বিরোধী আসনে থাকাকালীন জোর দেওয়া হয়েছিল সংগঠন বিস্তারে। শাসকের আসনে বসার পরে বদলে গেল লক্ষ্য। এখন আর শুধু সংগঠনের বিস্তার নয়, জোর দেওয়া শুরু হল ‘যোগ্য ও দক্ষ কর্মী’ বাহিনী তৈরিতে। শুধু পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য নয়, বিজেপির এই কর্মী প্রশিক্ষণ শিবির গোটা দেশেই শুরু হয়েছে। নাম দেওয়া হয়েছে ‘পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় কর্মী প্রশিক্ষণ মহাঅভিযান ২০২৬’। কিন্তু ঘটনাচক্রে পশ্চিমবঙ্গে তা শুরু হয়েছে বিধানসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পরেই। রাজ্য এবং জেলা স্তরের কর্মসূচি ইতিমধ্যেই সারা। বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে মণ্ডল (একটি বিধানসভার এক-তৃতীয়াংশ বা এক চতুর্থাংশ) স্তরের ‘প্রশিক্ষণ বর্গ’। আগামী এক মাসে (পাঁচ সপ্তাহ) রাজ্যের ১৩১৩টি (১৩৪৪টির মধ্যে) মণ্ডলে ২৪ ঘণ্টার ‘প্রশিক্ষণ বর্গ’ সেরে ফেলতেই হবে, নির্দেশ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের।
বিজেপির সর্বভারতীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) শিবপ্রকাশকে আহ্বায়ক করে এই প্রশিক্ষণ মহাঅভিযান শুরু করেছে বিজেপি। আরএসএস-এর (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ) যে কোনও প্রশিক্ষণ বর্গ যে ধাঁচে সাজানো হয়, বিজেপির এই প্রশিক্ষণ অভিযানও হুবহু সেই ধাঁচেই সাজানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার অর্থাৎ ২৫ জুন থেকে মণ্ডল স্তরের যে ‘প্রশিক্ষণ বর্গ’ শুরু হচ্ছে, তার সময়কাল ২৪ ঘণ্টা হতেই হবে। বিকেল ৫টায় প্রশিক্ষণ স্থলে পৌঁছোতে হবে। পরের দিন বিকেল ৫টায় ছুটি। অর্থাৎ প্রশিক্ষণ স্থলে রাত্রিযাপন বাধ্যতামূলক। বুথ সভাপতি বা শক্তিকেন্দ্র প্রমুখ হন বা সংশ্লিষ্ট মণ্ডলের বাসিন্দা কোনও জেলা বা রাজ্য স্তরের পদাধিকারী, সকলকেই শিবিরে যোগ দিতে হবে। প্রত্যেকের জন্যই থাকা-খাওয়ার একই রকম ব্যবস্থা থাকবে। বিজেপি নেতৃত্বের ভাষায়, ‘‘প্রত্যেকের মধ্যে কার্যকর্তা ভাব জাগিয়ে তোলার জন্য এই ২৪ ঘণ্টা একত্রে কাটানো তথা রাতে একসঙ্গে একই রকম ব্যবস্থার মধ্যে থাকার বন্দোবস্ত অত্যন্ত ফলদায়ী।’’
রাজ্যস্তরের জন্য প্রশিক্ষণ বর্গের সময়কাল ধার্য হয়েছিল তিন দিন। জেলা স্তরের জন্য দু’দিন করে। মণ্ডলে এক দিন করে একসঙ্গে কাটানোর বন্দোবস্ত। পরে যখন বুথ স্তরেও একই কর্মসূচি আয়োজিত হবে, তখন সময়কাল হবে চার ঘণ্টার।
বিজেপি সূত্রে জানা গিয়েছে, মণ্ডল স্তরের প্রশিক্ষণ শিবিরে ২৪ ঘণ্টায় আটটি ‘সত্র’ (সেশন) থাকছে। প্রতিটি সত্রে আলাদা আলাদা বক্তা থাকবেন। যে যে বিষয়ে আলোচনা হবে সেগুলি হল: ‘সত্র’ ১. বিজেপির আদর্শগত ভিত্তি, ‘সত্র’ ২. বিজেপির ইতিহাস ও বিকাশ, ‘সত্র’ ৩. কর্ম সম্প্রসারণের দৃষ্টিভঙ্গি, ‘সত্র’ ৪. কর্মপদ্ধতি (কর্মীদের আচরণ ও কার্যপ্রণালী), ‘সত্র’ ৫. বিজেপি সরকারের সাফল্য এবং তার বাস্তবায়ন (বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ায় ভূমিকা), ‘সত্র’ ৬. সমাজমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নমো অ্যাপ, সরল অ্যাপ, ‘সত্র’ ৭. বুথ ব্যবস্থাপনা (মন কি বাত, টিফিন মিটিং, আসন্ন কর্মসূচি, বুথ-স্তরের চলমান কর্মসূচি), ‘সত্র’ ৮. বর্তমান অবস্থায় বিজেপির দায়িত্ব এবং কর্তব্য।
অনেকে বলছেন, বিজেপির এই ‘প্রশিক্ষণ মহাঅভিযান’ আসলে সিপিএমের ‘পার্টি ক্লাস’-এর মতো। দলের আদর্শ এবং নীতি সম্পর্কে বিভিন্ন স্তরের কর্মী তথা পদাধিকারীদের অবহিত রাখা, কর্মীদের আচরণবিধি নির্দিষ্ট করে দেওয়া, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দলের কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা বুঝিয়ে দেওয়া, জনসংযোগের ধাঁচ বুঝিয়ে দেওয়া, দলের নানা নিয়মিত কর্মসূচির সুচারু রূপায়ণের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা— মূলত এই ধরনের এক গুচ্ছ লক্ষ্য সামনে রেখেই এক সময়ে নিয়মিত ‘পার্টি ক্লাস’ চালাত সিপিএম। যদিও রাজ্যে ক্ষমতায় থাকাকালেই পার্টিতে সে সবের গুরুত্ব কমে এসেছিল।
‘পার্টি ক্লাস’ কেন হয় না বা ক’টা হয়, সে সব নিয়ে তাত্ত্বিকদের কেউ কেউ সমালোচনাও শুরু করেছিলেন। কিন্তু একটা সময়ে পার্টি সদস্যদের ‘যোগ্য ও দক্ষ’ করে তুলতে যে ‘পার্টি ক্লাস’গুলির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল, সে কথা সিপিএমের অনেকেই মানেন। রাজনৈতিক শিবির বলছে, বিজেপি-ও যে হেতু সিপিএম-এর মতো সংগঠনভিত্তিক এবং কর্মীনির্ভর (রেজিমেন্টেড) দল, তাই কর্মীদের ‘যোগ্য ও দক্ষ’ করে তোলা বিজেপির জন্যও একই রকম জরুরি। দল পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পরে যে বিজেপি সেটির গুরুত্ব আরও বেশি করে অনুভব করেছে, তা দলের জন্য ‘সুলক্ষণ’ বলে অনেকের মত। বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার ‘সন্তুষ্টিতে’ যদি দলের নেতৃত্ব সাংগঠনিক খামতির দিকগুলি উপেক্ষা করতেন, তা হলে অচিরেই ‘বিপদ’ আসতে পারত বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত।
২০১৬ সালের পরে অবশ্য সিপিএম আবার ঘুরপথে ‘পার্টি ক্লাস’ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল। নাম দেওয়া হয়েছিল ‘পাঠচক্র’ (স্টাডি সার্কল)। নেতাদের একমুখী ভাষণ নয়, বরং কর্মীদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার বন্দোবস্তও হয় সেখানে। কিন্তু সে উপর্যুপরি হারে পশ্চিমবঙ্গে নখদন্তহীন হয়ে পড়া সিপিএমে সে ‘পাঠচক্র’ আদৌ কতটা ফলদায়ী হয়েছে, তা নিয়ে অনেকেরই সংশয় রয়েছে।
বিজেপি কিন্তু শুরু থেকেই ‘প্রশিক্ষণ মহাঅভিযান’কে দ্বিমুখী সংলাপ করে তুলতে উদ্যোগী। এই কর্মসূচির যে নির্দেশিকা রাজ্যে রাজ্যে পাঠানো হয়েছে, তাতে বলে দেওয়া হয়েছে যে, প্রতিটি সত্রের জন্যই এক ঘণ্টা করে বরাদ্দ থাকবে। তার মধ্যে প্রথম ৪০ মিনিট বক্তা বিষয় উপস্থাপন করবেন। পরবর্তী ২০ মিনিট থাকবে কর্মীদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য। জেলায় জেলায় ৭০ জনের ‘টিম’ তৈরি করা হয়েছে মণ্ডল স্তরে গিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য। সেই বক্তাদের প্রশিক্ষণও ইতিমধ্যেই সারা। কয়েকটি জেলায় বুধবার এবং বৃহস্পতিবারেও ‘বক্তা প্রশিক্ষণ’-এর কাজ চলছে বলে বিজেপি সূত্রের খবর। শক্তি কেন্দ্র ইনচার্জ, মণ্ডল কার্যনির্বাহী সদস্যরা, মণ্ডল মোর্চা প্রধান ও সাধারণ সম্পাদকরা প্রশিক্ষণ শিবিরে ডাক পাচ্ছেন। বিজেপির কোনও জেলা বা রাজ্য স্তরের পদাধিকারী যদি সংশ্লিষ্ট মণ্ডলের বাসিন্দা হন, তিনিও প্রশিক্ষণ শিবিরে ডাক পাচ্ছেন। ডাক পাচ্ছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও।
বিজেপির এই ‘প্রশিক্ষণ মহাভিযান’ এ রাজ্যে দলের কর্মপদ্ধতিতে আরও একটি বদল আনছে। এই শিবিরের আয়োজনের জন্য দলের তহবিল থেকে টাকা পাঠানো হবে না। নির্দেশিকায় লেখা হয়েছে, ‘‘এই শিবিরের আয়োজন সমাজ থেকে আর্থিক বা বস্তুগত সহযোগিতা (স্বেচ্ছা অনুদান) নিয়ে করাই কাঙ্ক্ষিত।’’ অর্থাৎ যে এলাকার কর্মসূচি, সেখানকার বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের থেকে চাঁদা নিয়েই আয়োজন সাজাতে হবে। অংশগ্রহণকারীরা প্রত্যেকেই ১০০ টাকা করে ‘শুল্ক’ জমা দিয়ে শিবিরে অংশ নেবেন। কিন্তু তাতে সম্পূর্ণ খরচ জোগাড় করা সম্ভব নয়। কারণ মণ্ডল স্তরের প্রতিটি শিবিরে ১০০-১৫০ জন অংশ নেবেন। তাঁদের ২৪ ঘণ্টার খাওয়াদাওয়া এবং থাকার বন্দোবস্ত রাখতে হবে। দলের তরফ থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তা তথা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে। কিন্তু মঞ্চসজ্জা, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রশিক্ষণস্থলের সাজসজ্জা (নির্দেশিকায় নির্দিষ্ট), অংশগ্রহণকারীদের প্রদেয় ব্যাগ, ডায়েরি, কলম, উত্তরীয় ইত্যাদির ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট মণ্ডলকেই করতে হবে।
বিরোধী আসনে থাকাকালীন রাজ্যে বিজেপির অধিকাংশ কর্মসূচির খরচই কেন্দ্রীয় বা রাজ্য নেতৃত্ব পাঠাতেন। তা নিয়ে সমালোচনাও হত। দলের তহবিল থেকে সহজে টাকা মেলে, তাই নীচের তলার কর্মীদের খেটে টাকা জোগাড় করার অভ্যাস চলে গিয়েছে— এমন সমালোচনা বিজেপির অন্দরেই শোনা যেত। তার পাল্টা যুক্তিও ছিল। রাজ্যে তৃণমূল যে ধরনের ‘অসহিষ্ণু পরিবেশ’ তৈরি করে রেখেছে, তাতে সাধারণ মানুষের থেকে চাঁদা তোলা বিজেপির পক্ষে কঠিন বলে অনেকেই দাবি করতেন। কিন্তু যে কোনও কর্মসূচির জন্য উপরতলা থেকে টাকা আসার বন্দোবস্ত থাকলে, দলের অন্দরে দুর্নীতি বাড়ে বলে অনেকের মত ছিল। তা ছাড়া স্থানীয় স্তরের কর্মসূচির জন্য এলাকায় চাঁদা তুললে যে জনসংযোগ বাড়ে, তা থেকেও বিজেপি বঞ্চিত হচ্ছিল বলে সে সময় বিজেপির বেশ কিছু ‘আদি নেতা’ দাবি করতেন। এ বারের ‘প্রশিক্ষণ মহাঅভিযান’ সেই রীতিতে ছেদ ফেলতে চলেছে। দল রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বলে পথ অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে, এমনটা কর্মীদের ভাবতে দিতে রাজি নয় বিজেপি। এক কেন্দ্রীয় নেতার ব্যাখ্যা, ‘‘প্রতিকূল সময়ে অঢেল অর্থসাহায্য মিলেছে। এখন সময় অনুকূল। অতএব দলকে এ বিষয়ে স্বাবলম্বী হতে হবে।’’