো বোল্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহবিজ্ঞানী ক্যারোলিন ক্রো এবং তাঁর দলের সদস্যেরা। তাঁদের গবেষণার ফল প্রকাশিত হয় গত ১২ মে, ‘জিয়োলজি’ জার্নালে। গবেষণায় ক্যারোলিনকে সহযোগিতা করেছেন টিমসন এরিকসন, রিটা একোনোমোস, কেটলিন ফ্র্যাঙ্কো এবং আরও সাত জন সহকারী গবেষক। তাঁদের মতে, আজ থেকে প্রায় ৩৫০ কোটি বছর আগে চাঁদের প্রবল বিস্ফোরণের অভিঘাতে এই পাথরখণ্ড ছিটকে পৃথিবীতে চলে এসেছিল। ওই সময়ে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি সবে শুরু হয়েছিল। আমাদের গ্রহের এত পুরনো অবস্থার নিদর্শন অত্যন্ত বিরল।

সৌরজগতের গ্রহাণু বলয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম খণ্ডের নাম ভেস্টা। প্রায় একই সময়ে পৃথিবীতে এবং ভেস্টায় প্রকাণ্ড মহাজাগতিক সংঘর্ষ হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা তার হদিস পেয়েছিলেন আগেই। কিন্তু ওই সময়েই যে চাঁদেও একটি প্রকাণ্ড সংঘর্ষ হয়, তা এত দিন জানা ছিল না। গবেষকদের দাবি, এই আবিষ্কারের ফলে প্রাচীন সময়ের সূত্রগুলি একে একে জুড়ে ফেলা যাবে। সৌরজগৎ এবং সমসাময়িক পৃথিবী কেমন দেখতে ছিল, সে সম্পর্কে আমাদের ধারণা আরও স্পষ্ট হবে। রেডিয়োমেট্রিক ডেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করে চন্দ্রখণ্ডের সময়কাল নির্ধারণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। এই পদ্ধতির মাধ্যমে সময়ের সঙ্গে তেজষ্ক্রিয় মৌলের ক্ষয় পর্যবেক্ষণ করা যায়।

পৃথিবী সৃষ্টির পরপরই প্রকাণ্ড এক মহাজাগতিক খণ্ডের সঙ্গে তার সংঘর্ষ হয়েছিল বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। সেই সংঘর্ষ থেকে চাঁদের উৎপত্তি। বলা হয়, পৃথিবীর একাংশ টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়েছিল মহাকাশে। তা একত্রিত হয়ে একসময় উপগ্রহের আকার নেয়। তাই আদি পৃথিবীর অজানাকে জানার জন্য চাঁদ বিজ্ঞানীদের কাছে মূল্যবান সম্পদ। সাম্প্রতিক গবেষণার অন্যতম নেতা ক্যারোলিন বলেছেন, ‘‘পৃথিবীতে প্রাণের প্রথম জীবাশ্মের প্রমাণ পাওয়া যায় সাড়ে ৩০০ কোটি বছর আগে। তার মানে প্রাণের উদ্ভব হয়েছিল তারও অনেক আগে। সেই সময় পৃথিবী কেমন দেখতে ছিল? আমাদের মনে প্রায়শই এই প্রশ্ন জাগে। কী ভাবে প্রাণ তৈরি হয়েছিল, কী ভাবে তার বিকাশ ঘটেছিল, সে সব বোঝার জন্য এই গবেষণা জরুরি।’’

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, সৌরজগৎ তৈরির প্রায় ১০০ কোটি বছর পরে চাঁদে আলোচ্য সংঘর্ষটি হয়েছিল। সেই সময়ে সৌরজগতের গ্রহগুলি নিজস্ব আকার ধারণ করেছিল বটে, তবে পরিস্থিতি যথেষ্ট সংঘর্ষপূর্ণ ছিল। চারদিকে ছ়ড়িয়েছিটিয়ে ছিল ধ্বংসাবশেষ, যে কোনও মুহূর্তে যে কোনও মহাজাগতিক বস্তুর উপর যখনতখন নেমে আসত বিধ্বংসী আঘাত।

আফ্রিকার পাথরখণ্ডে পাওয়া প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী সংঘর্ষের ফলে চাঁদের একাংশ গলিত শিলায় পরিণত হয়েছিল। দ্বিতীয় সংঘর্ষের অভিঘাতে সেই গলিত শিলা থেকে তৈরি হয়েছিল ব্রেসিয়া। ভাঙা টুকরো একত্রিত হয়ে গঠিত এক ধরনের শিলার নাম ব্রেসিয়া। ক্যারোলিনের কথায়, ‘‘কংক্রিটের একটি খণ্ড ভেঙে ফেললে যেমন দেখায়, ব্রেসিয়া অনেকটা তেমন। কংক্রিটে ছোট ছোট পাথরের টুকরো সিমেন্টের সঙ্গে জুড়ে যায়। এখানেও তেমনই সংঘর্ষের ফলে বিভিন্ন ধরনের পাথরের টুকরো তৈরি হয়েছিল। সেগুলি একত্রিত হয়েছে।’’ এনডব্লিউএ ১২৫৯৩-তে সংরক্ষিত তৃতীয় সংঘর্ষটি ঘটে আরও অনেক পরে। তার ফলেই চাঁদ থেকে সেই পাথরখণ্ড ছিটকে বেরিয়ে যায়। চাঁদের বাইরে এমন একটি পথে তা চালিত হয়েছিল, যা একসময়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে।

পৃথিবী থেকে একাধিক বার চাঁদে পাড়ি দিয়েছে মানুষ। নাসার অ্যাপোলো অভিযান, রাশিয়ার লুনা অভিযান কিংবা চিনের চ্যাং-ই অভিযানে বহু নমুনা চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে পৃথিবীতে এসেছে। কিন্তু সেগুলি চাঁদের নির্দিষ্ট অংশ থেকে সংগৃহীত। আফ্রিকার পাথরখণ্ড আসতে পারে এমন কোনও অজানা অংশ থেকে, যেখানে এর আগে পৃথিবীর কোনও মহাকাশযান পৌঁছোয়নি। তাই বিজ্ঞানীদের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম। ক্যারোলিনদের গবেষণার পর সেই গুরুত্ব আরও কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে।

Lunar Rock Solar System Space Science Moon

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy